
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দেশের রপ্তানি পণ্যগুলোকে প্রায়শই ছোট আকৃতির ফিডার ভেসেল বা জাহাজে করে প্রথমে অন্য কোনো রাষ্টরের বন্দরে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে সেই বন্দরগুলো থেকেই বড় আকৃতির জাহাজে করে ইউরোপ কিংবা আমেরিকার সুদূর গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় পণ্যগুলো। এর ফলে সামগ্রিক পরিবহন সময় ও আর্থিক ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায় এবং আমাদের বাণিজ্য খাতের অর্জিত লাভের একটি বড় অংশ অন্য দেশের বন্দরে চলে যায়। যে রাষ্ট্রটি নিজেই নিজেদেরকে একটি প্রধান ‘সংযোগস্থল’ বা হাব হিসেবে দাবি করে আস আসছে, সেই রাষ্ট্রের নিজেদের পণ্যই আজ এভাবে ঘুরপথে সংযুক্ত হচ্ছে। পরিস্থিতিটি কেবল একটি নিছক পরিহাসই নয়, বরং এটি একটি সুস্পষ্ট নীতিগত ব্যর্থতার বড় প্রতীক.
এই ধরনের সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য নানা সময়ে সমাধানের বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেই প্রতিশ্রুতির ইতিহাস বেশ দীর্ঘ এবং ক্লান্তিকর। উদাহরণস্বরূপ, বহুল আলোচিত সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ২০১৫ সালে এসে পুরোপুরি বাতিল করা হয়। একইভাবে পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনাও ২০২১ সালের মধ্যে শেষ পর্যন্ত স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং বর্তমানে এই বন্দরটির চ্যানেলটি কেবল ১০.৫ মিটার পর্যন্ত ড্রাফটের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্যই উন্মুক্ত রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে এখন সব আশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে রয়েছে মাতারবাড়ী বন্দরটি।
প্রত্যাশা করা হচ্ছে যে মাতারবাড়ী বন্দরে ১৬ মিটার ড্রাফটের এবং আট হাজার দুশো টিইইউ ধারণক্ষমতা সম্পন্ন বড় বড় জাহাজ অনায়াসেই ভিড়তে পারবে। এই বন্দরটি চালু হলে দেশের সার্বিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতায় প্রায় দশ লাখ টিইইউ যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানের পঁয়ত্রিশ লাখ টিইইউ সক্ষমতার তুলনায় এটি দেশের কনটেইনার ধারণক্ষমতাকে প্রায় এক চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি করবে। এখানে ১৬ মিটার গভীরতা মানে হলো এটি আমাদের প্রধান বন্দর চট্টগ্রামের তুলনায় প্রায় দেড় গুণেরও বেশি গভীর.
তবে এই মেগা প্রকল্পটিকে ঘিরে পূর্বে পরিকল্পনা ছিল যে এটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যেই তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবে। অথচ বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে এই প্রকল্পের সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি বর্তমানে মাত্র ১৫ শতাংশের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে। কাঙ্ক্ষিত সময়সূচি এবং বাস্তব চিত্র বা অগ্রগতির মধ্যকার এই ব্যবধান বা ফারাকই আমাদের দেশের সামগ্রিক ভূরাজনৈতিক আখ্যানের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষায় আমরা নিজেদেরকে একটি ‘কেন্দ্র’ হিসেবে জাহির করলেও অবকাঠামোগত নির্মাণের বাস্তব ভাষায় আমরা এখনো কেবল প্রথম ধাপে রয়ে গেছি.
এই পুরো পরিস্থিতির পাশে আমাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশীদের হিসাব-নিকাশটাও বেশ ভালোভাবে বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন। ভারতের কলকাতার হলদিয়া ডক কমপ্লেক্সে হ্যান্ডলিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ ড্রাফট বা গভীরতা মাত্র ৯.১ মিটার। এর বিপরীতে ভারতেরই ওডিশা রাজ্যের গোপালপুর বন্দরের সর্বোচ্চ ড্রাফট রয়েছে ১৪.৫ মিটার পর্যন্ত। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে গোটা বঙ্গোপসাগরের উপকূলজুড়ে গভীর পানির বন্দর নির্মাণের এক নীরব প্রতিযোগিতা চলছে.
এই প্রতিযোগিতামূলক দৌড়ে আমরা খুব সহজেই সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারব, যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমাদের প্রকল্পগুলোর কাজ সঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারি। অন্যথায় আমাদের এই দৌড়ে পিছিয়ে পড়ারও যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সুযোগের জানালা কখনোই চিরকাল খোলা থাকে না। যে বন্দরটি সবার আগে গভীরতা অর্জন করতে পারবে এবং জাহাজ নির্মাণ ও পরিবহন কোম্পানির রুট-পরিকল্পনায় সবার আগে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে, শেষ পর্যন্ত সেই বন্দরটিই আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল সুবিধা লাভ করবে।