নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বন্দরনগরীর প্রধান কার্যালয়ে কিশোর অপরাধ চক্রের মূলহোতাকে আটক করতে গিয়ে একজন পুলিশ কর্মকর্তা বাধার মুখে পড়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও সিটি মেয়র শাহাদাত হোসেন দাবি করেছেন যে সেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই সময় ভবনের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন না, তবে শেষ পর্যন্ত ওই অপরাধীকে পাকড়াও করতে যাওয়া সেই পুলিশ সদস্যকেই বদলির শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের আটক করবে এবং আদালতের বিচারকরা আইন অনুযায়ী অপরাধী কিংবা নির্দোষ তা নির্ধারণ করবেন। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরা যদি নিজেরাই বিচারের ভার নিজেদের হাতে তুলে নেন, তবে বিচারালয়ের কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
বর্তমান সময়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থার নানা স্তরে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নীতিনির্ধারকদের নানাবিধ জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। কিছুদিন আগে যুব প্রতিমন্ত্রীকে রাতের পর রাত সচিবালয়ের দপ্তরে বসে থেকে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাহারা দিতে দেখা গেছে। প্রশ্ন জাগে, ওই নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয়ে এত কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রকৃত দায়িত্ব কী এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ কি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অপরাধের সাথে জড়িত রয়েছেন? এই ধরনের উদ্যোগ কি কেবল সাময়িক কোনো সতর্কতা, নাকি প্রতিটি পরীক্ষার আগে মন্ত্রীদের রাত জেগে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে দেখা যাবে? এভাবে চলতে থাকলে প্রশ্ন তৈরির সাথে জড়িতদের রোধ করতে কি শেষ পর্যন্ত মন্ত্রীকেই স্বয়ং প্রশ্নপত্র তৈরি করতে হবে?
একইভাবে জনমনে প্রশ্ন উঠতে পারে যে সরকারি কর্ম কমিশনের বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তবে কে পাহারা দেবেন? কিংবা কমিশনের প্রধানকেই কি রাত জেগে ওই গোপন নথি পাহারা দিতে হবে এবং শিক্ষামন্ত্রী কি এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সুরক্ষায় একইভাবে জেগে থাকবেন? মূলত এই ধরনের বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপে সামগ্রিক সংকটের স্থায়ী নিরসন সম্ভব নয়। দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সঠিক চেইন অব কমান্ড বজায় রেখে উচ্চস্তর থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত সুদৃঢ় শৃঙ্খলা ও যার যার দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা। গত ২০ অক্টোবর বন্দরনগরীতে অনুষ্ঠিত বিএনপির সাংগঠনিক gatherings-এ দেওয়া বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়েছিল যে প্রত্যেকে নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে অপরাধ প্রবণতা অর্ধেকে নেমে আসে। মূল কথা হলো যার কাঁধে যে দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে, তাকে তা যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী পালন করতে হবে।
আমাদের জাতীয় জীবনের বহু সংকটের শেকড় লুকিয়ে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক ধরনের অপারগতা ও নিষ্ক্রিয়তার মধ্যে। অতীতেও আমাদের এই বাহিনী সম্পূর্ণ ত্রুটিহীন ছিল না, তবে তাদের কিছু না কিছু দৃশ্যমান তৎপরতা সবসময় লক্ষ করা যেত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় তারা বহু ক্ষেত্রেই দর্শকের ভূমিকা পালন করছে এবং মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকালে তাদের চরমভাবে বিভ্রান্ত মনে হয়। তারা যেন নিজেরাও নিশ্চিত হতে পারেন না যে এই পরিস্থিতিতে তাদের কোন পক্ষ বা নীতি অবলম্বন করা উচিত। আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলোর পরিধি এত বিশাল যে কোনো একক বা বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেগুলোর কাঙ্ক্ষিত সমাধান করা সম্পূর্ণ অসম্ভব।
এই বহুমুখী সমস্যাগুলোর সমাধান করতে হলে সুশৃঙ্খল ও সংঘবদ্ধ পন্থায় এগোতে হবে এবং সেই শৃঙ্খলা সবার আগে ওপরের পর্যায় থেকে শুরু করে নিচের স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে। সরকারের মন্ত্রীরা কেবল নীতিনির্ধারণের কাজটি সম্পন্ন করবেন, আর প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা নিজেদের সুনির্দিষ্ট দায়িত্বের পরিধি অনুযায়ী সেই নীতিগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করবেন। অতীতে বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে অপরাধ দমনে সাহসী ভূমিকা রাখতে গিয়ে প্রশাসন ও পুলিশের অনেক সদস্যকে উল্টো ঊর্ধ্বতন মহলের শাস্তির মুখে পড়তে হয়েছে। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই এই ধরনের অসংখ্য ঘটনার বিবরণ খুঁজে পাওয়া সম্ভব। যত দিন পর্যন্ত এই কাঠামোগত অবস্থার ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটবে, তত দিন মন্ত্রীদের বাধ্য হয়ে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করতে হবে।