
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যায়ে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের উপস্থিতি বা সংখ্যা সবসময়ই বেশি লক্ষ্য করা যায়। তবে যখন উচ্চশিক্ষার স্তর বা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় আসে, তখন এই পুরো দৃশ্যপট সম্পূর্ণ উল্টে যেতে দেখা যায়। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজগুলো বাদে দেশের অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীদের হার মোটেও সন্তোষজনক নয় এবং তা সামগ্রিকভাবে ৪০ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। শুধু অ্যাকাডেমিক বা পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে যখন কর্মজীবন বা সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে প্রবেশের সময় আসে, তখনও নারীদের এই অংশগ্রহণের হার আশানুরূপ পর্যায়ে পৌঁছায় না এবং তা এখনো ৩০ শতাংশের কমেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অর্থাৎ সমাজের একেবারে নিচের স্তরের শিক্ষায় ছাত্রীদের ব্যাপক অগ্রগতির যে আশাব্যঞ্জক চিত্র চোখে পড়ে, তা পরবর্তীতে উচ্চশিক্ষা এবং পেশাগত কর্মজীবনে প্রবেশ করলে পুরোপুরি বদলে যায়।
বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো বা ব্যানবেইসের পক্ষ থেকে প্রকাশিত সাম্প্রতিক বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার একটি স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশের প্রাথমিক পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীদের ভেতরে মেয়েদের হার প্রায় ৫১ দশমিক ২ শতাংশের মতো। এর পরের ধাপে অর্থাৎ মাধ্যমিকে এই মেয়েদের অংশগ্রহণের হার আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৫৪ দশমিক ৬৭ শতাংশে গিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে কলেজ পর্যায়ের সামগ্রিক পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় সেখানেও ছাত্রীদের হার প্রায় ৫২ শতাংশের মতো রয়েছে। এর সুনির্দিষ্ট উপাত্ত হিসেবে স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ছাত্রীদের হার ৫৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং সাধারণ উচ্চমাধ্যমিক কলেজগুলোতে এই হার প্রায় ৫৩ শতাংশ। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এমডিজির আওতায় ২০১৫ সাল নির্ধারিত হওয়ার কাঙ্ক্ষিত সময়ের অনেক আগেই বাংলাদেশ প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় ছাত্র ও ছাত্রীদের ভেতরে সংখ্যাগত সমতা পুরোপুরি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। পরবর্তীতে সময় গড়ার সাথে সাথে শিক্ষাঙ্গনে মেয়েদের এই অংশগ্রহণ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষার পরবর্তী ধাপগুলোতে পৌঁছানোর পর সেই অর্জিত অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা নিয়ে বর্তমানে নানা ধরনের প্রশ্ন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রতিটি শিক্ষাবর্ষে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং অবকাঠামোগত বিভিন্ন প্রয়োজনীয় তথ্য অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সংগ্রহ করে এই শিক্ষা পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রকাশ করে থাকে ব্যানবেইস। এই সরকারি সংস্থাটির সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যানের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সব কটি সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১১ লাখ ১৩ হাজারের চেয়েও বেশি। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীদের অংশ রয়েছে মাত্র ৩৯ দশমিক ৩৪ শতাংশের মতো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলোর হিসাব বাদ দিলে দেশের মোট ৫৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল সাত লাখের কিছু বেশি। তাদের মধ্যে ছাত্রীদের হার ছিল প্রায় ৪২ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার লাখের মতো এবং সেখানে ছাত্রীদের হার তুলনামূলকভাবে বেশ কম, যা মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশের ঘরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক তুলনামূলক চিত্রের তুলনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার আরও অনেক বেশি নিম্নগামী।
অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে এই চিত্র বা পরিসংখ্যানে কিছুটা তারতম্য ও পার্থক্য লক্ষ্য করা যায় যা বেশ লক্ষণীয়। দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৬ হাজারের বেশি মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর হার প্রায় ৪২ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো আবাসিক ক্যাম্পাসে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার বেশ সন্তোষজনক এবং তা প্রায় ৪৯ শতাংশের কাছাকাছি। দেশের মেডিকেল এবং কৃষিশিক্ষার কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানেও নারীর এই উচ্চশিক্ষার হার তুলনামূলকভাবে বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার প্রায় ৫৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এই হার ৫০ শতাংশের বেশি পরিলক্ষিত হয়। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ মনে করেন যে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে শিক্ষাক্ষেত্রে মেয়েদের অংশগ্রহণ দৃশ্যমানভাবেই অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মূল পেছনের কারণ হিসেবে পরিবার ও অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষার সুযোগের পরিধি প্রসারিত হওয়া এবং সরকারের বিভিন্ন সময় গৃহীত নীতিগত বিভিন্ন উদ্যোগের অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকার কথা তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করে থাকেন।
কিন্তু মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে যাওয়া এবং পরবর্তীতে পেশাগত কর্মজীবনে প্রবেশ করার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টিতে মেয়েদের নানা ধরনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। উচ্চশিক্ষার জন্য নিজ পরিবারের গণ্ডি পেরিয়ে বাড়ির বাইরে থাকা, পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আবাসনের তীব্র সংকট, নিরাপদ যাতায়াতের নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা, পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক প্রথা অনুযায়ী অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যাওয়া—এই সমস্ত বিষয়গুলো অনেক তরুণী মেয়ের উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সিদ্ধান্তকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ঠিক কোন নির্দিষ্ট কারণে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ছাত্রীদের অংশগ্রহণের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম হচ্ছে, তা গভীর ও বিশদ গবেষণার মাধ্যমেই কেবল সঠিকভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব এবং সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কর্মক্ষেত্রের ক্ষেত্রেও বিশেষভাবে বদলিযোগ্য কর্মস্থল, অত্যন্ত দূরবর্তী কোনো এলাকায় পদায়ন করা, নিরাপদ আবাসন ও যাতায়াতের সুব্যবস্থা এবং পারিবারিক নানাবিধ দায়িত্ব সঠিকভাবে সামলানোর মতো বিষয়গুলোও একজন নারীর যেকোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এই সমস্ত বাধা বা প্রতিবন্ধকতা যে দেশের সব নারীর ক্ষেত্রে একেবারে সমানভাবে প্রযোজ্য বা সত্য, এমনটি ভাবার কোনো অবকাশ নেই। আবার অন্যদিকে সরকারি চাকরিতে নারীর এই কম প্রতিনিধিত্ব বা অংশগ্রহণের মূল কারণকে শুধু পারিবারিক কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা বদলি সংক্রান্ত নীতির মাঝেই সম্পূর্ণ সীমাবদ্ধ করে রাখা যাবে না, এমন অপরিপক্ব সিদ্ধান্তেও কোনোভাবেই পৌঁছানো সম্ভব নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত সরকারি কর্মচারীদের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে দেশের সরকারি চাকরির মোট পদের সংখ্যা হলো ১৯ লাখ ৮৬ হাজার ২৭২টি। এর বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মোট ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন এবং সারা দেশে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় সোয়া পাঁচ লাখের মতো। বর্তমানে কর্মরত থাকা সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সামগ্রিক হিসাব করলে দেখা যায় সেখানে পুরুষ কর্মীর সংখ্যা ১০ লাখ ৪২ হাজার ৫৬২ জন এবং নারী কর্মীর সংখ্যা মাত্র ৪ লাখ ২১ হাজার ৭৮৮ জন। অর্থাৎ এর সরল হিসাব অনুযায়ী দেশের সরকারি চাকরিতে নারীর অংশ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৮ দশমিক অর্ধেক বা ২৮ দশমিক ৮ শতাংশের ঘরে, যেখানে পুরুষদের অংশ একচ্ছত্রভাবে ৭১ শতাংশের চেয়েও অনেক বেশি।
বিশেষ করে রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের পদগুলোতে নারীর অংশগ্রহণ আরও অনেক বেশি হতাশাজনক ও কম। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর তথা গ্রেড–১–এ কর্মরত মোট ১ হাজার ১০৩ জন কর্মকর্তার ঠিক মধ্যে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ১৬২ জন, যার শতকরা হার দাঁড়ায় প্রায় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। এছাড়া প্রথম থেকে শুরু করে নবম গ্রেড পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সব মিলিয়ে মোট কর্মকর্তা রয়েছেন ২ লাখ ৬ হাজার ৯৭৩ জন। তাদের এই বড় তালিকার মধ্যে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা মাত্র ৪৬ হাজার ৯২৫ জন, যা শতকরা হিসাবে মাত্র প্রায় ২২ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে সরকারের দেওয়া এই নির্দিষ্ট চাকরির সীমিত পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানের বাজারে নারীর প্রকৃত অবস্থান পুরোপুরি বিচার করা বা মূল্যায়ন করা কখনো সম্ভব হবে না। দেশের বিশাল বেসরকারি খাতে, বিশেষ করে দেশের বৃহত্তম তৈরি পোশাকশিল্প খাতসহ বিভিন্ন আধুনিক উৎপাদন ও সেবা খাতের সাথে বিপুলসংখ্যক নারী অত্যন্ত দক্ষতার সাথে কঠোর পরিশ্রম করে কাজ করে চলেছেন।
সার ̈বিষয়টি নিয়ে দেশের বিশিষ্টজনেরা তাদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেছেন। এই পুরো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিজ্ঞ উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী প্রথম আলোকে স্পষ্টভাবে জানান যে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তির ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা প্রদান, নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা এবং যাতায়াতের সুব্যবস্থা করার পাশাপাশি ঠিক কী কারণে মেয়েরা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ছেন, তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে তিনি আরও যোগ করেন যে, সরকারি চাকরিতে নতুন নিয়োগ এবং পরবর্তী পদোন্নতির ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামগ্রিক কর্মপরিবেশকে আরও বেশি নারীবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। কোনো নারীর পক্ষে তার নিজের পরিবার এবং পেশাগত দায়িত্বের মাঝখানে সঠিক ভারসাম্য বজায় রেখে চলার মতো উপযুক্ত সুযোগ তৈরি করা গেলে নারীদের কর্মজীবনে অংশগ্রহণ এবং তা দীর্ঘস্থায়ীভাবে অব্যাহত রাখার পথ আরও অনেক বেশি সহজ ও মসৃণ হয়ে উঠবে বলে তিনি মনে করেন।