ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইশরাকের পদত্যাগ: গুজব অস্বীকার থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতির যত নাটকীয়তা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 19, 2026 ইং
ইশরাকের পদত্যাগ: গুজব অস্বীকার থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতির যত নাটকীয়তা ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

রবিবার রাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী পদ ছাড়ার নির্দেশ পাওয়ার খবরটিকে স্রেফ গুজব ও ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন। তাঁর দপ্তর থেকে তখন সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আনুষ্ঠানিক হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরের দিন সোমবার সকালে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের বিষয়টি সামনে আসার পর দুপুরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এই প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন যে তিনি নিজেই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন।

শনিবার বিকেলে অস্ত্র উঁচিয়ে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার দুপুরে পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া পর্যন্ত সাবেক এই প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ও অসংগতিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। প্রথমে তাঁকে পদচ্যুত করার নির্দেশনা সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হয়, পরবর্তীতে সঠিক সময়ের আগেই সেই সিদ্ধান্ত ফাঁস হয়ে যাওয়ায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টির ধুয়ো তোলা হয় এবং পরিশেষে পুরো বিষয়টিকে তাঁর নিজ থেকেই পদ ছেড়ে দেওয়ার স্বেচ্ছাধীন সিদ্ধান্ত বলে জাহির করা হয়।

এই সমস্ত বক্তব্যের পরতে পরতে নানা রকমের অসঙ্গতি ও পরস্পরবিরোধী অবস্থান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশেষ করে তিনি কখন সরকারের শীর্ষ মহলের এমন সিদ্ধান্তের বিষয়ে ওয়াকিবহাল হয়েছিলেন, কেন আগের রাতে সংবাদটিকে অসত্য বলে দাবি করা হয়েছিল এবং এই পদত্যাগের পেছনের মূল উদ্যোগটা ঠিক কার ছিল—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কোনো সন্তোষজনক উত্তর তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।

দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ইশরাক হোসেন জোর দিয়ে বলেন যে তিনি নিজেই সরকারপ্রধানের কাছে গাজরপত্র থেকে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়েছেন।

উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি জানান যে উক্ত দিন থেকেই তিনি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় অব্যাহতি প্রার্থনা করেছেন। ঢাকা-৬ সহ আশেপাশের এলাকায় মাদকের আগ্রাসন রোধ এবং সাধারণ মানুষের অন্যান্য বিবিধ সমস্যা সমাধানে আত্মনিয়োগ করার ইচ্ছা তিনি প্রধানন্ত্রীকে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে সরকারপ্রধান সম্পূর্ণ সায় দিয়েছেন এবং তাঁকে নিজ এলাকায় মুক্তভাবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিয়েছেন।

পক্ষান্তরে, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্রের দাবি অনুযায়ী, রবিবার সন্ধ্যায় সরকারি দপ্তরে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক সমাপ্ত হওয়ার পর ইশরাককে নিজের দপ্তরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন সরকারপ্রধান তারেক রহমান। সেখানে তাঁকে অবিলম্বে পদ ছাড়ার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল বলে উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছিল।

সংবাদ সম্মেলনে এই দ্বিমুখী বক্তব্যের অসংগতি তুলে ধরে এক সাংবাদিক জানতে চান যে সকালে বলা হলো নির্দেশ পেয়ে পদত্যাগ আর এখন বলা হচ্ছে স্বেচ্ছায়, আসল ঘটনা কোনটি।

উত্তরে ইশরাক জানান যে তিনি নিজে গিয়ে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছা প্রকাশ করলেও সরকারি দপ্তরে তার প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশ তো উপর থেকেই আসবে।

প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন যে তিনি হলেন মন্ত্রিসভার প্রধান এবং নির্দেশ তিনিই প্রদান করবেন।

তাঁর ভাষ্যমতে, তিনি নিজেই শীর্ষ নেতার সাথে বসে ব্যক্তিগত ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেছেন এবং তিনি তা বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দিয়েছেন।

এরপর গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে তিনি অনুরোধ জানান যে সকালের বার্তা বা বিকালের বার্তার যতিচিহ্ন কিংবা কমা-দাড়ি নিয়ে বিতর্ক করে যেন মূল বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া না হয়।

