ঢাকা | বঙ্গাব্দ

এআই ডেটা ব্যবসায় সফল আলেকজান্ডার ওয়াং এখন মেটার নেতৃত্বে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Oct 22, 2026 ইং
এআই ডেটা ব্যবসায় সফল আলেকজান্ডার ওয়াং এখন মেটার নেতৃত্বে ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য তথ্য বা ডেটা প্রস্তুতের ব্যবসায় নেমেছিলেন আলেকজান্ডার ওয়াং। বর্তমান সময়ে এসে এই উনিশ বছর বয়সী তরুণ উদ্যোক্তা বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেটার এআই কৌশল নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তাঁর এই অভাবনীয় সাফল্য কেবল একজন ব্যক্তির এগিয়ে যাওয়ার গল্প নয়, বরং বৈশ্বিক এআই শিল্পে ডেটা, মেধা এবং বিশাল বিনিয়োগের ক্রমবর্ধমান চাহিদার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা উঠলেই সাধারণত চ্যাটবট, অতি শক্তিশালী কম্পিউটার কিংবা জটিল সব অ্যালগরিদমের কথা সবার আগে মনে আসে। অথচ এসব প্রযুক্তিকে পুরোপুরি কার্যকর ও সচল রাখতে উচ্চমানের ডেটার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। সঠিক উপায়ে তথ্য শনাক্ত এবং সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করা না গেলে কোনো এআই মডেলকে নির্ভরযোগ্যভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া কখনোই সম্ভব হয় না।

মাত্র উনিশ বছর বয়সে এই সম্ভাবনার দিকটি স্পষ্টভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন আলেকজান্ডার ওয়াং। ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যয়নের সময় বন্ধু লুসি গুওকে সঙ্গে নিয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'স্কেল এআই'। এরপর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা পুরোপুরি বাদ দিয়ে তিনি মনোনিবেশ করেন নিজের গড়ে তোলা ব্যবসায়।

স্কেল এআইয়ের মূল কাজ ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় সব ডেটা নিখুঁতভাবে প্রস্তুত করা। একদম শুরুতে স্বচালিত গাড়ির মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জন্য তথ্য চিহ্নিত ও শ্রেণিবদ্ধ করার কাজ করত এই প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে এআই প্রশিক্ষণের উপযোগী নানা ডেটা সরবরাহ এবং মডেলের কার্যকারিতা যাচাইসহ বেশ কিছু নতুন সেবা এর সঙ্গে যুক্ত হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার যত বেশি দিন ধরে বাড়তে থাকে, এই ডেটা প্রস্তুতির কাজ ততই অপরিহার্য হয়ে উঠতে শুরু করে। কারণ উন্নত মডেল তৈরির ক্ষেত্রে শুধু কম্পিউটিং ক্ষমতা বাড়ালেই চলে না, বরং মডেলকে সঠিকভাবে শেখানোর উপযোগী উপাত্তেরও প্রয়োজন হয়। স্কেল এআইয়ের গোটা ব্যবসায়ের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে ছিল মূলত এই বিশেষ চাহিদার ওপরই।

স্কেল এআইয়ের এই দ্রুত সম্প্রসারণ ওয়াংকে খুব অল্প সময়েই প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম আলোচিত একজন তরুণ উদ্যোক্তায় পরিণত করে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য বহুগুণ বাড়ার পর কম বয়সেই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ বিলিয়ন ডলারের কোঠা ছাড়িয়ে যায়। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী সেলফ-মেড বা নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা বিলিয়নিয়ার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।

তবে তাঁর এই সাফল্যের তাৎপর্য শুধু ব্যক্তিগত অর্থসম্পদের পরিসরে আটকে নেই। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডেটা প্রস্তুত ও মূল্যায়নের মতো নেপথ্যের কাজগুলোর গুরুত্বও মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময়ের প্রযুক্তির অন্তরালে থাকা এই সাধারণ কাজই একসময় বিশাল এক ব্যবসায়ের শক্ত ভিত হয়ে দাঁড়ায়।

২০২৫ সালের দিকে ওয়াংয়ের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। মেটা এই স্কেল এআই প্রতিষ্ঠানে ১৪ দশমিক চার বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং এর ৪৯ শতাংশ অংশীদারত্ব কিনে নেয়। এই বাণিজ্যিক চুক্তির সময় স্কেল এআইয়ের মোট মূল্যায়ন গিয়ে ঠেকেছিল ২৯ বিলিয়ন ডলারে। এরপর ওয়াং সরাসরি মেটার এআই কার্যক্রমে যুক্ত হন এবং প্রতিষ্ঠানটির সুপারইন্টেলিজেন্স উদ্যোগের নেতৃত্বের গুরুদায়িত্ব নেন।

মেটার এই কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল এআইয়ের প্রতিযোগিতায় সবার চেয়ে এগিয়ে থাকা। ওপেনএআই, গুগল ও অ্যানথ্রপিকের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানগুলো যখন উন্নত এআই মডেল তৈরিতে তাদের বিনিয়োগ ক্রমাগত বাড়িয়ে চলেছিল, তখন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিস্থিতিতে দক্ষ গবেষক ও প্রকৌশলীদের একছাদের নিচে আনা এবং এআই উন্নয়নের জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো গড়ে তোলা প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়ায়।

