
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মা ইলিশ সংরক্ষণের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় পদ্মা নদীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের সরাসরি উপস্থিতিতে পরিচালিত বিশেষ অভিযানে চড়াও হয়েছেন জেলেরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে আক্রমণকারী জেলেদের ইটপাটকেলের আঘাতে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার কমপক্ষে পাঁচজন সদস্য জখম হয়েছেন। এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি ও হামলার ঘটনায় সবমিলিয়ে একচল্লিশজন জেলেকে আটক করা হয়েছে।
সোমবার প্রত্যুষে জাজিরা উপজেলার পালেরচর ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মা নদীর কলিকাল চর এলাকায় এই আকস্মিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শরীয়তপুর-১ (সদর ও জাজিরা) আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ এই অভিযানে নেতৃত্ব দেন। ওই সময় তিনি মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে একটি স্পিডবোটে অবস্থান করছিলেন।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব জানান, মা ইলিশ সুরক্ষার টহলের সময় মৎস্য অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালান জেলেরা। সেই সময় স্থানীয় সংসদ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। আজকের এই সাড়াশি অভিযান থেকে একচল্লিশ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং প্রত্যেককে যথাযথ আইনের আওতায় আনা হবে।
মৎস্য অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ রক্ষার্থে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। এই সময়ে মাছ ধরা, কেনাবেচা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া এবং সংরক্ষণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যা আগামী ২২ অক্টোবর পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাজিরা, নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্টে পদ্মা নদীতে এখনো মা ইলিশ শিকার চলছে।
মৎস্য দপ্তরের বিবরণীতে প্রকাশ, নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ চলাকালেও জেলার নদীতীরবর্তী কমবেশি ২৫টি পয়েন্টে দেদারছে ইলিশ কেনাবেচা চলছে। এসব স্থানে ইলিশ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে দিনরাত মানুষের ভিড় লেগেই রয়েছে। মৎস্য বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং কোস্টগার্ড যৌথভাবে অভিযান চালিয়েও ইলিশ ধরা পুরোপুরি রোধ করতে পারছে না।
এই প্রেক্ষাপটে ইলিশ নিধন চিরতরে বন্ধ করতে নিজে মাঠে নেমে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ। সোমবার ভোরে তাঁর নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মৎস্য কর্মকর্তাদের একটি দল জাজিরার বিলাসপুর ইউনিয়নের শফি কাজীর মোড় থেকে পদ্মা নদীতে প্রবেশ করে। শফি কাজীর মোড় থেকে শুরু করে পালেরচর পর্যন্ত টানা চার ঘণ্টা ব্যাপী চলা এই অভিযানে একচল্লিশ জন জেলেকে আটক করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্যমতে, এই সময় ইলিশ ধরার কাজে ব্যবহৃত দুই লাখ মিটার জাল বাজেটাপ্ত করা হয়েছে।
অভিযান দলের বিবরণ অনুযায়ী, দলটি পালেরচর ইউনিয়নের পদ্মা নদীর উত্তর সীমানার কলিকাল চরে পৌঁছানোর পরই হামলার মুখোমুখি হয়। শতাধিক জেলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটার পাশাপাশি বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়তে শুরু করে। এই অতর্কিত হামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত পাঁচজন সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হন।
পরবর্তীতে পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সদস্যরা পাল্টা ধাওয়া দিয়ে হামলাকারী জেলেদের ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং বেশ কয়েকজন জেলেকে নদীর চরের নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আটকে রাখেন। সংসদ সদস্য সাঈদ আহমেদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, যারা আইন অমান্য করে মা ইলিশ শিকার ও ব্যবসা করবে, তাদের সবাইকে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।
ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহমেদ জানান, উক্ত অভিযানে কিছু জেলেকে আটকের পর সেখানে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য এখনও ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তারা ফিরে এলে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ জানা সম্ভব হবে।
এর আগে গত রোববার মা ইলিশ সুরক্ষায় সরাসরি নদীতে নেমে পাহারা দেন চাঁদপুর-৩ (সদর-হাইমচর) আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ। এদিন বিকেলে স্পিডবোটে চড়ে মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে হঠাৎ পরিদর্শনে যান তিনি। ওই সময় অবৈধ কারেন্ট জাল ও নৌকা জব্দ করার পাশাপাশি জেলেরা যেন নদীতে না নামে সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দেন।
এদিকে শরীয়তপুর জেলায় তালিকাভুক্ত জেলের মোট সংখ্যা ৩৩ হাজার। এর ভেতর শুধু ইলিশ ধরে ও বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন ২৮ হাজার ৯২৯ জন। গত ৮ অক্টোবর থেকে একটানা ২২ দিন নদীতে মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় এই সমস্ত জেলেকে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে খাদ্যসহায়তা বাবদ মাথাপিছু ২৫ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ কুমার দেব উল্লেখ করেন, এরপরেও জেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কিছু লোভী জেলে নিষেধাজ্ঞা না মেনে ইলিশ শিকার অব্যাহত রেখেছে। তাদের ধরতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং গত ১০ দিনে বিশটি অভিযান সম্পন্ন করে বাহাত্তর জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।