তবে এই সমস্ত ব্যাখ্যার পরেও পদত্যাগের মূল চালিকাশক্তি আসলে কার দিক থেকে এসেছিল, সেই ধোঁয়াশা কাটেনি। কারণ আগের রাতে যখন এই নির্দেশনা জারির খবর পরিবেশিত হয়েছিল, তখন কেবল তা অস্বীকারই করা হয়নি, বরং এটিকে রাজনৈতিক অসদ্দেশ্যে প্রণীত মিথ্যা প্রোপাগান্ডা হিসেবেও প্রতিপন্ন করা হয়েছিল।

নির্দেশের খবর অস্বীকার করার কারণ সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে নতুন করে ব্যাখ্যা দিয়ে ইশরাক বলেন যে এই সিদ্ধান্তটি মূলত সোমবার সকালেই সর্বসমক্ষে প্রকাশের পূর্বপরিকল্পনা ছিল। কিন্তু দলীয় কোনো সহকর্মী নির্ধারিত সময়ের আগেই তা ফাঁস করে দেওয়ায় অপ্রয়োজনীয় জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি আরও যোগ করেন যে দাপ্তরিক নিয়ম মেনেই আজকের দিনে এই ঘোষণা আসার কথা ছিল। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে তাঁদের কোনো এক সহকর্মী তা অতিকাল আগেই প্রকাশ করায় অনভিপ্রেত ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

এরপর তিনি উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করেন যে ঘটনা গতকাল ঘটল নাকি আজ ঘটল, তাতে আদতে কী বা এসে যায়।

তাঁর এই কথার সাথে আগের রাতের বক্তব্যের আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে। কারণ আগের রাতে তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে বলা হয়েছিল এমন কোনো নির্দেশই দেওয়া হয়নি এবং পদত্যাগের বিন্দুমাত্র কোনো অবকাশ নেই। অথচ পরের দিন এসে তিনি দাবি করলেন যে গোপনীয় সিদ্ধান্ত আগেভাগে বাইরে চলে যাওয়ায় বিপত্তি বেধেছে।

এখন যৌক্তিক প্রশ্ন জাগে, যদি সংবাদটি আগেভাগেই ফাঁস হয়ে গিয়ে থাকে, তবে আগের রাতে সেটিকে কাল্পনিক, মিথ্যা ও গুজব হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হলো কেন?

সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে করা এই প্রশ্নের জবাবে তিনি যুক্তি দেখান যে যেহেতু বিষয়টি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং সরাসরি সরকারপ্রধান সংশ্লিষ্ট, তাই তাঁর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক সবুজ সংকেত না পাওয়া পর্যন্ত সেটিকে অসত্য বা গুজব হিসেবেই ধরে নিতে হবে।

কিন্তু কোনো দাপ্তরিক ঘোষণা না আসার সাথে কোনো তথ্য সম্পূর্ণ অসত্য হওয়ার বিষয়টি যে এক নয়, তা স্পষ্ট। রবিবারের সেই রাতে শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি আছে এমনটিই বলা হয়নি, বরং পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়ার তথ্যটিকেই সর্বৈব মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।

রবিবার রাত দশটার দিকে একটি অনলাইন পোর্টালে মন্ত্রিসভা থেকে ইশরাককে অপসারণের নির্দেশসংক্রান্ত খবর প্রকাশিত হয়। এর মাত্র বাইশ মিনিট বাদে তিনি তাঁর নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে লেখেন যে কেউ যেন এই পদত্যাগের গুজবে কান না দেন।

এর ঠিক চার মিনিট পর একই মাধ্যমে একটি ভয়েস রেকর্ড ছেড়ে তিনি সংবাদটিকে স্রেফ উড়োখবর ও গুজব বলে আখ্যায়িত করেন এবং দল থেকে কোনো সিদ্ধান্ত এলে তা এমন উপায়ে আসার নয় বলে মন্তব্য করেন।

এর দুই মিনিট পার হতে না হতেই তাঁর প্রেস উইং থেকে একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়, যেখানে সংবাদটিকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তা ফেসবুক পেজেও ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

সর্বশেষ রাত দশটা চল্লিশ মিনিটে আরও একটি অডিও বার্তা পাঠিয়ে তিনি তখনও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে বহাল থাকার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আরও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৩০ টাকা

আরও বাড়ল স্বর্ণের দাম, ভরি ২ লাখ ৭০ হাজার ৪৩০ টাকা