ফলে ওয়াংয়ের বর্তমান দায়িত্ব কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়নের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই। মেটার নিজস্ব এআই গবেষণা দল গঠন করা, দক্ষ কর্মী দল আকৃষ্ট করা এবং অত্যাধুনিক মডেল তৈরির সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার কাজেও তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই তীব্র দৌড়ে কেবল প্রযুক্তির নয়, বরং মেধা ও প্রতিভারও সরাসরি প্রতিযোগিতা চলছে। অভিজ্ঞ গবেষক ও প্রকৌশলীদের নিজেদের দলে ভেড়াতে বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন পানির মতো অর্থ খরচ করছে। সেই সঙ্গে দ্রুত উন্নত মডেল তৈরি, সেগুলোকে মানুষের বাস্তব কাজের উপযোগী করে তোলা এবং বাজারের প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলার চাপও দিন দিন বেড়েই চলেছে।

২০২৬ সালের দিকে মেটার নতুন এআই মডেল এবং মিউস উদ্যোগ নিয়ে নানামুখী আলোচনার পাশাপাশি ওয়াংয়ের ভূমিকাও নতুন করে সামনে আসে। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা কাজে সাধারণ মানুষের জন্য আরও বেশি কার্যকর এআই সহকারী তৈরি করা। তবে এ ধরনের প্রযুক্তি শেষ পর্যন্ত কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে মডেলের নিজস্ব সক্ষমতার পাশাপাশি এর বাস্তব ব্যবহার, নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলোর ওপরও।

অবশ্য আলেকজান্ডার ওয়াংয়ের বর্ণিল ক্যারিয়ার সবসময় বিতর্কের বাইরে থাকতে পেরেছে এমন নয়। স্কেল এআইয়ের ডেটা সংগ্রহ ও প্রস্তুতের পুরো প্রক্রিয়া এবং চুক্তভিত্তিক কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিগত ২০২৬ সালে ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনে প্রতিষ্ঠানটির হয়ে কাজ করা বেশ কয়েকজন কর্মী তাঁদের কাজের দায়িত্বের ধরন এবং অনলাইনে প্রাপ্ত ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে স্কেল এআইও এসব কাজের সুযোগ ও কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে বক্তব্য দিয়েছে।

এ ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, এআই প্রশিক্ষণের জন্য বিপুল পরিমাণ ডেটা সংগ্রহের বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে শ্রমের সঠিক পরিবেশ, মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং তথ্য ব্যবহারের নৈতিকতার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রযুক্তি যত বেশি সামনের দিকে এগোবে, এসব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তাও ততো বেশি বৃদ্ধি পাবে।

২০২৬ সালের জুলাই মাসে ওয়াই কম্বিনেটরের আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে নিজের আঠারো বছর বয়সী তরুণ সত্তাকে নানা পরামর্শ দিতে গিয়ে ওয়াং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করার কথা বলেন। অন্যদের নানা মতামতের ভিড়েও নিজের সেই ধারণার ওপর অগাধ আস্থা রাখার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন। এআইয়ের মতো অতি দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা চিহ্নিত করা এবং সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে কাজ শুরু করাও তাঁর বক্তব্যের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল।

তবে তাঁর এই বর্ণিল ক্যারিয়ার থেকে সাধারণ মানুষের এটি শিক্ষা নেওয়া কখনোই উচিত হবে না যে, সফল হওয়ার জন্য প্রত্যেককেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে ব্যবসায় নেমে পড়তে হবে। বরং সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবর্তনশীল প্রযুক্তি সম্পর্কে সম্যক ধারণা অর্জন করা, বাস্তব জীবনের সমস্যাগুলো নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করা এবং সেগুলোর টেকসই ও কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা।

২০১৬ সালে ওয়াং ডেটার যে অভাবনীয় প্রয়োজনের কথা ভেবে এটিকে ব্যবসার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে এআই শিল্পের অবিশ্বাস্য বিস্তার তাঁর সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা ও গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে উনত্রিশ বছর বয়সে এসে তিনি মেটার এআই ভবিষ্যৎ গঠনের এই তুমুল প্রতিযোগিতায় একেবারে সামনের সারিতে অবস্থান করছেন।

তাঁর এই পুরো যাত্রাপথ শেষ পর্যন্ত আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন বড় করে তুলে ধরে—ভবিষ্যতের প্রযুক্তিতে সবথেকে বড় সুযোগ আসলে কোথায় তৈরি হবে? কেবল নতুন কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করার মাঝে, নাকি সেই প্রযুক্তিকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের জন্য পুরোপুরি কার্যকর করে তোলার প্রয়োজনীয় সমস্যাগুলোর সমাধান করার মাঝেই?


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
আজমিরীগঞ্জে কালনী নদী থেকে নিখোঁজ গৃহবধূ মরিয়ম বিবির মরদেহ উ

আজমিরীগঞ্জে কালনী নদী থেকে নিখোঁজ গৃহবধূ মরিয়ম বিবির মরদেহ উ