
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চলতি ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম ছয় মাস জুড়েই মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবে অত্যন্ত উচ্চ হারে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রবণতা পূর্ণমাত্রায় অব্যাহত রয়েছে। এই বছরের প্রথম ষান্মাসিকে দেশটির বিভিন্ন কারাগারে বাংলাদেশি নাগরিক সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অন্তত ১০৮ জন মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার একটি প্রামাণ্য তথ্য রেকর্ড করেছে জার্মানির বার্লিনভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস বা ইএসওএইচআর।
জার্মানির বার্লিন শহরে প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয় নিয়ে পরিচালিত স্বাধীন ও অলাভজনক এই মানবাধিকার সংগঠনটির যুক্তরাজ্য তথা লন্ডনের পাশাপাশি লেবাননের রাজধানী বৈরুতেও তাদের নির্দিষ্ট প্রতিনিধি ও সহযোগী শাখা সক্রিয় রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রকাশিত এই পরিসংখ্যানটি অত্যন্ত জোরালোভাবে এই সত্য নিশ্চিত করে যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলতি বছরও বৈੱশ্বিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশগুলোর তালিকার একেবারে শীর্ষস্থানটি ধরে রেখেছে সৌদি আরব এবং বিশ্বজুড়ে এই চরম শাস্তি বৃদ্ধির পেছনে তারা প্রধান ভূমিকা রাখছে।
বর্তমান সৌদির বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ এবং প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের যৌথ শাসনামলের শুরু থেকে চলতি বছর দুই হাজার ছাব্বিশের প্রথমার্ধের সময়সীমা পর্যন্ত দেশটিতে মোট মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পুঞ্জীভূত সংখ্যাটি ঠিক দুই হাজারে গিয়ে ঠেকেছে। ঐতিহাসিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, পূর্ববর্তী যেকোনো শাসনামলের তুলনামূলক পর্যালোচনায় বর্তমান এই সংখ্যাটি একটি সম্পূর্ণ রেকর্ড পরিমাণ সর্বোচ্চ পরিসংখ্যান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
সংগৃহীত এই সার্বিক পরিসংখ্যানের গভীর বিশ্লেষণে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জাতীয়তার একটি সুনির্দিষ্ট বৈচিত্র্য আমাদের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। প্রাণদণ্ডপ্রাপ্ত এসব মানুষের তালিকায় মোট সতেরোটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যা মূলত ভিনদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে সৌদির দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের এই সর্বোচ্চ আইনি সাজার একটি ব্যাপক ও ধারাবাহিক প্রয়োগের বাস্তব চিত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।
প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য অনুযায়ী, উল্লিখিত নির্দিষ্ট সময়সীমার ভেতর মোট উনষাটজন বিদেশি নাগরিকের প্রাণদণ্ড সফলভাবে কার্যকর করা হয়েছে, যা ওই সময়ের মোট কার্যকর হওয়া সাজার প্রায় চৌান্ন শতাংশ। এর বিপরীতে যদি আমরা সৌদি স্থানীয় নাগরিকদের দিকে তাকাই, তবে দেখা যাবে যে দেশীয় নাগরিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সংখ্যাটি ছিল উনপঞ্চাশ, যা তাদের সামগ্রিক সংখ্যার প্রায় ছেচল্লিশ শতাংশের কাছাকাছি।
প্রাণদণ্ড কার্যকর হওয়া দুর্ভাগা ব্যক্তিদের এই বিশাল তালিকায় মূল স্বাগতিক দেশ সৌদি আরব ছাড়াও বাংলাদেশ, সুদান, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, জর্ডান, মিসর, সোমালিয়া, নাইজেরিয়া, বেনিন, কুয়েত, ইরাক, কেনিয়া, উগান্ডা এবং দূরবর্তী আফগানিস্তানের নাগরিকেরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
আইনগত দিক থেকে বিচার করলে, কার্যকর হওয়া এসব মৃত্যুদণ্ডগুলোর নেপথ্যে মূলত বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিবরণ বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের দায়ে একাত্তটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট কার্যকর হওয়া সাজার প্রায় ছেষট্টি শতাংশের সমান।
অন্যদিকে মানবজীবনের ওপর মারাত্মক আঘাত হানা সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ডের গুরুতর মামলায় সব মিলিয়ে পঁচিশটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা তাদের মোট সাজার প্রায় তেইশ শতাংশ। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিশেষ প্রকৃতির মামলায় নয়টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা সামগ্রিক সাজার আট শতাংশ এবং বাকি অন্যান্য বিবিধ মামলায় তিনটি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা মোট সাজার তিন শতাংশ।
উপরের এই গাণিতিক হিসাব পর্যালোচনা করলেই খুব সহজে এটি অনুমেয় হয় যে, চলতি বছরের ঠিক এই প্রথমার্ধের সময়টায় কার্যকর হওয়া মৃত্যুদণ্ডগুলোর মধ্যে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের হারই মূলত সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করেছিল।
তাছাড়া, নথিবদ্ধ করা মোট একাত্তরটি মৃত্যুদণ্ডের ভেতর প্রায় তিরাশিটি অর্থাৎ শতকরা প্রায় ছিাত্তর দশমিক আট শতাংশ মৃত্যুদণ্ড এমন সব অপরাধের জন্য প্রদান করা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে কোনো ধরনের ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের বাস্তব কোনো সম্পর্ক ছিল না। আন্তর্জাতিক আইন কাঠামোর অধীনে 'সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ' শব্দগুচ্ছের যে সংকীর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে, বর্তমান এই পরিস্থিতি তার সঙ্গে কোনোভাবেই সংগতিপূর্ণ নয় বলে মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করেন।
আইনি সাজার নিজস্ব প্রকৃতির দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, চুরাশিটি মৃত্যুদণ্ড মূলত বিচারকদের একক বিবেচনামূলক আইনগত ক্ষমতা বা প্রচলিত 'তাজির' শাস্তির মূল ভিত্তির ওপর নির্ভর করে কার্যকর করা হয়েছে, যা তাদের সামগ্রিক সাজার প্রায় সাতাত্তর দশমিক সাত শতাংশ।
এর পাশাপাশি, মোট একাত্তরটি মামলার মধ্যে প্রায় একান্নটি ক্ষেত্র সম্পর্কে সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার একদম আগে বা পরে ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস কিংবা অন্য কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা আগে থেকে কোনো ধরনের তথ্য জানতে বা তা নথিবদ্ধ করতে পারেনি। মামলাগুলো তাদের মোট সংখ্যার প্রায় চুরাশি দশমিক দুই শতাংশ। এর ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থায় এখনো চরম স্বচ্ছতার ব্যাপক অভাব অব্যাহত রয়েছে এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সঠিক তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।
এ বছরের প্রথমার্ধের সার্বিক চিত্র পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের প্রবল আধিপত্যই ছিল প্রধানতম কারণ। দুই হাজার ছাব্বিশ সালের প্রথম ছয় মাসে সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের পেছনে মাদক অপরাধের এই প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। রেকর্ডকৃত একাত্তরটি মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে একাত্তরটিই মাদক অপরাধে সম্পন্ন হয়েছে, যা সামগ্রিক সাজার পঁয়ষট্টি দশমিক সাত শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের সুনির্দিষ্ট বিবরণ অনুযায়ী, মাদকসংশ্লিষ্ট অপরাধের দায়ে ঠিক উনপঞ্চাশটি মৃত্যুদণ্ড সরাসরি বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কার্যকর করা হয়েছে, যা মোট সাজার প্রায় পঁয়তাল্লিশ দশমিক তিন শতাংশ।
মাদকের এই নির্দিষ্ট অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পৃথিবীর নানা দেশের নাগরিক হলেও তাঁদের ভেতরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় উপস্থিত ছিলেন ইথিওপিয়া, পাকিস্তান, সুদান এবং ইয়েমেনের নাগরিকেরা।
বছরের প্রথম এই ছয় মাসের সময়সীমায় বিশেষায়িত ফৌজদারি আদালতের মাধ্যমে রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়া ব্যক্তিদেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এই বিশেষ অংশটি তাদের মোট সাজার প্রায় আট দশমিক তিন শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।
