
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
এই সপ্তাহজুড়ে চলছে শারদীয় দুর্গাপূজা। উৎসবের এই দিনগুলোতে মনে পড়ে যায় ছোটবেলার নানা স্মৃতি—পরিচিত মণ্ডপ, সন্তানদের নিয়ে দেবীর আগমন, ঢাকের বাদ্যি, শাঁখ ও ধূপের সুবাস এবং মানুষের উৎসবমুখর যাতায়াত। নতুন পোশাক পরা ছেলেমেয়েদের উল্লাস, আলোকসজ্জা এবং মিষ্টিমুখের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা সেই পরিবেশ আমাদের বেড়ে ওঠার অবিচ্ছেদ্য অংশ। উৎসবের সমাপ্তিতে আসে বিসর্জনের ক্ষণ, যেখানে ঢাকের আওয়াজ আর ভিড়ের মাঝে নদীর জলে প্রতিমা বিদায়ের মাধ্যমে তৈরি হয় এক আবেগঘন আবহ।
এবারের পূজায় শোয়েব দানিয়ালের একটি লেখার প্রসঙ্গ সামনে এসেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত ওই লেখায় তুলে ধরা হয়েছিল কীভাবে পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে কলকাতার দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে আধুনিক রূপ লাভ করেছে। উৎসবের এই দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করায়। বাংলাদেশ ও ভারত শতবর্ষ ধরে ভাষা, সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা এবং গভীর মানবিক সম্পর্কের উত্তরাধিকার বহন করে আসছে।
আজ যখন দুই দেশ তাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে সচেষ্ট, তখন এই ইতিহাস শিক্ষা, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের ক্ষেত্রে কীভাবে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে? এই বিষয়টি এখন নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
ধর্মীয়ভাবে দুর্গাপূজা প্রাচীন হলেও বাংলায় এর সামাজিক কাঠামোটি তৈরি হয়েছে নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে। পলাশীর যুদ্ধের পর জমিদারদের উত্থান, ব্রিটিশদের সঙ্গে তাদের সখ্য এবং পরবর্তীতে এই উৎসবের সর্বজনীন রূপ লাভ—এসবই এর বিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে। বাংলায় দেবী দুর্গা কেবল অসুরবিনাশী শক্তি নন, তিনি বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা এক কন্যাও বটে।
এই পারিবারিক আবেগ বাঙালির মনস্তত্ত্বে গভীরভাবে প্রোথিত। উত্তর ভারতের নবরাত্রি বা দশেরার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, একই ধর্মীয় শেকড় কীভাবে ভিন্ন অঞ্চলে সম্পূর্ণ আলাদা সাংস্কৃতিক রূপ ধারণ করেছে।
আমাদের এই দেশেও বহু যুগ ধরে দুর্গাপূজা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে উদযাপিত হয়ে আসছে। মন্দির, পাড়ার ক্লাব কিংবা পারিবারিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় আচার, গান ও প্রতিবেশীদের মিলনমেলা এর মূল বৈশিষ্ট্য। কলকাতার বিশাল সর্বজনীন পূজা, শিল্পসমৃদ্ধ মণ্ডপ ও আলোকসজ্জা যেমন দৃষ্টি কাড়ে, তেমনি বাংলাদেশেও বড় আয়োজনের পূজা হয় এবং পশ্চিমবঙ্গেও টিকে রয়েছে পারিবারিক পূজার ধারা। আয়োজনের পরিসরে তফাৎ থাকলেও এর মূল আবেগ দুই বাংলাতেই এক ও অভিন্ন।
ঢাকার একটি বাঙালি মুসলমান পরিবার এবং কলকাতার একটি বাঙালি হিন্দু পরিবারের জীবনধারা লক্ষ্য করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। তাদের ধর্মীয় আচার আলাদা হলেও ভাষা, খাদ্যতালিকা, সাহিত্য, সংগীত ও সামাজিক আচরণে মিল রয়েছে প্রচুর। রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের গান, মাছ-ভাত, বর্ষার দিন কিংবা নদীমাতৃক জীবন—সবকিছুই বাঙালি পরিচয়ের অংশ। ভারতের অন্য অঞ্চলে একই ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ভাষা ও খাদ্যাভ্যাসে বড় ফারক থাকতে পারে। এটি প্রমাণ করে যে মানুষের পরিচয় কেবল ধর্মে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ভাষা, ভূগোল ও ইতিহাসের ওপরও নির্ভরশীল।
এই সাংস্কৃতিক নৈকট্য গড়ে ওঠার পেছনে নদীগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গভীর। গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা যুগ যুগ ধরে জনবসতি, কৃষি ও বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করেছে। আমাদের গান, সাহিত্য ও উৎসবের সঙ্গেও নদী ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। পূজার শেষে বিসর্জনের আচারটি এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাপের বাড়ি থেকে দেবীর বিদায় এবং নদীর জলে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে নদী বাঙালির আবেগ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়।
পয়লা বৈশাখও দুই বাংলার শেকড়ের আরেকটি চমৎকার উদাহরণ। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ উভয় অঞ্চলেই নতুন পোশাক, ঐতিহ্যবাহী খাবার, গান ও মেলার আয়োজনে নববর্ষকে বরণ করা হয়। ব্যবসায়িক অঙ্গনে হালখাতার পুরোনো ঐতিহ্য আজও বজায় রয়েছে, যেখানে নতুন খাতা খুলে গ্রাহকদের মিষ্টিমুখ করানো হয়। ঢাকায় রমনার বটমূলের অনুষ্ঠান কিংবা মঙ্গল শোভাযাত্রা যেমন পরিচিত, তেমনি পশ্চিমবঙ্গেও নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনে দিনটি পালিত হয়। উদযাপনের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও ভাষা ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনের আনন্দ সর্বত্রই সমান।
ভাষা ও সংস্কৃতির এই শক্তি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও সুষ্পষ্ট। ১৯৪৭ সালে কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হলেও পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মাঝে আকাশচুমুখী অমিল ছিল।
রাষ্ট্রভাষা নিয়ে তৈরি হওয়া সেই বিরোধ ধীরে ধীরে রাজনৈতিক অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের রূপ নেয়, যার চূড়ান্ত পরিণতি পায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে। এই ইতিহাস প্রমাণ করে যে একটি জাতির আত্মপরিচয় গঠনে ভাষা, সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কতটা শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।
বাংলা সংস্কৃতি কেবল বাইরের প্রভাব গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জ্ঞানচর্চাতেও এর অনন্য অবদান রয়েছে। প্রায় এক হাজার বছর আগে বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান পরবর্তীতে বিক্রমশীলা বিহারের প্রধান পণ্ডিত হয়ে তিব্বতে জ্ঞান ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। পাল আমলের বৌদ্ধ দর্শন, চৈতন্যদেবের ভক্তি আন্দোলন, বাউল ও সুফি ধারা কিংবা রবীন্দ্র-নজরুলের সাহিত্য—সবই চিন্তার আদান-প্রদানের জীবন্ত দলিল।
আজকের দিনে বাংলাদেশ ও ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র, যাদের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে। তা সত্ত্বেও তাদের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রাষ্ট্রীয় সীমানার চেয়ে ঢের প্রাচীন। এই অভিন্ন ঐতিহ্যকে পুঁজি করে শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা ও বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সুযোগ এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
বিশ্বের গতিপ্রকৃতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি মানুষের জীবনযাত্রাকে নতুন রূপ দিচ্ছে। আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের মাঝেই বেড়ে উঠছে। তাদের কাছে গুণগত শিক্ষা, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আগামী দিনগুলোতে এই তরুণরাই আমাদের অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবে। একাত্তর বা সাতচল্লিশের ইতিহাস তাদের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের মাপকাঠি তারা নির্ধারণ করবে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের প্রয়োজনের ভিত্তিতে। পারস্পরিক সম্মান, শিক্ষা, যাতায়াত ও যৌথ অংশীদারিত্বই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিচালনা করবে।
দুর্গাপূজার রূপান্তর প্রমাণ করে যে ঐতিহ্য তার ভেতর নতুন অর্থ ধারণ করেই টিকে থাকে। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমাদের অভিন্ন ইতিহাস একটি মজবুত ভিত্তি। তবে সেই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নির্ভর করবে নতুন প্রজন্ম কীভাবে একসঙ্গে কাজ করার সুযোগ খুঁজে পায় তার ওপর।
আমাদের সুদীর্ঘ ইতিহাস একটি অসাধারণ ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আগামী দিনের সম্পর্ক কতটা সুদৃঢ় হবে, তা নির্ধারিত হবে নতুন প্রজন্মের যৌথ অর্জন ও সম্ভাবনার মধ্য দিয়ে।
মতামতটি সাইফুল ইসলাম, যিনি একজন উদ্যোক্তা এবং ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি।