
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কোনো ধরনের সরকারি সংস্থা নিজ নিজ সীমার ভেতর পরিবহন-সংশ্লিষ্ট কোনো প্রকল্প হাতে নিতে চাইলে, সেই প্রকল্পের ডিপিপি অনুমোদনের উদ্যোগ গ্রহণের আগেই নতুন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রণীত পরিবহন প্রকল্পগুলোর চূড়ান্ত নকশা পাস করার এখতিয়ারও এই নতুন সংস্থার হাতেই অর্পণ করা হচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কোনো এলাকায় বিভিন্ন সংস্থার ভিন্নমুখী ও বিচ্ছিন্ন প্রকল্প নেওয়ার প্রবণতা হ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থার পাশাপাশি বাড়তি আরেকটি অনুমোদনের ধাপ যুক্ত হওয়ার বিষয়টিও সামনে চলে আসছে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় মেট্রোপলিটন ট্রান্সপোর্ট কর্তৃপক্ষকে বাস রুট পরিকল্পনা প্রণয়ন, রুট অনুমোদন ও রুট পারমিট প্রদান, বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পরিকল্পনা তৈরি, ফ্র্যাঞ্চাইজি সংক্রান্ত চুক্তি সম্পাদন, বাস ভাড়া নির্ধারণ এবং ভাড়া আদায় সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাগুলো দেওয়া হয়েছে। এর ফলে আসন্ন নতুন এই আইনটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা গেলে দেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থার বাস খাতে সরাসরি বড় ধরনের পরিবর্তন আসার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে রাজধানী ঢাকার বাস রুট রেশনালাইজেশনের কার্যক্রম ইতিমধ্যেই ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) মাধ্যমে ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে। নতুন এই আইনে উক্ত ক্ষমতাগুলোকে আরও বিস্তৃত ও সুনির্দিষ্ট আইনগত কাঠামোর ভেতরে নিয়ে আসার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলস্বরূপ, বাসগুলো ঠিক কোন কোন পথে চলাচল করবে, নির্দিষ্ট কোনো রুট কোন কোম্পানি পরিচালনা করবে এবং যাত্রীদের কাছ থেকে কত টাকা ভাড়া আদায় করা হবে—এই বিষয়গুলোতে কর্তৃপক্ষের ভূমিকা অনেক বেশি সরাসরি ও দৃশ্যমান হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বর্তমান দায়িত্ব ও কার্যাবলির সঙ্গেও এই নতুন কর্তৃপক্ষের সম্পর্কটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠবে। রুট সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও অনুমোদনের বিষয়টি যদি এক সংস্থার হাতে থাকে এবং যানবাহন ও চালক নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো অন্য কোনো সংস্থার হাতে ন্যস্ত থাকে, তবে দায়িত্বের সুনির্দিষ্ট সীমা নির্ধারিত না হলে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
খসড়া আইনে স্পষ্টভাবে সড়ক নিরাপত্তা অডিট পরিচালনা এবং সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাও এই কর্তৃপক্ষের হাতে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের সঠিক শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ, ফুটপাত ও সড়কের উপযুক্ত মানদণ্ড তৈরি, যানবাহনের নির্ধারিত ধরন ও সংখ্যা নির্দিষ্ট করা, সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ, পার্কিং সংক্রান্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ট্রাফিক সিগন্যাল ও ইন্টারসেকশনের নকশা অনুমোদন করার মতো বহুবিধ দায়িত্বও এই কর্তৃপক্ষকে প্রদান করা হয়েছে।
তবে দুর্ঘটনার তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর প্রাপ্ত ফলাফলগুলো কীভাবে বাস্তবে রূপায়ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট সড়ক কিংবা অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাকে কীভাবে সুনির্দিষ্ট জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসা হবে, সেটিও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
আইনের খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো বহুতল ভবন বা বড় ধরনের আবাসন প্রকল্পের কারণে সংলগ্ন সড়কগুলোতে যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়ার নির্ধারিত পথ এবং পার্কিংয়ের সার্বিক ব্যবস্থার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে নতুন কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান অনুমোদন করবে। এর মাধ্যমে নগর উন্নয়ন ও সঠিক পরিবহন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সরকারি সংস্থাগুলোর পারস্পরিক সমন্বয়ের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সামনে আসবে।