এসব ঘটনার ভেতর অন্যতম একটি অত্যন্ত আলোচিত ঘটনা হিসেবে গত জুনে সৌদ আল-ফারাজের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘের আইনবহির্ভূত আটকাদেশ–সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁর এই আটকাদেশটিকে সম্পূর্ণ বেআইনি ও অযৌক্তিক বলে গণ্য করেছিল।
আবার গত নয়ই এপ্রিল সৌদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আলী আল-সুবাইতি নামের অপ্রাপ্তবয়স্ক এক আসামির ওপর তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর অন্যতম একটি ছিল মাত্র বারো বছর বয়সে রাজপথের কোনো একটি বিক্ষোভে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস তাদের বক্তব্যে স্পষ্টভাবে বলেছে যে, শৈশবের কোমল বয়সে সংঘটিত কথিত অপরাধের দায়ে এখনো অন্তত পাঁচজন ব্যক্তি মৃত্যুদণ্ডের চরম ঝুঁকির মুখে দিন কাটাচ্ছেন। জাতিসংঘের সেই বিশেষ ওয়ার্কিং গ্রুপ এর আগে তাঁদের কয়েকজনের আটকাদেশকে পুরোপুরি বেআইনি ঘোষণা করে তাঁদের অবিলম্বে মুক্তির জোরালো আহ্বান জানিয়েছিল। তবে অত্যন্ত দুঃখজনক বিষয় হলো, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁদের জীবন রক্ষার্থে কিংবা জাতিসংঘের সেই প্রয়োজনীয় সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।
এর পাশাপাশি শুধুমাত্র শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের মৌলিক মতামত প্রকাশের অপরাধে বিচারিক আদালতে দণ্ডিত আরও প্রায় উনপঞ্চাশ জন মানুষ বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের প্রবল ঝুঁকির মধ্যে বেঁচে আছেন। এই ঝুঁকির তালিকায় নাম রয়েছে শেখ সালমান আল-আওদা এবং শেখ হাসান আল-মালিকি নামের অতি পরিচিত দুই ব্যক্তিরও। আঠারো সালের পর থেকে সরকারি কৌঁসুলিরা এই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করে আসলেও অদ্যাবধি তাঁদের বিচারপ্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অমীমাংসিত অবস্থাতেই ঝুলে রয়েছে।
ইউরোপীয় সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটস আরও বিশদভাবে নথিবদ্ধ করেছে যে, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারগুলোর ভেতরে এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ মাথার ওপর ঝুলন্ত মৃত্যুদণ্ড নিয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের এই বন্দিজীবনের তালিকায় খামিস মুশাইত কারাগারে আটান্ন জন ইথিওপীয়, নাজরান কারাগারে অতিরিক্ত পাঁচজন ইথিওপীয় ও পাঁচজন সোমালীয় এবং তাবুক কারাগারে আটজন মিসরীয় নাগরিক বন্দী হিসেবে আটকে আছেন।
সংস্থার কাছে বন্দিদশা থেকে তথ্য প্রদানকারী ব্যক্তিরা নিশ্চিত করেছেন যে তাঁরা প্রতিনিয়ত এক অজানা মৃত্যুদণ্ডের চরম আতঙ্কের ভেতর নিজেদের দিন অতিবাহিত করছেন। তাঁদের সুনির্দিষ্ট কথামতো, সাম্প্রতিক বিগত মাসগুলোতে তাঁরা নিজ চোখে দেখেছেন যে কীভাবে তথাকথিত 'ডেথ রো'-এর বন্দীদের খুব সামান্য কিছুদিনের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা করে রেখে এবং বহির্জাগতিক সমস্ত যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে হঠাৎ অত্যন্ত আকস্মিকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের জন্য অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইএসওএইচআর তাদের শেষ বক্তব্যে জোরালোভাবে উল্লেখ করেছে যে, দুই হাজার ছাব্বিশ সালের প্রথম ছয় মাসের এই বাস্তব চিত্রটি মূলত এটিই চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করে যে, সৌদি আরব তাদের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দায়বদ্ধতা কিংবা জনসমক্ষে বড় গলায় ঘোষিত কোনো আইনি প্রতিশ্রুতির তোয়াক্কা না করেই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে লাগাতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে চলেছে। এই অবহেলার তালিকায় আন্তর্জাতিক নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন এবং শিশু অধিকার সনদের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দলিলগুলোর অধীনে দেওয়া তাদের মৌলিক প্রতিশ্রুতিগুলোও সরাসরি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।