
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা এবং মামলার তদন্তের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক রিমন ঘোষ গণমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করার আবেদন করা হয়েছে। গত শনিবার সন্ধ্যার দিকে তাকে আটক করা হয়।
এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সূত্র ধরে শনিবার দিবাগত রাতে উখিয়া থানার পক্ষ থেকে আরেকটি মামলা দায়ের করেন উপপরিদর্শক আশীষ সূত্রধর। ওই মামলায় রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী তানভীর আহমদ ও তাঁর ব্যবসায়িক সহযোগী নিয়াজ মোর্শেদসহ মোট ২৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
রবিবার পর্যন্ত চলা উদ্ধার অভিযানে মোট ১০ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের দাবি অনুযায়ী আরও একজন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
মৃত ব্যক্তিদের সঠিক পরিচয় নিশ্চিত করতে এবং তাদের মরদেহ স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে রবিবার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জানান, রাজধানী ঢাকার সিআইডি প্রধান কার্যালয়ে রবিবার সাতজন স্বজনের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সুবক্তগীন মাহমুদ সোহেল সংবাদমাধ্যমকে জানান, সাধারণত ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেতে প্রায় তিন থেকে চার সপ্তাহের মতো সময় লেগে যায়।
কক্সবাজার জেলার প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল মান্নান সাংবাদিকদের জানান, উদ্ধারকৃত মরদেহ ও নিখোঁজ ব্যক্তির সঠিক পরিচয় শনাক্ত করার স্বার্থে ডিএনএ পরীক্ষার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই দেহগুলো হস্তান্তরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে এই পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
উদ্ধার হওয়া দশটি মৃতদেহ বর্তমানে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুরোধ জানানোয় আপাতত মরদেহের ময়নাতদন্ত না করার একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন।
ঢাকার মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন থাকা মেহেরুননেসা সেদিনের বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে জানান, তিনি, তাঁর জীবনসঙ্গী এবং তাদের পরিচিত মালিহা ও মালিহার স্বামী আশিকুর রহমান একই কক্ষে অবস্থান করছিলেন। গত শনিবার রাতের শেষ ভাগে মালিহা পাশের কক্ষে সবাইকে ঘুম থেকে জাগাতে যান।
কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর মেহেরুননেসা পোড়া গন্ধ এবং ধোঁয়া অনুভব করতে পারেন। তখন তিনিও অন্য কক্ষে গিয়ে আগুনের ভয়াল রূপ দেখতে পান।
মেহেরুননেসা নিজের জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, বাইরে যাওয়ার কোনো পথ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন তিনি স্বামী মাসুদ ও আশিকুরকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলেন। মালিহা অন্য কক্ষে তাদের ডাকতে গিয়ে আটকা পড়েন এবং আর ফিরে আসতে পারেননি, কারণ ফেরার পথেই আগুন ছড়িয়ে পড়েছিল। এমতাবস্থায় তারা ভবন থেকে বের হওয়ার জন্য পেছনের জানালার কাঁচ ভাঙার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছিলেন।
তিনি আরও যোগ করেন, বেঁচে থাকার সব আশা তারা প্রায় ত্যাগই করেছিলেন। তাদের মনে হয়েছিল মৃত্যুর আগে বোধহয় প্রিয় মুখগুলো আর দেখা হবে না। শেষ মুহূর্তে একটি চেয়ার দিয়ে মাসুদ জানালার কাঁচ ভেঙে ফেলে। প্রথমে তিনি নিচে লাফ দেওয়ার সময় ভাঙা কাঁচের সাথে তার হাত আটকে যায়। এরপর তার স্বামী তার হাত মুক্ত করে দেন। তখন কোনো এক শক্ত জিনিসের ওপর পড়ার কারণে তার বাম পায়ের মাংসপেশি ছিঁড়ে ঝুলে যায়। এরপর তিনি এবং আশিক লাফিয়ে পড়ে কিছুটা আঘাতপ্রাপ্ত হন এবং সেখান থেকে নিজে নিজে উঠতে ব্যর্থ হন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর স্থানীয় লোকজন এসে তাদের উদ্ধার করেন।
মেহেরুননেসা বর্ণনা দিয়ে বলেন, কোনো রকমে কিছুটা পথ হামাগুড়ি দিয়ে তারা ধানখেতের ভেতরে গিয়ে আশ্রয় নেন। বাকি কেউ সেদিন ভবন থেকে বের হতে পারেননি। অসহায়ভাবে দূরে দাঁড়িয়ে তিনি নিজ চোখের সামনে স্বজনদের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া দেখতে পান।
শনিবার রাতে মেহেরুননেসা এবং তাঁর স্বামী মাসুদ মিয়াকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে আসা হয়। সেখানে মাসুদকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর ছেড়ে দেওয়া হলেও মেহেরুননেসাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
বর্তমানে মেহেরুননেসা ওই হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন। তিনি একটি ব্যাংকের কলসেন্টারে এবং তাঁর স্বামী একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তারা উভয়েই রাজধানীর উত্তরা এলাকায় বসবাস করেন।
হাসপাতালের চিকিৎসকরা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মেহেরুননেসার দুটি হাতেই হালকা আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তবে তাঁর বাম পায়ে যে আঘাত লেগেছে তা বেশ গুরুতর। পায়ের মাংস কেটে ঝুলে পড়েছে এবং সেখানে দ্রুত অস্ত্রোপচার করতে হবে।