
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর পাশাপাশি কঠোর ও অনুকরণীয় শাস্তির জোরালো দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিক সমাজ।
আজ বৃহস্পতিবার পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বেলা ১১টার দিকে নেত্রকোনা শহরের প্রাণকেন্দ্র মোক্তারপাড়া এলাকায় অবস্থিত জেলা প্রেসক্লাবের সামনের সড়কে এই মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়।
রুরাল জার্নালিস্ট ফাউন্ডেশন বা আরজেএফের জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই প্রতিবাদ সমাবেশে জেলার বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সংবাদকর্মীরা ছাড়াও নানা পেশার বিশিষ্ট নাগরিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
সমাবেশের বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, গণমাধ্যমকর্মীরা যখন তাঁদের ওপর অর্পিত পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এমন প্রাণঘাতী হামলার শিকার হন এবং পরবর্তীতে সেই সব বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন হয় না, তখন সমাজে এক ভয়াবহ ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় এবং এমন অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থা কোনোভাবেই দীর্ঘকাল চলতে দেওয়া যায় না।
ঘণ্টাব্যাপী চলা এই প্রতিবাদী মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন আয়োজক সংগঠন আরজেএফের নেত্রকোনা জেলা শাখার সভাপতি সুজাদুল ইসলাম এবং পুরো অনুষ্ঠানটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে সঞ্চালনা করেন একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এরশাদুল হক।
উক্ত বিক্ষোভ সমাবেশে আমন্ত্রিত অতিথি ও বিশিষ্ট বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন জেলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহসভাপতি তথা বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী, জেলার প্রবীণ সাংবাদিক ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিনিধি শ্যামলেন্দু পাল এবং কেন্দ্রীয় আরজেএফের চেয়ারম্যান এস এম জহিরুল ইসলাম সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
বক্তব্য রাখতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা হায়দার জাহান চৌধুরী অতীতে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে বলেন যে, এর আগেও আমরা দেখেছি প্রথিতযশা সাংবাদিক সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনার আজও কোনো বিচার সম্পন্ন হয়নি এবং এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি বিচারহীনতার গভীর সংস্কৃতি থেকে আমাদের সমাজকে যেকোনো মূল্যে বেরিয়ে আসতে হবে।
অন্যদিকে, নেত্রকোনা জেলা শহরের এই কর্মসূচির পাশাপাশি আজ সকালেই নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের নিজ গ্রাম দুর্গাপুরের পার্শ্ববর্তী কলমাকান্দা উপজেলার সুনই এলাকায় আরও একটি পৃথক মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি উদযাপিত হয়েছে।
স্থানীয় দশধার-পোগলা সড়কের সুনই ফকিরবাড়ি মোড় এলাকায় নিহত আলিফের শোকার্ত পরিবারবর্গ এবং এলাকার সাধারণ এলাকাবাসীর যৌথ ব্যানারে আয়োজিত ওই প্রতিবাদ কর্মসূচিতে স্থানীয় মানুষেরা ব্যাপক উপস্থিতি জানান দেন।
সেখানকার মানববন্ধনে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামানের বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে গণমাধ্যমের সামনে বক্তব্য প্রদান করেন এবং তাঁর ছোট ভাইয়ের পেশাগত কাজের পরিধি সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, তাঁর ভাই সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকার অবৈধ কর্মকাণ্ড ও অপরাধমূলক তত্পরতা নিয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতেন এবং নিয়মিত লেখালেখি করতেন, আর ঠিক এই কারণেই সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা পরিকল্পিতভাবে তাঁকে অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করে হত্যা করেছে বলে তাঁর জোরালো বিশ্বাস রয়েছে।
এ সময় তিনি আরও অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ভাষায় বলেন যে, আমি তো শত চেষ্টা করেও আর কোনো দিন আমার আদরের ভাইকে বুকে ফিরে পাব না, কিন্তু যারা আমার এই ভাইকে নির্মমভাবে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে, আমি সরকারের কাছে কেবল তাদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক ও কঠোর শাস্তি কামনা করছি।
উল্লেখ্য যে, বিগত ১৫ অক্টোবর গভীর রাতে নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া নামক এলাকায় দুর্বৃত্তদের অতর্কিত গুলিবর্ষণের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই নিহত হন সংবাদকর্মী লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।
নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির পেশাগত জীবনে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা জেলার নিজস্ব প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাঁর বেশ সুখ্যাতি ছিল।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয় মাধ্যম ফেসবুকে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামক একটি বিশেষ পেজ নিজ দায়িত্বে পরিচালনা করতেন এবং সেই ফেসবুক পেজের মাধ্যমে তিনি সীমান্তবর্তী অঞ্চলের চোরাচালানসহ নানাবিধ গোপন অপরাধ ও অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে নিয়মিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।
এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার ঠিক পরের দিনই নিহত আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় উপস্থিত হয়ে অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজন দুষ্কৃতকারীকে সুনির্দিষ্ট আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এই মামলায় এখন পর্যন্ত সর্বমোট দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।