
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
নারী পাচার ও যৌন কেলেঙ্কারির দায়ে অপরাধী সাব্যস্ত জেফরি এপস্টিনের মুখোমুখি বসে আলোচনারত অবস্থায় ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাসমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরির বেশ কিছু ছবি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এসেছে। মার্কিন বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে এই ছবিগুলো জনসমক্ষে আনার পর থেকেই নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের এই মন্ত্রীর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়েছে এবং বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে তাঁর পদত্যাগের জোরালো দাবি উঠেছে।
সামনে আসা অন্তত দুটি ছবিতে সুট পরিহিত হরদীপ সিং পুরি ও কালো সোয়েটার পরিহিত জেফরি এপস্টিনকে একটি টেবিলের দুপাশে মুখোমুখি বসা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ওই নির্দিষ্ট টেবিলে বেশ কিছু নথিপত্রসহ নানা সামগ্রী এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায় এবং ছবিগুলোর ওই ফ্রেমে অন্য কোনো ব্যক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়নি।
এর আগে মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি দাবি করেছিলেন যে ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটে বা আইপিআইতে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নেতৃত্বে গঠিত একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবেই তিনি কেবল এপস্টিনের সান্নিধ্যে এসেছিলেন। তবে নতুন করে প্রকাশিত এই ছবিগুলো তাঁর সেই আগের দাবিকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
অনলাইন দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই ছবিগুলো মার্কিন বিচার বিভাগের ‘এপস্টিন ফাইলস’ নথিপত্রের অন্তর্ভুক্ত, যা মূলত চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অবমুক্ত হওয়া ‘ডেটাসেট ৯’-এর অংশ বিশেষ। ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়্যার জানিয়েছে যে ওই নির্দিষ্ট ডেটাসেটটিতে আলোচ্য বৈঠকের মোট ১০টি ছবি রয়েছে এবং ছবিগুলোর ফ্রেম প্রায় হুবহু এক হলেও কেবল ক্যামেরার কোণ বা অ্যাঙ্গেলে সামান্য তফাত রয়েছে।
দ্য ওয়্যারের পক্ষ থেকে করা প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে যে ছবিটি ঠিক কোন সময়ের বা কোন বৈঠকের, তা হরদীপ সিং পুরির স্মৃতিতে নেই। এমনকি ওই ছবি তোলার আগের বা পরের মুহূর্তে সেখানে অন্য কেউ উপস্থিত ছিলেন কি না, তাও তিনি মনে করতে পারছেন না বলে জানিয়েছে তাঁর দপ্তর। তবে মন্ত্রীর কার্যালয়ের দাবি, পুরি কখনোই এমন কোনো বক্তব্য দেননি যে তিনি কখনো এপস্টিনের সঙ্গে একান্তে সাক্ষাৎ করেননি।
নতুন এসব ছবি প্রকাশ্যে আসার পর ভারতের বিভিন্ন বিরোধী দল সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হয়েছে। ছবিগুলো প্রকাশের এই সময়টি কাকতালীয়ভাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর মুম্বাই সফরের দিনগুলোর সঙ্গে মিলে যাওয়ায় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। গত বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেন যে রুবিও মুম্বাইতে অবস্থান করছেন এবং একই সময়ে মার্কিন বিচার বিভাগ এপস্টিন ও পুরির ছবি জনসমক্ষে এনেছে।
শাসক দল বিজেপি এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসকে উদ্দেশ্য করে রাহুল গান্ধী আরও লিখেছেন, আপনাদের কি মনে হয় তারা কোনো দেশবিরোধী বিশ্বাসঘাতককে ব্ল্যাকমেল করার চেষ্টা করছে? অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য মহুয়া মৈত্রও অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাষায় বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
এর আগে সরকারি প্রতিনিধিদলের অংশ হিসেবে এপস্টিনের সঙ্গে সাক্ষাতের দাবির বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে মহুয়া মৈত্র এক্সে লিখেছেন, তিনি আমাদের জানিয়েছিলেন যে কেবল একটি প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিন থেকে চারবার এপস্টিনের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল এবং অনুমান করা যায় যে এই দুটি ছবিতে বাকি প্রতিনিধিরা হয়তো টেবিলের নিচে লুকিয়ে ছিলেন।
অন্য আরেকটি পোস্টে অভিযুক্ত মন্ত্রীর উদ্দেশে তৃণমূল সাংসদ লিখেছেন, সামান্য পরিমাণ লজ্জা বজায় রাখুন এবং অন্তত এখন থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার কোনো বৈঠকে অংশ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন। এই বিষয়ে সোচ্চার হয়েছেন কংগ্রেস দলের নেতা পবন খেরাও।
মার্কিন বিচার বিভাগের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের নথিপত্র তুলে ধরে পবন খেরা দাবি করেছেন যে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৭ সালের দীর্ঘ সময়সীমার মধ্যে জেফরি এপস্টিন ও হরদীপ সিং পুরির মাঝে মোট ৬২ বার ই-মেইল যোগাযোগ হয়েছিল।
সামাজিক মাধ্যম এক্সে পবন খেরা আরও লিখেছেন, এ পর্যন্ত আমাদের যা জানা আছে তাতে দেখা যায় যে তাদের মধ্যে অন্তত ১৪টি বৈঠক এবং ব্যাপক যোগাযোগ হয়েছে, যার মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল সরাসরি মুখোমুখি বৈঠক এবং সাম্প্রতিককালের ছবিগুলো আমাদের এই দাবিকে আরও বেশি জোরালো করেছে অথচ উত্তরহীন প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, ছবি ফাঁসের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আগামী সপ্তাহে ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হতে পারে।