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে কিছু মন্ত্রীকে অস্ত্র হাতে সরাসরি পুলিশের রুটিন দায়িত্ব পালন করতে দেখা যাবে, আর সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সংকটও চলতেই থাকবে যার চরম খেসারত দিতে হবে সাধারণ জনগণকে। সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত কার্যক্রমে সদ্য বিদায়ী এক প্রতিমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে জনসমাজে ব্যাপক বিতর্ক ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর এই কার্যক্রমকে কেউ কেউ অত্যন্ত সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ আখ্যা দিয়েছেন, আবার অনেকে মনে করছেন তিনি প্রচলিত আইন লঙ্ঘন করেছেন। এই সমস্ত বিতর্ককে এড়িয়ে একটি বিষয় পরিষ্কার যে তিনি মূলত একজন মন্ত্রীর মূল দায়িত্ব ও এখতিয়ার সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। তাঁর মরহুম পিতা সাদেক হোসেন খোকা একজন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত গেরিলা যোদ্ধা ছিলেন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অস্ত্র হাতে সরাসরি বহু গেরিলা অভিযানে বীরত্বপূর্ণ অংশ নিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে তিনি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে তাঁকেও বিভিন্ন সময় নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু দায়িত্ব পালনকালে কেউ কখনো তাঁকে অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে মহড়া দিতে দেখেননি। আরেকটি ভিন্ন কারণেও তাঁর পূর্বসূরিকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হতো, তা হলো সত্তরের দশকের শুরুর দিকে গফুর বালুচকে সাথে নিয়ে গোপীবাগে ব্রাদার্স ইউনিয়ন নামে একটি ফুটবল ক্লাব প্রতিষ্ঠা করা। সেই দলটি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন ফুটবল খেলার পাশাপাশি চমৎকার এক সমর্থকগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিল যারা কখনোই খেলা চলাকালীন মাঠে চেয়ার ছোড়াছুড়ি, মারামারি কিংবা ইটপাটকেল নিক্ষেপের মতো বিশৃঙ্খলায় জড়াত না। সাধারণ বন্ধুরা মিলে সেই দলের খেলা উপভোগ করতে মাঠে যেত এবং তাদের নান্দনিক খেলা দেখে উৎসাহিত করত।
সেই সময়ের পৃষ্ঠপোষকতার ফলেই ব্রাদার্স ইউনিয়ন ধীরে ধীরে একটি সাধারণ পাড়ার দল থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্রীড়া সংগঠনে রূপ নিতে সক্ষম হয়েছিল। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সমাজ থেকে এই ধরনের ইতিবাচক উদ্যোগগুলো আজ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেই দেশের তরুণেরা সহজেই মাদক ও অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এর পাশাপাশি ওই তরূণ নেতার আরও কিছু কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষ কোনোভাবেই ভালোভাবে গ্রহণ করেনি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে তাঁকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ভবনের মূল ফটকে দীর্ঘদিন ধরে তালা ঝুলিয়ে রাখতে দেখা গিয়েছিল। এর ফলে দক্ষিণ অঞ্চলের নগরবাসীকে দীর্ঘ সময় ধরে সিটি করপোরেশনের নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত থাকতে হয়েছিল এবং সেই সময় সংবাদমাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হলেও তিনি তা আমলে নেননি।
অবশেষে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনার পর তাঁকে পদত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আশা করা যায় তিনি নিজের ভুলত্রুটিগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করবেন। তিনি বয়সে এখনো তরুণ এবং ভবিষ্যতে দেশ ও জাতির সেবায় আরও অনেক বড় সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা তাঁর রয়েছে। মাদক বিরোধী সেই অভিযান নিয়ে নানান আলোচনা হলেও এর মাধ্যমে যে নির্মম সত্যটি উন্মোচিত হয়েছে তা কোনোভাবেই তুচ্ছ করার মতো নয়। আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে সর্বগ্রাসীভাবে গ্রাস করে চলেছে মাদক নামক এক ভয়ংকর ব্যধি। বর্তমান পরিস্থিতি এমন একটি পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে খোদ রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও অনেক সময় উপলব্ধি করতে পারেন না কীভাবে এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হবে।
মাদকের অবাধ বিস্তারের কারণে দেশজুড়ে খুনোখুনি, সংঘাত ও মারামারির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মেজাজও অত্যন্ত খিটখিটে হয়ে উঠছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফে প্রকাশিত সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে সিফাত নামের এক বাংলাদেশি মাদকাসক্ত তরুণের চাঞ্চল্যকর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সেই তরুণ জানিয়েছে যে ইয়াবার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তার সমস্ত মেজাজ হারিয়ে যেত এবং তুচ্ছ ও সাধারণ কারণে সে অন্যদের ওপর চড়াও হতো, কখনো হাত দিয়ে আবার কখনো লাঠি দিয়ে আঘাত করত। মাদক আমাদের সামাজিক কাঠামোর একটি অত্যন্ত ভয়ংকর ব্যাধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু সীমিত পরিসরে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল।
পুনরায় বলা যায় যে আমাদের জাতীয় সমস্যাগুলোর পরিধি এত ব্যাপক যে কোনো একক প্রচেষ্টায় সেগুলোর স্থায়ী সমাধান অর্জন করা সম্ভব নয়। এই গভীর সংকটগুলো উত্তরণ করতে হলে সুশৃঙ্খল ও সংঘবদ্ধভাবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে এবং সেই শৃঙ্খলার বুনিয়াদ রচনা করতে হবে একদম শীর্ষ পর্যায় থেকে। নীতিনির্ধারক মন্ত্রীরা কেবল নীতি প্রণয়ন করবেন এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিজ নিজ দাপ্তরিক দায়িত্ব অনুযায়ী তা বাস্তবায়ন করবেন। এই সুনির্দিষ্ট চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলার অবকাঠামো যদি সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এই পুরো নিবন্ধটি রচনা করেছেন বিশিষ্ট শিক্ষক, লেখক ও খ্যাতনামা রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালেহ উদ্দিন আহমদ।
জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর