
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর এক চাঞ্চল্যকর উড়োজাহাজ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছিল। সেদিন পোর্টল্যান্ড থেকে সিয়াটলের পথে যাত্রা করা নর্থওয়েস্ট ওরিয়েন্ট এয়ারলাইনসের ৩০৫ নম্বর ফ্লাইটের বোয়িং ৭২৭ বিমানটিতে মধ্যবয়সী এক যাত্রী নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন ড্যান কুপার নামে। গাঢ় রঙের স্যুট, সাদা শার্ট, কালো টাই এবং ছোট ব্রিফকেসধারী এই ভদ্রলোক শান্তভাবে সিটে বসে পানীয় অর্ডার করেছিলেন।
ফ্লাইট আকাশে ওঠার খানিক বাদেই বিমানবালার হাতে একটি চিরকুট ধরিয়ে দেন এই ব্যক্তি। ওই নোটে দাবি করা হয়, তাঁর ব্রিফকেসের ভেতরে বিস্ফোরক রয়েছে এবং তা দিয়ে বিমানটি উড়িয়ে দেওয়া হবে।
পরবর্তী সময়ে কথিত কুপার তাঁর শর্তগুলো স্পষ্ট করেন। তিনি সব কটি কুড়ি ডলারের নোটে মোট দুই লাখ ডলার এবং চারটি প্যারাস্যুট দাবি করেন। এই মুক্তিপণ ও প্যারাস্যুট পেলে তিনি যাত্রীদের নিরাপদে নামিয়ে দেবেন বলে জানান।
তৎকালীন সময়ে বিমানের যাত্রীরা ঘুণাক্ষরেও টের পাননি যে তাদের পাশেই এমন এক কাণ্ড ঘটতে চলেছে, যার রহস্য উদ্ঘাটনে কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থাকে বহু দশক ব্যয় করতে হবে। এফবিআই শেষ পর্যন্ত এই মামলার তদন্ত স্থগিত করলেও লোকটির সঠিক পরিচয় কিংবা তাঁর পরিণতি আজ অবধি অমীমাংসিত রয়েছে।
ঐতিহাসিক এই অজ্ঞাতপরিচয় ছিনতাইকারী বিশ্বজুড়ে ডি বি কুপার নামে খ্যাতি লাভ করেন। বিমানবালা কুপারের এই বার্তা পাইলটের নিকট পৌঁছালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়।
সিয়াটল বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি অবতরণের পর ৩৬ জন সাধারণ যাত্রীকে মুক্তি দেওয়া হয়। এর বদলে ছিনতাইকারীর হাতে কাঙ্ক্ষিত দুই লাখ মার্কিন ডলার ও চারটি প্যারাস্যুট তুলে দেওয়া হয়।
তবে বিমানটির সব কর্মীকে ছেড়ে দেওয়া হয়নি, কুপার তাঁদের কয়েকজনকে নিজের সঙ্গে রেখে দেন। এরপর তিনি মেক্সিকো সিটির উদ্দেশ্যে বিমানটি পুনরায় আকাশে ওড়ানোর হুকুম দেন।
নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশনার বেড়াজালে এই যাত্রা পরিচালিত হচ্ছিল। যার মধ্যে ছিল উড়োজাহাজটিকে নির্দিষ্ট গতিসীমায় ও নিচু উচ্চতায় পরিচালনা করা এবং পেছনের সিঁড়ি নামানোর ব্যবস্থা রাখা।
সিয়াটল বিমানবন্দর ছেড়ে যাওয়ার পর কুপার যেন তাঁর পূর্বনির্ধারিত ছকের একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে যান। তখন রাতের অন্ধকার নেমে এসেছে, বাইরে বইছে ঠান্ডা ও ঝোড়ো হাওয়া।
কয়েকজন ক্রু সদস্য ছাড়া বিশাল বিমানটির ভেতরে তখন আর কোনো সাধারণ মানুষ ছিল না। রাত আটটার কিছু পরে সিয়াটল ও নেভাদার রেনো শহরের মাঝামাঝি কোনো এক এলাকার ওপর দিয়ে উড়োজাহাজটির পেছনের সিঁড়ি দিয়ে লাফ দেন কুপার।
তাঁর পিঠে ও সঙ্গে ছিল বিপুল পরিমাণ মুক্তিপণের অর্থ। কিছুক্ষণ বাদেই বিমানটি নিরাপদে মাটিতে নেমে আসে, কিন্তু সেই দুর্ধর্ষ ছিনতাইকারী আর বিমানে ছিলেন না।
বিমান থেকে একে একে ক্রু সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ, ভেতরের অংশ তল্লাশি এবং সম্ভাব্য ল্যান্ডিং জোন খোঁজার কাজ দ্রুত শুরু হয়। কিন্তু কোথাও কুপারের বিন্দুমাত্র সন্ধান মেলেনি।
তাঁকে বা তাঁর ব্যবহৃত প্যারাস্যুট কিংবা বড় অঙ্কের অর্থ—কোনো কিছুরই নাগাল পাওয়া যায়নি। একটি চলমান বিমান থেকে ঝাঁপ দিয়ে উধাও হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে অন্যতম আলোচিত অনুসন্ধান হিসেবে জায়গা করে নেয়।
ঘটনার শুরুতে নিজের নাম ড্যান কুপার বললেও সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তিনি ডি বি কুপার নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এফবিআইয়ের রেকর্ড অনুযায়ী, গণমাধ্যমের তৈরি একটি ভুল পরিচিতি থেকেই এই ডি বি নামটি ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল।
ছিনতাইয়ে অংশ নেওয়া সেই ব্যক্তির আসল নাম শেষ পর্যন্ত কখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বিমানবালাদের দেওয়া বিবরণ অনুযায়ী, কুপারের বয়স আন্দাজ করা হয়েছিল প্রায় চল্লিশের কোঠায়।
তিনি বেশ শান্ত ভঙ্গিতে কথা বলতেন এবং তাঁর পরনে ছিল অভিজাত ব্যবসায়ীদের মতো পোশাক। যাত্রাপথে তিনি সোডার সঙ্গে বোরবন হুইস্কি পান করেছিলেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা বিমানের আসন এবং আশপাশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেন। কুপারের ফেলে যাওয়া একটি কালো রঙের ক্লিপ-অন টাইও তাঁদের হাতে এসে পৌঁছায়।
এই টাইটি পরবর্তী সময়ে ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে দাঁড়ায়। এফবিআই এই বিশাল অভিযানের নাম দিয়েছিল নরজ্যাক, যার অর্থ নর্থওয়েস্ট হাইজ্যাকিং।
সুদীর্ঘ সময় ধরে তদন্তের অংশ হিসেবে শত শত সাধারণ মানুষের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা তথ্য যাচাইয়ের পাশাপাশি সম্ভাব্য সন্দেহভাজনদের খোঁজ করা হয়।
তদন্তের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই কেবল সন্দেহভাজনের সংখ্যা ছাড়িয়ে গিয়েছিল আট শ ছাড়িয়ে। তবুও কুপারের আসল পরিচয় গোপনই থেকে যায়।
কুপারের ভাগ্যে পরবর্তীতে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। তিনি কি সেই বিমান থেকে লাফিয়ে পড়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে গিয়েছিলেন?