প্রস্তাবিত খসড়ায় আইন লঙ্ঘনের মতো ঘটনার জন্য কঠোর ফৌজদারি শাস্তির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণেরও জোরালো প্রস্তাব রাখা হয়েছে। খসড়ায় বলা হয়েছে যে, কর্তৃপক্ষ চাইলে সরাসরি জরিমানা আরোপ করতে পারবে, লাইসেন্স সাময়িকভাবে স্থগিত বা পুরোপুরি বাতিল করতে পারবে এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে যেকোনো কার্যক্রম স্থগিত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন ছাড়া যেকোনো পরিবহন প্রকল্প গ্রহণ, নির্দিষ্ট ট্রাফিক সার্কুলেশন প্ল্যান না রেখে কোনো বিশেষ স্থাপনা নির্মাণ এবং অনুমোদনবিহীন ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থার চালুর মতো বিষয়গুলোকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া, কর্তৃপক্ষের অর্পিত ক্ষমতা যথাযথভাবে প্রয়োগ করার জন্য পরিদর্শক নিয়োগ করার একটি বিশেষ বিধানও খসড়ায় রাখা হয়েছে। নিয়োজিত পরিদর্শকরা পরিবহন অবকাঠামো সংক্রান্ত পরিকল্পনা ও বিভিন্ন নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করতে পারবেন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও দলিল সংগ্রহ করতে পারবেন এবং যেকোনো অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশের একজন উপপরিদর্শকের সমমানের ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। তবে এই সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি ও পরিসীমা পরবর্তী সময়ে বিধিমালায় পরিষ্কারভাবে নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
নগর এলাকার যেকোনো পরিবহন অবকাঠামোর বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের মতো একাধিক সরকারি সংস্থাকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে দেখা যায়। নতুন এই আইনের খসড়ায় নগর পরিবহন খাতের যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের পূর্বেই এই সংস্থাগুলোকে কর্তৃপক্ষের বাধ্যতামূলক অনুমোদনের বিধান দেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা গ্রহণের সুযোগও রাখা হয়েছে, এবং সরকার প্রয়োজনবোধে বিভিন্ন সংস্থার সুনির্দিষ্ট দায়িত্বও নির্ধারণ করে দিতে পারবে।
প্রস্তাবিত এই আইনের ৫০ ধারার বিধান অনুযায়ী ২০১২ সালের পূর্বের ডিটিসিএ আইন আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করার কথা বলা হয়েছে। আগের ডিটিসিএর যাবতীয় সম্পদ, আইনগত অধিকার, অর্পিত ক্ষমতা, বিনিয়োগ, বিভিন্ন নথি, দায়দায়িত্ব, সম্পাদিত চুক্তি, চলমান বিভিন্ন মামলা, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা এবং কর্মরত সকল কর্মচারীকে নতুন এই কর্তৃপক্ষের অধীনে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, ডিটিসিএর পূর্বের বিদ্যমান কাঠামো ও কার্যক্রমের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই নতুন এই কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম শুরু করবে, যেখানে পুরনো ডিটিসিএর তুলনায় নতুন কর্তৃপক্ষকে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনেক বেশি ব্যাপক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, এই খসড়ার প্রস্তাব অনুযায়ী পরিবহনের বড় একটি অংশের একচ্ছত্র ক্ষমতা একক কোনো কর্তৃপক্ষের হাতে চলে যাবে। এর ফলে বিআরটিএ, সওজ, রাজউক, সিটি করপোরেশন এবং পুলিশের সঙ্গে কাজের দায়িত্বের সীমারেখা যদি পুরোপুরি স্পষ্ট না করা হয়, তবে দাপ্তরিক সমন্বয়হীনতা দূর হওয়ার পরিবর্তে উল্টো ক্ষমতার ওভারল্যাপ বা দ্বন্দ্ব তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সম্মানিত অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান দৈনিক পত্রিকাকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান যে, ক্ষমতা বাড়াতে গিয়ে এই নতুন কর্তৃপক্ষকে যদি শেষ পর্যন্ত নগর-পরিকল্পনার মূল কর্তৃপক্ষ বানিয়ে ফেলা হয়, তবে তা এখনই পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ভূমি ব্যবহারের প্রক্রিয়া এবং পরিবহন পরিকল্পনা সবসময় অত্যন্ত সমন্বিতভাবে পরিচালনা করতে হবে। ডিটিসিএ মূলত বিভিন্ন পরিবহন প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে, তবে তা করতে গিয়ে যেন নগর-পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব এখতিয়ার ও পূর্বঅনুমোদিত কোনো পরিকল্পনা কোনোভাবেই উপেক্ষিত না হয়। একই সঙ্গে, ডিটিসিএর নির্দেশনা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বিভিন্ন সংস্থার নিজেদের একক উদ্যোগে যত্রতত্র প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষতিকর প্রবণতা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং এই ক্ষেত্রে ডিটিসিএর ক্ষমতার সঙ্গে অন্যান্য সংস্থার নির্দিষ্ট দায়িত্বের সুষম ভারসাম্য নিশ্চিত করা একান্ত জরুরি।