
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলায় একটি আবাসিক হোটেলের কক্ষ থেকে আবুল বাশার (৩৯) নামের এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের দাবি, তাঁকে অপহরণ করার পর মুক্তিপণ হিসেবে টাকা চাওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত ঢাকা আবাসিক হোটেলের ব্যবস্থাপক মামুন পালিয়ে গেছেন।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) বেলা একটার দিকে ভেদরগঞ্জ থানা ভবনের ঠিক পাশেই অবস্থিত ঢাকা আবাসিক হোটেল থেকে পুলিশ এই মরদেহটি উদ্ধার করে। নিহত আবুল বাশার গাজীপুর মহানগরের খোলাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর নিজ বাড়ি গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানার দেউলিয়াবাড়ি এলাকায় এবং তাঁর বাবার নাম মরহুম জনাব আলী তালুকদার।
নিহত শিক্ষকের পরিবার জানিয়েছে, আবুল বাশারের পূর্বপুরুষদের মূল বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চেয়ারম্যান বাজার এলাকায়। ছুটির দিনগুলোতে তিনি মাঝেসাধ্যে সেখানে বেড়াতে আসতেন। এরই সুবাদে গত রোববার সকালেই তিনি শরীয়তপুরের উদ্দেশ্যে নিজের বাড়ি থেকে রওনা দিয়েছিলেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রোববার রাত আটটা ৪০ মিনিটে শিক্ষকের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ মুঠোফোনে কথা হয়। তখন তিনি তাঁর স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি নাঈম নামের এক বন্ধুর বাসায় রাতের খাবার গ্রহণ করছেন এবং রাতেই সেখানে অবস্থান করবেন। এরপর থেকে তাঁর পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে আর কোনোভাবেই যোগাযোগ করতে পারেননি।
পরের দিন সোমবার সকাল থেকেই শিক্ষকের স্ত্রী তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি। পরবর্তীতে ওই দিন বেলা তিনটার দিকে আবুল বাশারের নিজস্ব হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে তাঁর স্ত্রীর মুঠোফোনে একটি কল আসে। ফোনকলের অপর প্রান্তের অজ্ঞাত এক ব্যক্তি জানান যে, আবুল বাশার আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন এবং তাঁর জরুরি চিকিৎসার জন্য দুই হাজার টাকা প্রয়োজন।
টাকা পাঠানোর নির্দিষ্ট কোনো নম্বর চাওয়া হলে সেই ব্যক্তি তখন কোনো নম্বর দেননি। এর কিছু সময় পর আবুল বাশারের একটি রক্তাক্ত ছবি হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে।
স্বজনদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি গাজীপুরের কালিয়াকৈর থানায় অবহিত করা হয়। পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ওই মুঠোফোনের অবস্থান শনাক্ত করে জানতে পারে যে, শিক্ষক আবুল বাশার শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার পদ্মা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন।
এরপর রাতেই নিহতের পরিবারের সদস্যরা শরীয়তপুরে এসে ভেদরগঞ্জ থানা-পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পুলিশের সার্বিক সহযোগিতায় মঙ্গলবার দুপুরে ওই আবাসিক হোটেল থেকে আবুল বাশারের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
নিহত শিক্ষকের বড় ভাই মনিরুল ইসলাম জানান, আবুল বাশার শরীয়তপুরে বেড়াতে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। এরপর বিভিন্ন সময়ে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট থেকে কল করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা টাকা দাবি করে। পরে থানায় জানালে পুলিশ অবস্থান নিশ্চিত করে এবং ভেদরগঞ্জ থানা-পুলিশের সহায়তায় হোটেল থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহতের ভাগনে মো. কবির হোসেন খান বলেন, তাঁরা দৃঢ়ভাবে ধারণা করছেন তাঁর মামাকে অপহরণ করার পর টাকার জন্য নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তিনি তাদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেন।
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গোসাইরহাট সার্কেল) সামছুল আরেফিন জানিয়েছেন, আবাসিক হোটেলের কক্ষ থেকে মরদেহটি উদ্ধার করার পর ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। মরদেহে বাহ্যিকভাবে বড় কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
পুলিশ কর্মকর্তা সামছুল আরেফিন আরও উল্লেখ করেন, নিহতের নাকে ও মুখে রক্ত পাওয়া গেছে। তবে দৃশ্যমান কোনো ছুরিকাঘাত কিংবা শ্বাসরোধ করে হত্যার মতো স্পষ্ট কোনো আলামত এই মুহূর্তে পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে আসার পরই পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি তিনি যোগ করেন যে, আবুল বাশারের নির্ধারিত গন্তব্য নড়িয়া হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তিনি কেন এবং কার সঙ্গে যোগাযোগ করে ভেদরগঞ্জে এসে পৌঁছালেন, পুলিশ পুরো বিষয়টি নিবিড়ভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।