ঢাকা | বঙ্গাব্দ

পাঁচ দশক ধরে বন্য প্রাণীর খোঁজে ড. রেজা খান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Nov 7, 2026 ইং
পাঁচ দশক ধরে বন্য প্রাণীর খোঁজে ড. রেজা খান ছবির ক্যাপশন:
ad728

নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর

প্রকৃতির প্রতিটি রূপ বদল এবং পরিবর্তনের পেছনে সবসময় একটি বিশেষ গল্প লুকিয়ে থাকে, আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকেন সাধারণ মানুষও। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রকৃতির সেই অজানা গল্প ও বন্য প্রাণীর খোঁজ করে চলেছেন বিশিষ্ট বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. রেজা খান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষকতা দিয়ে তাঁর বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৩ সালে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন চিড়িয়াখানায় যোগদান করেন এবং এর কিছু বছর পর ১৯৮৯ সালে দুবাই চিড়িয়াখানার প্রধান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর সরাসরি নেতৃত্বে দেশের বন্য প্রাণীদের একটি নতুন লাল তালিকা তৈরির কাজ চলছে। প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত এক সাক্ষাৎকারে তিনি হারিয়ে যাওয়া পাখি, বনের পথ চেনানো অভিজ্ঞ মানুষ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে যাওয়া নানা পেশার কথা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সাংবাদিক রাজীব হাসান।

প্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে ড. রেজা খান একটি বিশেষ বাদি হাঁসের উদাহরণ টেনেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইছড়ি ও লংগদু এলাকার এই হাঁসটি ছিল আমাদের দেশের একমাত্র সারা বছর বনে টিকে থাকা হাঁস, যা গাছের অনেক উঁচুতে কোটরে বাসা বাঁধত। ১৯৭৭ সালে ডক্টরেট শেষ করে দেশে ফিরে তিনি পাবলাখালীতে এক ছাত্রের কাজ দেখতে গিয়ে দেখেন বন প্রায় শেষ। দেশলাইয়ের কাঠি তৈরির জন্য বাদি হাঁসের আশ্রয়স্থল সিভিটগাছ কেটে ফেলায় হাঁসগুলো শিমুল ও ছাতিমগাছে ১০ মিটারের কম উচ্চতায় বাসা বাঁধতে বাধ্য হয়। স্থানীয় মানুষ এই সুযোগে ডিমের খোলস ফোটার শব্দ শুনে ডিম নামিয়ে পালা হাঁসের সঙ্গে রেখে বাচ্চা ফুটিয়ে বড় করত। কাপ্তাই হ্রদ হওয়ার পর খালের মতো হওয়া ছড়াগুলো আজ সম্পূর্ণ শুষ্ক এবং বাঘাইছড়ি পর্যন্ত সড়ক তৈরি হয়েছে। বন উজাড়, দেশলাই কারখানা ও মানুষের জীবিকা কীভাবে একটি হাঁসের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল, তার সেই গল্পটি পশ্চিমা দেশগুলোর মতো আমরা নথিভুক্ত না করায় চিরতরে হারিয়ে গেছে।

বনের অন্দরমহল ও পথ চেনানোর বিষয়ে ড. রেজা খান স্মরণ করেছেন ১৯৭৯ সালের একটি ঘটনার কথা, যখন তিনি টেকনাফ থেকে হেঁটে আসার পরিকল্পনা করেছিলেন। তখন হাতে কোনো পর্যাপ্ত টাকাপয়সা বা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অর্থায়নের প্রকল্প ছিল না। এক বনকর্মী তাঁকে এক পালোয়ানের সন্ধান দেন এবং নিজের ঘর ছেড়ে দিয়ে অন্যের বাড়িতে ঘুমাতে যান। সকালে দেখা যায় সেই পালোয়ান একজন রোগা ও খুঁড়িয়ে হাঁটা সাধারণ মানুষ। বনে ঢোকার আগে তিনি মাটি থেকে ধুলা তুলে বাতাসে উড়িয়ে বাতাসের দিক দেখে হাতির উপস্থিতি বোঝার যে কৌশল শিখিয়েছিলেন, তা তিনি কোনো বইয়ে পাননি। বনের পাশে বসবাসকারী একজন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে পাওয়া এই জ্ঞান তিনি পরবর্তীতে বহু ছাত্রকে বলেছেন।

