
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
নোয়াখালীর চাটখিলে পল্লী বিদ্যুতের একটি আবাসিক সংযোগে অস্বাভাবিক বা ভুতুড়ে বিল আসার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি হয়েছিল। অল্প কয়েকটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার করা সত্ত্বেও সেপ্টেম্বর মাসের জন্য গ্রাহককে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার বেশি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসে কর্তৃপক্ষ এবং শেষ পর্যন্ত সেই বিল সংশোধন করে মাত্র এক হাজার টাকায় নামিয়ে আনা হয়। একইসঙ্গে এই গুরুতর অবহেলার দায়ে সংশ্লিষ্ট এক কার্যালয় কর্মীকে তার কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।
চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়নের হরিকৃষ্ণপুর গ্রামের বড় তফদার বাড়ির মৃত আবু তাহেরের নামে থাকা মিটারটি তাঁর নাতি শহীদুল ইসলাম ওরফে রনি ব্যবহার করে আসছিলেন। গত মঙ্গলবার রাতে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) জুনায়েদুর রহমান সরাসরি ওই গ্রাহকের বাড়িতে উপস্থিত হন। সেখানে তিনি সংশোধিত বিদ্যুৎ বিলের মূল কাগজটি গ্রাহকের হাতে তুলে দেন এবং ঘটে যাওয়া অনভিপ্রেত ঘটনার জন্য তাঁর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন।
সংশোধিত নতুন হিসাব অনুযায়ী, ওই গ্রাহককে সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিল বাবদ মাত্র ১ হাজার ২৩৮ টাকা পরিশোধ করতে হবে। অথচ এর আগে ভ্যাট ও বিলম্ব মাশুলসহ সেপ্টেম্বর মাসের মোট বিল এসেছিল ১ লাখ ১০ হাজার ৪৯৬ টাকা। যেখানে এর আগের মাস অর্থাৎ আগস্টে বিদ্যুৎ বিল এসেছিল মাত্র ১ হাজার ৩২৬ টাকা। স্বাভাবিক সময়ে এত কম খরচ হলেও হঠাৎ করে এমন আকাশচুম্বী বিল হাতে পেয়ে ওই গ্রাহক ও তাঁর পরিবার সম্পূর্ণ হতবাক হয়ে পড়েছিলেন।
ভুক্তভোগী শহীদুল ইসলাম জানান, তাঁর বসতঘরে মাত্র কয়েকটি বৈদ্যুতিক বাতি, দুটি পাখা, একটি ফ্রিজ এবং একটি আইপিএস চালানোর কাজে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এর বাইরে ভারী বা শিল্প পর্যায়ের কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম তাঁদের ঘরে নেই বললেই চলে। বিগত পাঁচ মাসের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সময়ে গড়ে মাত্র ১৮৭ ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ হয়েছিল। অথচ সেপ্টেম্বর মাসের বিলের কাগজে বিদ্যুৎ ব্যবহার দেখানো হয়েছিল অস্বাভাবিকভাবে ছয় হাজার ইউনিট। পল্লী বিদ্যুতের বিল প্রস্তুতে নিয়োজিত কর্মীদের চরম গাফিলতি ও দায়িত্বহীন আচরণের কারণেই এমন অস্বাভাবিক ভুতুড়ে বিল তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন তিনি।
এ ঘটনায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সমিতির সেনবাগ আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মিনারুল ইসলামকে প্রধান করে গঠিত এই কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার সকালেই এই কমিটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়।
বিল সংশোধনের সত্যতা নিশ্চিত করে নোয়াখালী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মকবুল আহমদ জানান, যিনি মিটারের রিডিং সংগ্রহ করতে যান, তিনি মূলত ঠিকভাবেই রিডিং নিয়েছিলেন। কিন্তু সঠিক রিডিং নেওয়ার পরেও ঠিক কী কারণে এত বড় ভুল বিল তৈরি হলো, তা তদন্ত কমিটি গভীরভাবে খতিয়ে দেখবে। কমিটির কাছ থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই এ বিষয়ে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে এই ভুতুড়ে বিলের ঘটনার জেরে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির চাটখিল আঞ্চলিক কার্যালয়ের বিলিং সহকারী মমতাজ বেগমকে তাঁর কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মহাব্যবস্থাপক মকবুল আহমদ আরও জানান, ভুল বিলের বিষয়টি গণমাধ্যমে আসার সঙ্গে সঙ্গে পল্লী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান স্বয়ং তাঁকে ফোন করে পুরো বিষয়টি বিস্তারিত জেনে নেন। পরবর্তীতে তাঁর সুনির্দিষ্ট নির্দেশেই সংশ্লিষ্ট বিলিং সহকারীকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যাতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য সবাইকে কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।