
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফ্রান্স ও আলবেনিয়ার পর এবার শিক্ষার্থী আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রিসে। রাজধানী এথেন্সসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গত বুধবার হাজারো শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছেন। এই কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষক ও সরকারি কর্মচারীরাও একাত্মতা প্রকাশ করে যোগ দিয়েছেন।
শিক্ষা খাতের জন্য রাষ্ট্রীয় বাজেট বাড়ানোর প্রধান দাবিতে শিক্ষার্থীরা এই আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। একই সঙ্গে তারা আরও উন্নত সুযোগ–সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত বড় ও সুপরিসর ক্লাসরুমের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, শুধু সেন্ট্রাল এথেন্স এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। এই আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি স্কুল স্তরের শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন এবং মিছিলটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়।
শুধু এথেন্সেই সীমাবদ্ধ ছিল না এই কর্মসূচি, বরং দেশটির অন্যান্য কয়েকটি শহরেও শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছেন। এসব মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা ফ্রান্স ও স্পেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন রাষ্ট্রে চলমান আন্দোলনগুলোর প্রতি নিজেদের সংহতি প্রকাশ করেন।
এর আগে ফ্রান্স ও আলবেনিয়ায় শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত ব্যাপক ও সহিংস বিক্ষোভ করেছিলেন। পাশাপাশি স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে রাজপথ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং কিছু জায়গায় দুর্বল শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কারের দাবিও জোরালো হচ্ছে।
আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ে গ্রিসে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই নির্বাচনের ঠিক আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা দেশটির প্রধানমন্ত্রী কিরিয়াকোস মিতসোতাকিসের নেতৃত্বাধীন মধ্য–ডানপন্থী সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছেন।
গ্রিসের সাধারণ মানুষ বর্তমানে স্থবির হয়ে যাওয়া মজুরি কাঠামো, অতিরিক্ত বাড়িভাড়া এবং জ্বালানি ব্যয়ের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতির মতো বহুমুখী সমস্যার মোকাবিলা করছেন। দেশটির তীব্র অর্থনৈতিক ঋণের সংকটের পর বেশ কয়েক বছর অতিক্রান্ত হলেও অবস্থার পুরোপুরি কোনো পরিবর্তন আসেনি।
এথেন্সে অবস্থিত পার্লামেন্ট ভবনের সামনে সমবেত হওয়া বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিয়ে বলেন যে, গ্রিস থেকে শুরু করে ফ্রান্স পর্যন্ত সর্বত্র তারা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা দেখতে চান।
এথেন্সের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক সিনতাগমা স্কয়ারে বিক্ষোভকারীরা ইতিমধ্যে তাঁবু গেড়ে অবস্থান নিয়েছেন। গতকালের মূল মিছিলটি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে সেখানে পুরো রাতজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে।
গ্রিসে পারিশ্রমিক বা বেতন–ভাতা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ এবং কর্মী সংকটের প্রতিবাদে কিছু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও চিকিৎসকেরা ইতিমধ্যে কর্মবিরতি পালন শুরু করেছেন। এর ফলে সরকারি বিভিন্ন বিদ্যালয় এবং হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এই বিক্ষোভ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগেই শিক্ষামন্ত্রী সোফিয়া জাছারাকি গণমাধ্যমকে জানান যে তিনি শিক্ষার্থীদের সমস্ত দাবিদাওয়া মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন আবাসন নির্মাণ এবং বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধার উন্নয়নের উদ্দেশ্যে সরকার ইতোমধ্যে ৭৩ কোটি ৩০ লাখ ইউরোর বেশি বা প্রায় ৮২ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ দিয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে শুরু হয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে চলা ভয়াবহ ঋণের সংকট সফলভাবে কাটিয়ে উঠেছে গ্রিস। এই সংকট থেকে বের হয়ে আসার জন্য দেশটির সরকারকে প্রায় ২৯ হাজার কোটি ইউরোর তিনটি আলাদা আন্তর্জাতিক বিশেষ প্রণোদনা বা বেলআউটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল।
ওই সময় আন্তর্জাতিক শর্ত মেনে দেশটিকে চরম কৃচ্ছ্রসাধনের কঠোর পথ বেছে নিতে হয়, যার অংশ হিসেবে সে সময় সরকারি খাতের বেতন এবং শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে আনা হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে গ্রিসে কর্মচারীদের বেতন কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও, দেশটির সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এখনও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য দেশের নাগরিকদের তুলনায় বেশ কম রয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বর্তমানের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির অতিরিক্ত দাম, যা গ্রিসের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে নতুন করে তীব্র চাপের মুখে ফেলেছে।
বর্তমানে গ্রিসের মানুষের গড় মাসিক বেতন ১ হাজার ৫০০ ইউরো বা ১ হাজার ৬৮৫ ডলারে এসে আটকে আছে, যা মূলত ২০০৯ সালের অর্থনৈতিক সংকটের পূর্ববর্তী পর্যায়ের সমান। এছাড়া দেশটির শহরাঞ্চলগুলোতে বাড়িভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার কারণে বহু তরুণের পক্ষেই এখন নিজস্ব বাসস্থান জোগাড় করা কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২১ বছর বয়সী তরুণী জর্জিিয়া ফৌকিদু গ্রিসের একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছেন। এথেন্সের রাজপথে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভে অংশ নিয়ে জর্জিিয়া বলেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে এখানে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ বাড়িভাড়া অনেক বেশি এবং বসবাসের ঘরগুলোও খুবই ছোট।