মানুষ এবং বন্য প্রাণী একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করতে পারে কি না, এই প্রশ্নের জবাবে ড. রেজা খান অতীত দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। অতীতে গ্রামের খোপ থেকে শিয়াল বা বনবিড়াল কবুতর ও মুরগি নিয়ে গেলেও মানুষ সন্ধ্যায় লাঠি নিয়ে পাহারা দিত এবং মাঝেমধ্যে মুরগি চলে যাওয়া মেনে নিত; সবাই মিলে দল বেঁধে শিয়াল মারতে যেত না। কিন্তু সেই পুরনো সহনশীলতা ও প্রকৃতির প্রতি মমত্ববোধ আজ আর সমাজে অবশিষ্ট নেই। সেদিন কিছু তরুণ-তরুণী একটি পাখি দেখতে গিয়ে অতিরিক্ত হইচই ও রেডিও বাজানোয় পাখিটি দূরে চলে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, আমরা মানুষকে শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের শিক্ষা দিয়েছি, প্রকৃতির আসল শিক্ষা দিইনি। ফুল ফুটলে তা ছিঁড়ে আনা, ফল পেড়ে ফেলা কিংবা সাপ ও শিয়াল দেখলে ঢিল মেরে বা মেরে ফেলার শিক্ষাই দেওয়া হয়, যা প্রকৃতির প্রতি মমতার শিক্ষা দেয় না।

কৃষক পরিবার ও সমাজের অবক্ষয় প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, আমরা মূলত কৃষকের জাতি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের স্কুলের শিশুরা চাষাবাদের কোনো বাস্তবিক জ্ঞান রাখে না। স্কুলগুলোতে একখণ্ড জমি বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষার্থীদের নিজ হাতে ফসল বা ফুল-ফলের বাগান তৈরি করার সুযোগ দিলে তবেই মাটি ও গাছের প্রতি প্রকৃত মমতা গড়ে উঠবে, কেবল জিপিএ দিয়ে কাঙ্ক্ষিত কিছু হবে না। প্রাণীদের অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, মানুষের পাশে সাহায্যের জন্য কেউ না কেউ দাঁড়াতে পারলেও অসহায় প্রাণীদের সেই উপায় থাকে না, তাদের নিঃশব্দে মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়।

নদীমাতৃক দেশের নদী শুকিয়ে যাওয়ার করুণ চিত্র তুলে ধরে ড. রেজা খান তাঁর নিজের গ্রাম ধামরাইয়ের বালিয়া গ্রামের উদাহরণ দেন। নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় সেখানে জেলে, নিজের জমি চাষ করা ছোট কৃষক কিংবা বংশপরম্পরার খেয়াঘাটের মাঝি—সব পেশা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অতীতে মাঝিরা টাকা না নিয়ে বছর শেষে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান নিতেন এবং নাপিতরাও চুল কেটে ধান নিতেন, যা আজ আর নেই। পঞ্চাশের দশকেও যমুনা হয়ে আসামের দিকে স্টিমার চলাচল করলেও আজ সেই নদী ও খালের অস্তিত্ব হারিয়ে সরু খালে পরিণত হয়েছে এবং বাড়ি পাশের খালে এখন গাড়ি চালিয়ে যাতায়াত করতে হয়।

গ্রামের মানুষের পেশা পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের জমি প্রভাবশালী ও অর্থশালীদের হাতে চলে যাওয়ায় গরিব মানুষ ভাসমান শ্রমিক হিসেবে অন্য জেলায় কাজ খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। পাহাড়েও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে, যেখানে বনের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রভাবশালীরা ওপরে উঠে গেছে। বন্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও গ্রামের ৮০ শতাংশ প্রাণী আজ হারিয়ে গেছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে স্তন্যপায়ী প্রাণীদের। একসময় প্রতিটি বাড়ির পেছনের ঝোপে খাটাশ, বেজি ও গন্ধগোকুল দেখা গেলেও আজ তা আর নেই। প্রকৃতির এই ভারসাম্যহীনতা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে সচেতন হয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।

সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।


নিউজটি পোস্ট করেছেন : জাতীয় দৈনিক মুক্ত কণ্ঠস্বর

কমেন্ট বক্স
কালো লেদার লুকে ইনস্টাগ্রামে ঝড় তুললেন কারিনা

কালো লেদার লুকে ইনস্টাগ্রামে ঝড় তুললেন কারিনা