
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
অভিবাসননীতি ও প্রাদেশিক ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার বিষয়েও আজ ১৯ অক্টোবর নিজেদের রায় জানাবেন আলবার্টার ভোটাররা। মোট ১০টি প্রশ্নের এই গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুবিধা, নির্বাচনে ভোট দেওয়ার যোগ্যতা এবং প্রাদেশিক ক্ষমতা বাড়ানোর মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়টি হলো, আলবার্টা কি কানাডার প্রদেশ হিসেবেই বহাল থাকবে, নাকি ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে।
গণভোটের আগে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, ফেডারেল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভ এবং আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ—তিনজন শীর্ষ নেতাই আলবার্টাকে কানাডার অংশ হিসেবে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে অভিবাসন ও সাংবিধানিক ক্ষমতা নিয়ে গণভোটের বাকি প্রশ্নগুলোতে তাঁদের অবস্থান ভিন্ন।
প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি আলবার্টার বাসিন্দাদের কানাডার সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ১২ অক্টোবর কানাডার থ্যাংকসগিভিং উপলক্ষে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, আলবার্টার বাসিন্দাদের সামনে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছে। তাঁদের সামনে কানাডার অংশ হিসেবে থাকা অথবা বিচ্ছিন্নতার দীর্ঘ ও অনিশ্চিত প্রক্রিয়া শুরু করার পথ খোলা রয়েছে।
আলবার্টায় বেড়ে ওঠা কার্নি উল্লেখ করেন যে, কানাডার বিভিন্ন প্রদেশকে সবসময় একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে হবে। আলবার্টার জ্বালানি খাত ও অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য নতুন প্রকল্প এবং পশ্চিম উপকূলে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগের কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর মতে, বিভক্তি তৈরি হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন বেশ কঠিন হয়ে পড়বে।
এরপর গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর আলবার্টায় পৃথক সমাবেশ ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কার্নি আবারও ঐক্যবদ্ধ কানাডার পক্ষে ব্যাপক প্রচার চালান। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, বিচ্ছিন্নতার পথে পা বাড়ালে বড় ধরনের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিরোধী দলের নেতা পিয়েরে পয়লিয়েভও আলবার্টাকে কানাডার অংশ হিসেবে রাখার পক্ষে জোরালো প্রচার চালিয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর ক্যালগারিতে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, আলবার্টার অনেক বাসিন্দার মনে যে ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে, তার পেছনে যথেষ্ট বাস্তব কারণ রয়েছে। তবে কানাডা ছেড়ে চলে যাওয়া এসব সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না।
পয়লিয়েভের মতে, আলবার্টার মানুষের অসন্তোষের মূল কারণ হলো অটোয়ায় অবস্থিত কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত। জ্বালানি খাতের ওপর নানা বিধিনিষেধ, তেল ও গ্যাসের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে না পারা এবং জীবনযাত্রার বর্ধিত ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগের বিষয়গুলো তিনি তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, আলবার্টার উচিত দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরিবর্তে ফেডারেল কাঠামোর ভেতরে থেকেই নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া। ফেডারেল সরকারের নীতিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন এনে জ্বালানি খাতের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
অন্যদিকে, আলবার্টার প্রিমিয়ার ড্যানিয়েল স্মিথ নিজেই এই গণভোটের উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। তবে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্পূর্ণ বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
গত ১৪ অক্টোবর আগাম ভোট দেওয়ার পর প্রিমিয়ার স্মিথ গণমাধ্যমকে জানান যে, ১০ নম্বর প্রশ্নে তিনি আলবার্টাকে কানাডার সঙ্গেই রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন। তবে এর বিপরীতে প্রথম নয়টি প্রশ্নকেই তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন।
স্মিথের সুনির্দিষ্ট যুক্তি হলো, আলবার্টার সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মনে করছেন যে অটোয়ার নীতিনির্ধারকেরা তাঁদের স্থানীয় উদ্বেগগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব দিচ্ছেন না। সেই কারণে অভিবাসন, সামাজিক সেবা এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার ক্ষেত্রে প্রদেশের নিজস্ব কর্তৃত্ব বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি।