একটি মহলের ধারণা ছিল যে কুপার আগে থেকেই নিজের নামার স্থান এবং পালানোর নিখুঁত ছক কষে রেখেছিলেন। প্যারাস্যুট নিয়ে রাতের আকাশে ঝাঁপ দেওয়ার এই দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত দেখে অনেকের অনুমান ছিল তিনি হয়তো একজন পেশাদার ও প্রশিক্ষিত প্যারাস্যুটবিদ ছিলেন।
তবে তদন্ত দলের সামনে এর ঠিক বিপরীত কিছু তথ্যও উপস্থিত ছিল। তিনি যে প্যারাস্যুটটি ব্যবহার করেছিলেন, সেটি সহজে দিক পরিবর্তন করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল না।
গাছপালায় ঘেরা দুর্গম বনভূমির ওপরে রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকার এবং কনকনে ঠান্ডার মধ্যে এমন ল্যান্ডিং ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তা ছাড়া তাঁর পরিধানের জুতা ও পোশাক এই ধরনের দুর্গম স্থানে নামার উপযোগী ছিল না।
এই ঘটনার আরেকটি অদ্ভুত দিক ছিল প্যারাস্যুটের সংখ্যা। কুপার যদিও চারটি প্যারাস্যুট চেয়ে বসেছিলেন, কিন্তু ঝাঁপ দেওয়ার সময় সঙ্গে নিয়েছিলেন মাত্র দুটি।
এর একটি ছিল প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত পুরোনো প্যারাস্যুট, যা সেলাই করে পুরোপুরি বন্ধ করা ছিল। ফলে তিনি সেটি কোনোভাবেই কাজে লাগাতে পারেননি।
অন্য প্যারাস্যুটের মজবুত দড়ি দিয়ে তিনি মুক্তিপণের টাকার ভারী ব্যাগটি নিজের দেহের সঙ্গে বেঁধে নিয়েছিলেন। তাহলে কি তিনি প্যারাস্যুট ব্যবহারে কোনো মারাত্মক ভুল করেছিলেন?
নাকি তিনি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এমন কিছু করেছিলেন যাতে তদন্তকারীরা বিভ্রান্ত হন? এসকল প্রশ্নের আজ পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি।
তবে এফবিআইয়ের প্রাথমিক ধারণা ছিল যে কুপার সম্ভবত চলন্ত বিমান থেকে ঝাঁপ দেওয়ার পর আর জীবিত ছিলেন না। যদিও তাঁর মৃতদেহ কখনো উদ্ধার করা যায়নি, তাই এই ধারণাও পুরোপুরি প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি।
এই রহস্যের সবচেয়ে নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনার প্রায় এক দশক বাদে। ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের কলাম্বিয়া নদীর তীরের বালিময় মাটিতে এক শিশুর নজরে আসে কিছু পচে যাওয়া ডলারের নোট।
মোট ৫ হাজার ৮০০ ডলারের ওই নোটগুলোর সিরিয়াল নম্বর পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এগুলো কুপারকে দেওয়া মুক্তিপণের অর্থের অংশবিশেষ।
এই আবিষ্কার তদন্তের মোড় সম্পূর্ণ ঘুরিয়ে দেয়। কুপার কি তবে নদীর কাছাকাছি কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় নেমেছিলেন?
লাফ দেওয়ার সময় তিনি কি গুরুতরভাবে আহত হয়েছিলেন? নাকি অর্থ নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার কোনো একপর্যায়ে কোনো দুর্ঘটনায় টাকার একটি অংশ হারিয়ে ফেলেন?
নদীর তীর থেকে ডলারের বান্ডিল মিললেও কুপারের নাগাল মেলেনি। তাঁর দেহাবশেষ, প্যারাস্যুট বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য আলামত আজও রহস্যের অন্ধকারে ঢাকা।
নদীর কিনারে এই অর্থ কীভাবে এসে পৌঁছাল, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত থাকলেও কোনো তত্ত্বই চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর ফলে এই অমীমাংসিত রহস্য আরও বেশি জটিল রূপ ধারণ করে। যদি কুপার সেদিনের দুর্ঘটনায় মারা গিয়ে থাকেন, তবে তাঁর মরদেহ কোথায় হারিয়ে গেল?
আর তিনি যদি বেঁচেও থাকেন, তবে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতানোর পরও কেন তাঁর মুখ থেকে কোনো কথা বের হলো না? কেন তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি আজও জনসমক্ষে উন্মোচিত হলো না?