
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যুক্তরাষ্ট্রের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেও বেকারত্বের শিকার হয়েছেন জ্যাক ওয়েইস। গত ২০২৪ সালে নিজের উচ্চশিক্ষা সমাপ্ত করার পর থেকেই পেশাগত জীবনের সুযোগের সন্ধানে নেমে পড়েন এই তরুণ। দীর্ঘ চব্বিশ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পরও এখনো কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান জোগাড় করতে পারেননি তিনি।
বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও কর্পোরেট সংস্থায় এ পর্যন্ত প্রায় আড়াই হাজারের বেশি চাকরির আবেদনপত্র জমা দিয়েছেন এই মেধাবী গবেষক। কিন্তু এত কাঠখড় পুড়িয়েও কোনো সুফল আসেনি। বর্তমানে তিনি বাধ্য হয়ে মা-বাবার সান্নিধ্যে তাদের বাসভবনের ভূগর্ভস্থ তলায় দিন কাটাচ্ছেন।
মার্কিন মুলুকের সল্টলেক সিটির এই বাসিন্দা মূলত রসায়ন প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে প্রিন্সটনে ডক্টরেট করার উদ্দেশ্যে পা রেখেছিলেন। এর আগে তিনি রাইস ইউনিভার্সিটি থেকে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে নিজের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট কোর্স সম্পন্ন করেছিলেন।
তাঁর অনন্য বরফ তৈরির কৌশল সংক্রান্ত গবেষণাকাজের বিশেষ প্রশংসা করেছিল ২০২৪ সালের পদার্থবিদ্যা নোবেল কমিটি। এত অসাধারণ অ্যাকাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থাকার পরও তাঁকে কর্মসংস্থানের জন্য চরম লড়াই করতে হচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে তিনি ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্প এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাগারগুলোতে পদের জন্য চেষ্টা চালান। পরবর্তীতে তিনি তথ্যপ্রযুক্তি ও সফটওয়্যার ডিজাইনসহ অন্যান্য ভিন্ন খাতেও নিজের জীবনবৃত্তান্ত পাঠাতে শুরু করেন। এমনকি একটি রেস্তোরাঁয় সাধারণ পদের কাজের জন্যেও ফরম পূরণ করেছিলেন তিনি।
সেখান থেকেও কোনো ইতিবাচক বার্তা তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো জবাবই দেয়নি, আবার কোথাও থেকে সরাসরি না জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিখ্যাত এই দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই নেটওয়ার্কের সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।
একপর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার একটি খণ্ডকালীন কাজ পেয়েছিলেন এই প্রকৌশলী। সেখানে নিজের টেকনিক্যাল ও ফ্লুইড মেকানিকস সংক্রান্ত দক্ষতা প্রয়োগ করে এআইয়ের জন্য বিভিন্ন প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করতেন।
এআইয়ের উৎপাদিত ফলাফলগুলো নিজে যাচাই করে সেগুলোর মানোন্নয়নের চেষ্টা করতেন তিনি। এই কাজের বিনিময়ে তিনি ঘণ্টায় সত্তর ডলার হারে মজুরি পেতেন। তবে সেই চাকরিও বেশিদিন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি এবং মার্চের মাঝামাঝি সময়ে তার সেই চুক্তি বাতিল করা হয়।
এই তরুণের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বর্তমান মার্কিন শ্রমবাজারের এক গভীর সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তোলে। দেশটিতে বেকারত্ব সূচক সামগ্রিকভাবে কম মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদী চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ডিগ্রিধারী তরুণ প্রজন্মের জন্য কাজের সুযোগ পাওয়া বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে।
নিয়োগকর্তা প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্কতা অবলম্বন করছে। তাছাড়া কর্মী বাছাইয়ের প্রারম্ভিক স্তর থেকে শুরু করে ইন্টারভিউয়ের প্রতিটি ধাপে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে।
চাকরিপ্রার্থীদের এখন মানব সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীদের পরিবর্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও রেকর্ড করে নিজেদের উত্তরের ক্লিপ পাঠাতে হয় কিংবা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নানা ধরনের অনলাইন মূল্যায়নে বসতে হয়।
জ্যাক নিজেও এই আধুনিক ও জটিল রিক্রুটমেন্ট পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছেন। তাঁর প্রবল আশঙ্কা, অনলাইনে আবেদন করার পর তাঁর সিভি হয়তো কোনো স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারিং সিস্টেমে আটকে যাচ্ছে।
এর ফলে উপযুক্ত যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তাঁর আবেদনপত্র সরাসরি নিয়োগকর্তার নজরে আসছে না। কর্মসংস্থানের দেখা না মিললেও এই তরুণ নিজের প্রচেষ্টা কখনো থামিয়ে রাখেননি।
তিনি বর্তমানে নতুন সব গবেষণা ও ফেলোশিপ প্রোগ্রামের দুয়ারে কড়া নাড়ছেন। এমনকি আইনি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের কথা নিয়েও তিনি গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করছেন।
এ ছাড়াও তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে বিভিন্ন আইডিয়া নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে তিনি সম্প্রতি এমন একটি ড্রোনের ডিজাইন তৈরি করেছেন, যা বিশেষ লেজার রশির মাধ্যমে ক্ষতিকর আগাছা পরিষ্কার করতে পারে।
টানা চব্বিশ মাস ধরে কর্মসংস্থান না পেয়ে হতাশ হওয়া খুবই স্বাভাবিক একটি প্রতিক্রিয়া। তবুও তিনি সকল বাধা পেরিয়ে নিজের লক্ষ্য অর্জনে অবিচল থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
অসাধারণ ফলাফল, উচ্চতর ডক্টরেট ডিগ্রি কিংবা গবেষণায় অনন্য সাফল্য অর্জন করলেই যে চাকরি নিশ্চিত হবে, বর্তমান পরিস্থিতি তা আর প্রমাণ করে না।