
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সমাজ ও পরিবারের বিভিন্ন কুসংস্কারের বেড়া ভাঙতে এবং বৈষম্যের অবসান ঘটাতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় গড়ে উঠেছে নারীদের একটি বিশেষ সংগঠন। 'উজ্জয়িনী' নামের এই সংগঠনের মাধ্যমে দীর্ঘ এক যুগ ধরে দেবী দুর্গার আরাধনা করে আসছেন স্থানীয় নারীরা।
এই ব্যতিক্রমী পূজামণ্ডপের অবস্থান কালিহাতী উপজেলার দশকিয়া ইউনিয়নের মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ায়। চাঁদা তোলা থেকে শুরু করে বাজারের ব্যাগ হাতে নেওয়া কিংবা ঢাকের বাদ্য বাজানো—আয়োজনের প্রতিটি দায়িত্ব পালন করছেন কেবল নারীরাই।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদ কালিহাতী উপজেলা শাখার জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি কাশীনাথ মজুমদার জানান, এ বছর পুরো জেলায় মোট ১ হাজার ৩৫৭টি মণ্ডপে পূজা হলেও মগড়ার এই আয়োজনটি সম্পূর্ণ আলাদা। এই অনন্য ভূমিকার জন্য উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পূজা কমিটিকে ইতিপূর্বেও পুরস্কৃত করা হয়েছে এবং এটিই জেলায় নারীদের দ্বারা পরিচালিত একমাত্র পূজামণ্ডপ।
পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ৪২ বছর বয়সী সীমা কর্মকারের ভাষ্যমতে, অতীতে হিন্দু নারীদের পরিবার ও সমাজে নানা বঞ্চনার মুখে পড়তে হতো। ঘোমটা ছাড়া বাইরে যাওয়া বারণ ছিল, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের সহশিক্ষার প্রতিষ্ঠানে যেতে বাধা দেওয়া হতো এবং স্বামীর চেয়ে বেশি পড়ালেখা করা যাবে না এমন নিয়মও চাপিয়ে দেওয়া হতো।
তিনি আরও জানান, ২০০২ সালে অনার্সে ভর্তির সময় তাকেও বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হতে হয় এবং তখনই নারীদের সংঘটিত করার তাগিদ অনুভব করেন তিনি। পরবর্তীতে গ্রামেরই আরেক বধূ সীমা কর্মকার (যিনি বয়সে বড় ছিলেন), শিপ্রা পাল ও বুলবুলি কর্মকার—এই চারজন মিলে ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন 'উজ্জয়িনী'।
ধীরে ধীরে এই সংগঠনের পরিধি বাড়তে থাকে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরাও এতে যোগ দেয়। পুরুষেরা যদি সব জায়গায় পূজার আয়োজন করতে পারে, তবে নারীরা কেন পারবে না—এই ভাবনা থেকেই তারা নিজেরাই দুর্গোৎসব আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন এবং ২০১৬ সালে সফলভাবে প্রথম পূজা সম্পন্ন করেন।
আত্মবিশ্বাস অর্জনের পর থেকে তারা প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই উৎসবের আয়োজন করে আসছেন এবং বর্তমান বছরটি তাদের ১১তম আয়োজনের সময়কাল।
সোমবার দুপুরে মগড়া গ্রামের কর্মকার পাড়ার অস্থায়ী মণ্ডপটিতে গিয়ে দেখা যায়, অষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলি শেষে নারীরা মন্দির প্রাঙ্গণেই সময় কাটাচ্ছেন এবং দর্শনার্থীরা দেবীদর্শনে আসছেন, এমনকি কোনো কোনো তরুণী ঢাকও বাজাচ্ছেন।
দর্শনার্থী সুব্রত কুমার তালুকদার টাঙ্গাইল থেকে এসেছিলেন পূজা দেখতে এবং নারীদের এমন স্বাবলম্বী আয়োজন দেখে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছেন বলে জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা তুষার কর্মকার মনে করেন, এই পূজার মাধ্যমে কেবল ধর্মীয় আচার পালন হচ্ছে না, বরং এটি নারীক্ষমতার শক্ত একটি বার্তা দিচ্ছে।
পূজা কমিটির সভাপতি ৪৮ বছর বয়সী সীমা কর্মকার জানান, শুধু পুরুষ পুরোহিত ছাড়া পূজার বাকি সব কাজ নারীরাই সম্পন্ন করেন এবং সদস্যরা নিজেরা চাঁদা দিয়ে এই খরচ চালান। শুরুতে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক থাকলেও বর্তমানে সবাই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
এছাড়া, বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সভানেত্রী সারওয়াত সিরাজ শুক্লা এই শারদীয় দুর্গোৎসবে উজ্জয়িনী সংগঠনের সকল সদস্যকে নতুন শাড়ি উপহার প্রদান করেছেন।