
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে। গত শনিবার ‘নো কিংস’ বা ‘আমাদের কোনো রাজা নেই’ শীর্ষক এই প্রতিবাদ আন্দোলনের ব্যানারে প্রায় তিন হাজার পৃথক কর্মসূচি পালিত হয়। এবারের আয়োজনে বড় আকৃতির জনসভার পরিবর্তে ক্ষুদ্র পরিসরের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরাসরি সাধারণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়। আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নাগরিকদের আগাম ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করাই ছিল এই বিক্ষোভের প্রধান উদ্দেশ্য।
বর্তমান সময়ে ইরান সংক্রান্ত সংঘাতের জেরে মার্কিন মুল্লুকে জ্বালানি তেলের মূল্য এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। এর পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সূচকও বর্তমানে রেকর্ড পরিমাণে হ্রাস পেয়েছে। এই সমস্ত বাস্তব পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি মার্কিন কংগ্রেসে তাদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
গত শনিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডি সি থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক এবং লস অ্যাঞ্জেলেসসহ দেশের উভয় প্রান্তের অসংখ্য বড় ও ছোট শহরে নো কিংস আন্দোলনের কর্মীরা রাজপথে নেমে আসেন। কোথাও কোথাও মোটর শোভাযাত্রা বের করে গাড়ির হর্ন বাজানো হয়, কোথাও বা সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আবার কোথাও সাধারণ জমায়েতের মধ্য দিয়ে তাদের নির্ধারিত কর্মসূচিগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের কার্যভার গ্রহণের পর থেকে এটি ছিল নো কিংস আন্দোলনের চতুর্থ দফার বিক্ষোভ। গত বছরের জানুয়ারি মাসে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনভার গ্রহণ করার পরপরই এই প্রতিবাদ আন্দোলনটি আত্মপ্রকাশ করে। আন্দোলনকারী নাগরিকদের অভিমত হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেকে দেশের প্রচলিত আইনের ঊর্ধ্বে বা একচ্ছত্র রাজা হিসেবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালাচ্ছেন, যা মার্কিন সংবিধানের মৌলিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
নো কিংস প্ল্যাটফর্মের কর্মীরা কেবল বর্তমান রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে নিজেদের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশের মাঝেই এবারের কর্মসূচি সীমাবদ্ধ রাখেননি। এর পাশাপাশি তাঁরা সাধারণ ভোটারদের নাম নিবন্ধন করার প্রক্রিয়া এবং ভোটদানের সঠিক নিয়মকানুন সম্পর্কে সচেতন করে তোলার চেষ্টা চালিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব নির্বাচনি এলাকায় ইতিমধ্যে আগাম ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে, সেসব অঞ্চলে ভোটারদের উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ বহুগুণ বাড়িয়ে তোলাটাই ছিল তাঁদের মূল লক্ষ্য।
ওয়াশিংটন শহরের ক্যাপিটল হিল এলাকার কাছাকাছি খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি প্রতিরোধী ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে অবস্থান করছিলেন এক ষাটোর্ধ্ব অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সাবিন কার্লসন। তাঁর হাতে ধরা সেই বিশেষ ছাতার গায়ে বড় হরফে লেখা ছিল ‘ভোট, ক্ষমতা, জনগণ’ এই স্লোগানটি। ৬৬ বছর বয়সি এই ডেমোক্র্যাট সমর্থক নাগরিক মন্তব্য করেন যে, সরকারের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করা কিংবা নানা বিষয়ে অভিযোগ করা তুলনামূলক সহজ কাজ, কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি কাজটি হলো ব্যালট বাক্সে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করা।
কার্লসনের মতে, প্রতিটি সচেতন ভোটারকে অবশ্যই পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে যে তাঁদের ভোটটি কোথায় এবং কোন পদ্ধতিতে দিতে হবে, কিংবা তাদের ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে কি না। ভুল কোনো ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে সাধারণ মানুষ যাতে কোনো ধরনের ভোগান্তি বা সমস্যার মুখে না পড়েন, সে বিষয়েও আগে থেকেই পর্যাপ্ত সচেতনতা তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ ভূখণ্ডে মূল নির্বাচনের নির্দিষ্ট দিনেরও বেশ কিছুদিন আগ থেকেই ভোটারদের ভোট প্রদান করার সাংবিধানিক সুযোগ রয়েছে। নো কিংস আন্দোলনের প্রধান আয়োজকেরা মূলত ভোটারদের জন্য উপলব্ধ সেই সুবিধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার বিষয়টিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করতে চাইছেন।
জনগণের ভোটাধিকার সুরক্ষা নিয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করে চলা সংগঠন ‘কমন কজ’-এর অন্যতম তৃণমূল সংগঠক আলমা কুভার্থি এই প্রসঙ্গে নিজের মতামত ব্যক্ত করে বলেন যে, ভোটদান প্রক্রিয়াটিকে সাধারণ মানুষ যেন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা না ভেবে নিজেদের রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যম, গুরুদায়িত্ব পালন এবং একই সঙ্গে একটি উৎসবমুখর আনন্দের কাজ হিসেবে বিবেচনা করেন, সেটাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই পোস্টাল ব্যালট বা ডাকযোগে ভোটদানের প্রচলিত ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে আস চলেছেন। বিপরীত দিকে, আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের মনে প্রবল শঙ্কা রয়েছে যে আসন্ন নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীরা যদি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হন, তবে ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অহেতুক প্রশ্ন তোলার কিংবা তা পণ্ড বা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চালানো হতে পারে। মূলত এই ধরনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক আশঙ্কার কারণেই তাঁরা সাধারণ ভোটারদের মাঝে আগাম ভোটদানের বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করছেন।