
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সংকটপূর্ণ সময়েই মূলত নেতৃত্বের প্রকৃত মূল্যায়ন হয়ে থাকে। গেবেখা টেস্টের প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেটে একশো দশ রান হারিয়ে ধুঁকতে থাকা দক্ষিণ আফ্রিকাকে একাই টেনে তুলেছেন দলনেতা টেম্বা বাভুমা। দীর্ঘ নয় ঘণ্টা উইকেটে কাটিয়ে তিনি উপহার দিয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা ১৭৯ রানের এক দুর্দান্ত ইনিংস, যার ওপর ভর করে প্রোটিয়ারা সংগ্রহ করেছে চারশো পঁচিশ রান।
ম্যাচের প্রথম দিনে ক্রিজে নেমে এসেই এই ডানহাতি ব্যাটারকে মিচেল স্টার্ক ও স্কট বোল্যান্ডের হ্যাটট্রিক বলের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রতিপক্ষের বোলাররা যখন আগ্রাসী বোলিংয়ে ত্রাস সৃষ্টি করছিলেন, তখন তিনশো চৌত্রিশ বল মোকাবিলা করে তিনি একটি ঐতিহাসিক ইনিংস উপহার দেন।
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে এটিই দক্ষিণ আফ্রিকার কোনো ক্যাপ্টেনের ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান। ইনিংস গড়ার পথে তিনি মার্কো ইয়ানসেনের সঙ্গে একশো বত্রিশ এবং সাইমন হারমারদের সঙ্গে একশো তিরাশি রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়েছেন, যেখানে পুরো সময় জুড়েই ছিল প্রচণ্ড চাপ।
কঠিন পরিস্থিতিই সাধারণত বাভুমার সেরা খেলাটা বের করে আনতে সাহায্য করে। দায়িত্ব পাওয়ার আগের সময়ে টেস্টে তাঁর নামের পাশে ছিল মাত্র একটি সেঞ্চুরি, যা দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্যাটার হিসেবে গড়েছিল ইতিহাস। সে সময় তাঁর ব্যাটিং গড়ও ছিল মাত্র চৌত্রিশের ঘরে।
নেতৃত্বের ভার নেওয়ার পর তাঁর ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান পুরোপুরি বদলে গেছে। এই দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি আরও চারটি সেঞ্চুরি আদায় করে নিয়েছেন এবং চব্বিশ ইনিংসে ব্যাটিং গড় উন্নীত করেছেন পঞ্চাশের ওপরে, যা বর্তমানে চুয়ান্ন দশমিক ছত্রিশ।
তাঁর নেতৃত্বে প্রোটিয়ারা তেরোটি টেস্টের মধ্যে এগারোটিতেই জয় পেয়েছে। গত বছর লর্ডসে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ট্রফি জয় করাটা ছিল এই সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে উজ্জ্বল এক রত্ন।
ডার্বানে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম টেস্টে ৩ ও ১ রান করে ব্যর্থ হয়েছিলেন বাভুমা। অধিনায়ক হিসেবে সেটাই ছিল তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম পরাজয়। তবে সহজে হার না মেনে গেবেখা টেস্টের আগে তিনি নেটে লম্বা সময় ধরে ঘাম ঝরিয়েছিলেন।
তাঁর সেই কঠোর সাধনা শেষ পর্যন্ত মাঠের খেলায় দারুণভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ছন্দে ফেরা, দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা এবং ইনিংস বড় করার মাধ্যমে তিনি কেবল নিজের সেঞ্চুরিই পাননি, বরং দক্ষিণ আফ্রিকার সিরিজ জয়ের সম্ভাবনাকেও টিকিয়ে রেখেছেন।
২০১৬ সালে কেপটাউনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি পেয়েছিলেন বাভুমা। অজিদের বিপক্ষে এই অনবদ্য ইনিংসের পরও তাঁর কাছে ২০১৬ সালের ওই ইনিংসটিই সবচেয়ে বেশি পছন্দের তালিকায় রয়েছে।
তৃতীয় দিনের খেলা শেষ হওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এই শতক হাঁকাতে পেরে তিনি আনন্দিত। পুরো অনুভূতি এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে না পারলেও নানা কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে করা সেই প্রথম সেঞ্চুরিটিই তাঁর হৃদয়ে সবার ওপরে স্থান পাবে।
নিজের এই ইনিংসের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, তিনি যখন ক্রিজে এসেছিলেন তখন কন্ডিশন ও পিচের আচরণ সম্পূর্ণভাবে পেসারদের অনুকূলে ছিল। এই ধরনের বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি তিনি অতীতেও হয়েছেন এবং তাঁর বিশ্বাস এই পরিবেশেই তিনি নিজের সেরা পারফরম্যান্স দিতে পারেন।
তিনি আরও যোগ করেন যে, তিনি সবসময় ক্রিজে টিকে থেকে দলকে একটি লড়াই করার মতো স্কোরে পৌঁছে দিতে পেরে গর্ব অনুভব করেন। তবে এবারের ইনিংসটিতে ব্যক্তিগত প্রাপ্তির দিক থেকে ভিন্ন একটি মাত্রা ছিল, কারণ দলের চরম বিপদ কাটিয়ে বড় স্কোর গড়া তাঁর কাছে অত্যন্ত সন্তোষজনক একটি বিষয়।