তিনি দাবি করেন যে, আলবার্টার জ্বালানি খাতের সঠিক উন্নয়ন এবং প্রাদেশিক স্বার্থ সংরক্ষণে ফেডারেল সরকারের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। তাঁর মতে, কানাডার সংঘবদ্ধ কাঠামোর ভেতরে থেকেই আলবার্টার স্বার্থ রক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
স্মিথ সরকার জানিয়েছে যে, এই গণভোটের মূল উদ্দেশ্য হলো প্রদেশের মানুষের সুনির্দিষ্ট মতামত জানা এবং অভিবাসন ও সাংবিধানিক বিষয়ে ভবিষ্যতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, সেটির জন্য জনসমর্থন যাচাই করা।
ইলেকশনস আলবার্টার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই গণভোটে মোট ১০টি প্রশ্ন রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম নয়টি প্রশ্নের উত্তর ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দিয়ে দিতে হবে। আর দশম প্রশ্নের ক্ষেত্রে দুটি বিকল্পের মধ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। গণভোটের এই ফলাফল সরকারকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিলেও প্রশ্নগুলোর ফলাফল আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক নয়।
ভোটারদের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নগুলো মূলত তিনটি প্রধান বিষয়ে বিভক্ত রয়েছে। প্রথম বিষয়টি হলো অভিবাসন ও সামাজিক সুবিধা, যেখানে অভিবাসনের ওপর প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত কিছু বিশেষ সেবা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণ, অস্থায়ী অভিবাসন-স্ট্যাটাসধারীদের সামাজিক সহায়তা পাওয়ার শর্ত হিসেবে ১২ মাস আলবার্টায় বসবাসের বাধ্যবাধকতা এবং স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য ফি বা প্রিমিয়াম নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া প্রাদেশিক নির্বাচনে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকত্বের প্রমাণ বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও এর অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয় বিষয়টি হলো সাংবিধানিক ও প্রাদেশিক ক্ষমতা। এ অংশে প্রাদেশিক আদালতের বিচারক নিয়োগ, ফেডারেল সিনেট বিলুপ্ত করা, ফেডারেল বিভিন্ন কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রাদেশিক আইনের অগ্রাধিকার বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
তৃতীয় এবং শেষ বিষয়টি হলো কানাডা থেকে বিচ্ছিন্নতার প্রক্রিয়া। এই অংশে আলবার্টা কি কানাডার প্রদেশ হিসেবেই থাকবে, নাকি বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ভবিষ্যতে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করবে—সে বিষয়ে ভোটারদের সুনির্দিষ্ট মতামত চাওয়া হয়েছে।
তবে এই ১৯ অক্টোবরের ভোটের মাধ্যমে কি আলবার্টা সরাসরি কানাডা থেকে আলাদা হয়ে যাবে? এর উত্তর হলো না। এটি সরাসরি কোনো স্বাধীনতা ঘোষণা বা কানাডা থেকে চূড়ান্তভাবে আলাদা হয়ে যাওয়ার গণভোট নয়।
দশম প্রশ্নে যদি বিচ্ছিন্নতার পক্ষে পর্যাপ্ত সমর্থন পাওয়া যায়ও, তবে পরবর্তী সময়ে একটি বাধ্যতামূলক গণভোট আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুধু শুরু করার বিষয়টি সামনে আসবে। এমনকি এরপরও বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে সাংবিধানিক বিধান, দীর্ঘ আলোচনা এবং নানা আইনি জটিলতা সফলভাবে মোকাবিলা করতে হবে।
কানাডার প্রচলিত সংবিধান অনুযায়ী, কোনো একটি প্রদেশ এককভাবে হুট করে দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে পারে না। বিচ্ছিন্নতার প্রশ্নে স্পষ্ট জনসমর্থন পাওয়া গেলেও তা নিজে থেকে দেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে না। তাছাড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীর চুক্তিগত অধিকার এবং তাদের সঙ্গে বাধ্যতামূলক পরামর্শের বিষয়টিও এই বিতর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ নিয়ে অতীতে আলবার্টায় বিভিন্ন আদালতের রায় ও আইনি বিরোধ দেখা গেছে।
উল্লেখ্য যে, আলবার্টা কানাডার অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানিসমৃদ্ধ প্রদেশ। তেল ও গ্যাসশিল্প, কর্মসংস্থান, করনীতি এবং ফেডারেল সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক ক্ষমতার ভারসাম্যের প্রশ্নটি দীর্ঘদিন ধরে অটোয়া ও আলবার্টা সরকারের মধ্যে মতপার্থক্যের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিচ্ছিন্নতার পক্ষে বিভিন্ন প্রচারণাও বেশ জোরালোভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, আজকের এই ১৯ অক্টোবরের ভোটের মাধ্যমে আলবার্টা রাতারাতি কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে না।
গণভোটে ভোটাররা অভিবাসন ও প্রাদেশিক ক্ষমতা নিয়ে সরকারের প্রস্তাবগুলোকে ঠিক কতখানি সমর্থন জানান এবং কানাডার সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঠিক কী ধরনের বার্তা দেন, এখন পুরো দেশের নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের দাবি, এই গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে ২০ থেকে ২৫ ভাগের বেশি মানুষ কোনোভাবেই রায় দেবে না।