
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
নরওয়ের অত্যন্ত দুর্গম দ্বীপপুঞ্জ স্ভালবার্দের অন্তর্গত লংইয়ারবিয়েন একটি ক্ষুদ্র গ্রাম। উত্তর মেরুর প্রাক্কালে অবস্থিত সুমেরু বা আর্কটিক অঞ্চলের একদম শেষ জনপদ হিসেবে পরিচিত এই স্থানটি। রোমাঞ্চপ্রিয় ভ্রমণপিপাসুদের মাঝে জায়গাটি দারুণভাবে সমাদৃত হলেও বর্তমানে এটি গভীর অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি।
বিশ্বের গড় উষ্ণায়নের হারের তুলনায় প্রায় সাত গুণ বেশি গতিতে এখানকার তাপমাত্রা ঊর্ধ্বমুখী। যার ফলে পৃথিবীর উত্তর গোলার্ধের এই অঞ্চলটি এখন জলবায়ু পরিবর্তনের এক ভয়ংকর পরিণতির শিকার হয়েছে।
এই দ্বীপপুঞ্জের প্রায় সাতান্ন শতাংশ এলাকাই বরফাচ্ছাদিত হিমবাহ দ্বারা আবৃত। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের নেতিবাচক প্রভাবে ফক্সফোনা নামের সুবিখ্যাত হিমবাহটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে গলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।
এখানকার বিশিষ্ট হিমবাহ গবেষক অধ্যাপক অ্যান্ডি হডসন জানিয়েছেন যে এই হিমবাহটি ক্রমশ মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। তুষারপাতের পরিবর্তে বর্তমানে মেঘমালা থেকে বৃষ্টির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রতিটি বর্ষ পরিক্রমায় এখানে এক থেকে চার মিটার পর্যন্ত বরফের আস্তরণ ক্ষীণ হয়ে আসছে। দ্বীপটির সামগ্রিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করলে এই ঘটনাটি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়াবহ অশনিসংকেত।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় এবং ভয়ানক বিপদের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে পারমাফ্রস্ট বা সারা বছর ধরে বরফে শক্ত হয়ে থাকা মাটির স্তর গলে যাওয়া। মাটির গভীরের এই বরফ গলে যাওয়ার দরুন প্রতিনিয়ত ভূমিধস ঘটছে এবং জনপদের বিভিন্ন দালানকোঠার ভিত্তি দুর্বল হয়ে দেয়ালে ফাটল দেখা দিচ্ছে।
বহু ঘরবাড়ি ইতিমধ্যে মানুষের বসবাসের সম্পূর্ণ অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনে তীব্র আবাসনসংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এসবের পাশাপাশি মাটির তলদেশের পাথর থেকে ভারী ধাতু চুইয়ে সরাসরি খাওয়ার পানির উৎসে মিশে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় স্থানীয় প্রশাসন কলের পানি পানে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করতে বাধ্য হয়েছে।
কোনো উপায় না পেয়ে সাধারণ মানুষকে এখন স্থানীয় সুপারমার্কেট থেকে ফিল্টার করা পানি কিনে পান করতে হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই ধারার সাথে সাথে এলাকাটিতে তুষারধসের ঝুঁকিও এক মারাত্মক রূপ ধারণ করেছে।
এককালের স্থায়ী বরফের মরুভূমি সদৃশ এই জনপদে এখন মাত্রাতিরিক্ত বৃষ্টিপাত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ইতিপূর্বে ২০১৫ সালে সংঘটিত এক প্রলয়ঙ্কারী তুষারধসে দুজন মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছিল।
ওই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলা করার জন্য পাহাড়ি ঢালে বিশেষ তুষারবেড়া নির্মাণ করা হয়েছে এবং নতুন সতর্কতা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। প্রকৃতির এমন রুদ্র ও নির্মম রূপের সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এখানকার বহুল জনপ্রিয় পর্যটনশিল্পের ওপরও।
যথেষ্ট পরিমাণে বরফ না পাওয়ার কারণে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত স্নোমোবাইলগুলো গ্রাম থেকে অন্তত সাত মাইল দূরে সরিয়ে নিতে হয়েছে।
হিমবাহ ধসে সাগরে গিয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকির কারণে পর্যটক এবং দর্শনার্থীদের সবসময় নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অত্যন্ত বৈরী প্রকৃতির এই জনপদের প্রায় দুই হাজার ছয়শো স্থায়ী বাসিন্দা শীতের চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিতে অভ্যস্ত। তবে তারা এখন সম্পূর্ণ নতুন এবং এক অচেনা পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন।
প্রকৃতির সাথে টিকে থাকার এই রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে বাধ্য হয়ে তারা পরিবর্তিত আবহার সাথে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
লংইয়ারবিয়েন গ্রামের এই অভাবনীয় ও মর্মান্তিক সংকট কেবল তাদের একার নয়, বরং অন্যান্য আর্কটিক অঞ্চলসহ সমগ্র পৃথিবীর জন্যই এক ভয়ংকর সতর্কবার্তা।