
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
পৃথিবীর প্রবীণতম স্থলচর প্রাণী জোনাথনের দীর্ঘ জীবনের গোপনীয়তা উন্মোচনে গবেষকেরা তার জিনোম ও এপিজিনোম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। সেশেলসের আলডাবরা প্রজাতির এই দানবাকৃতির কচ্ছপের আনুমানিক বয়স ১৯৪ বছর হলেও বিজ্ঞানীরা তার শরীর থেকে অবাক করা কিছু তথ্য পেয়েছেন। বিখ্যাত সায়েন্স অ্যাডভান্সেস সাময়িকীতে প্রকাশিত এই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, কচ্ছপটির কোষে বিশেষ কিছু জিন রয়েছে যা বয়সজনিত অবক্ষয় রোধ এবং প্রদাহ প্রশমনে অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব কেমব্রিজের বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী এবং এই গবেষণার অন্যতম সহলেখক জাস্টিন গারলাখ বিষয়টি পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে জোনাথনের শরীরে কোষের ক্ষতি মেরামতকারী এবং প্রদাহ হ্রাসের সক্ষমতাযুক্ত বিশেষ কিছু জিন সক্রিয় রয়েছে। বিজ্ঞানীদের অনুসন্ধানে এমন প্রায় ২৮৭টি জিনগত বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা হয়েছে, যা তার কোষগুলোকে বয়সের ভারে ন্যুব্জ হওয়া থেকে এবং স্থায়ী ক্ষতি সাধিত হওয়া থেকে শক্ত হাতে রক্ষা করে আসছে।
এই কচ্ছপের অবিশ্বাস্য দীর্ঘায়ুর পেছনে অন্যতম প্রধান একটি কারণ হিসেবে তার অত্যন্ত শ্লথ বিপাকপ্রক্রিয়াকে দায়ী করেছেন বিশেষজ্ঞরা। দেহের ভেতরের এই বিপাকপ্রক্রিয়া ধীর গতির হওয়ার কারণে কোষের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলোও মন্থর গতিতে সম্পন্ন হয়। এর ফলে কোষ এবং ডিএনএ বা বংশগতির উপাদানের মারাত্মক ধরনের ক্ষতি সাধিত হওয়ার আশঙ্কা অনেকাংশেই কমে যায় বলে গবেষকদের অভিমত।
তবে কেবল ধীরগতির বিপাকপ্রক্রিয়াই নয়, বরং বার্ধক্যের শেষ প্রান্তে পৌঁছেও জিনগত কার্যক্রম নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার অসাধারণ ক্ষমতা ধরে রাখার বিষয়টি কচ্ছপটির ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বিজ্ঞানী গারলাখের সুনির্দিষ্ট মন্তব্য অনুযায়ী, সাধারণ মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রম ও সুশৃঙ্খল পরিচালনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে ক্যানসারের মতো মারাত্মক ও প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। অথচ অবাক করা বিষয় হলো, জোনাথনের বয়স্ক শরীরেও বর্তমানে তুলনামূলক অনেক কম বয়সী একটি তরতাজা প্রাণীর মতো জিনগত নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে।
জোনাথনের সঠিক জন্মতারিখ বা বয়স সুনির্দিষ্টভাবে কারও জানা নেই, তবে ১৮৮২ সালের পুরোনো একটি স্থিরচিত্রের মধ্যে তাকে সম্পূর্ণ পূর্ণবয়স্ক একটি প্রাণী হিসেবে প্রথম দেখা গিয়েছিল। সাধারণত আলডাবরা প্রজাতির কচ্ছপগুলো প্রায় ৫০ বছর বয়স হওয়ার পর তাদের পূর্ণ শারীরিক আকার বা প্রাপ্তবয়স্কতা অর্জন করে থাকে। সেই ঐতিহাসিক হিসাবকে ভিত্তি ধরেই বর্তমানে জোনাথনের বয়স প্রায় ১৯৪ বছর বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। যদিও ২০২২ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপের তৎকালীন গভর্নর তার আনুষ্ঠানিক জন্মদিন হিসেবে ১৮৩২ সালের ৪ ডিসেম্বর তারিখটি নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, তবুও গবেষক গারলাখ মনে করেন যে এই প্রাণীটির প্রকৃত বয়স ইতিমধ্যে দুই শ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি হতে পারে।
ভারত মহাসাগরের উষ্ণ প্রবালদ্বীপ সেশেলসপুঞ্জে জন্মলাভ করা জোনাথন তার দীর্ঘ জীবনের সিংহভাগ সময়টাই কাটিয়ে দিয়েছে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক ভূখণ্ড সেন্ট হেলেনা দ্বীপে। বর্তমানে তার চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণভাবে লোপ পেলেও সে তার শারীরিক দিক থেকে এখনো বেশ সক্রিয় রয়েছে এবং তার শরীরের বিশাল ওজন প্রায় ১৮০ কেজির কাছাকাছি।
বিজ্ঞানীরা এই জটিল গবেষণার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কচ্ছপটির শরীর থেকে কোনো ধরনের রক্ত সংগ্রহ করা থেকে বিরত থেকে বরং তার মুখের ভেতরের লালা থেকে প্রয়োজনীয় ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করেন। এরপর সেই ডিএনএ সেশেলসের আলডাবরা প্রবালপ্রাচীরের আশপাশে বসবাসকারী তুলনামূলক কম বয়স্ক ও তরুণ কচ্ছপগুলোর জিনগত বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তুলনা করে দেখেন। এই তুলনামূলক বিশ্লেষণে জোনাথনের কোষের ভেতরে শক্তি উৎপাদনকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ মাইটোকন্ড্রিয়া অত্যন্ত ভালো এবং কর্মক্ষম অবস্থায় বিদ্যমান থাকার জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশভিলভিত্তিক খ্যাতনামা কালেল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা এবং এই গবেষণার জ্যেষ্ঠ লেখক স্টিফেন ক্লার্ক এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন যে পৃথিবীর দীর্ঘজীবী মানুষদের শরীরের মধ্যেও কার্যকর ও শক্তিশালী মাইটোকন্ড্রিয়ার উপস্থিতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে। ভবিষ্যতে মানুষের শরীরের মাইটোকন্ড্রিয়ার সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে সক্ষম এমন বিশেষ ধরনের ওষুধ খুঁজে বের করে তা মানবদেহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগ করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য তাদের রয়েছে।
তবে এই ব্যতিক্রমী গবেষণার পরেও কিছু জটিল প্রশ্ন থেকে গেছে, কারণ মাত্র একটিমাত্র কচ্ছপের জিন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে তার এই দীর্ঘ জীবনের শতভাগ সুনির্দিষ্ট ও অকাট্য কারণ নিশ্চিত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তুরস্কের মিডল ইস্ট টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য গবেষক হানদান মেলিকে দোনেরতাশের সুচিন্তিত মতানুসারে, জোনাথনের মতো এমন অতি দীর্ঘজীবী প্রাণীদের সঙ্গে পৃথিবীর অন্যান্য সাধারণ প্রাণীদের একটি বিস্তৃত ও তুলনামূলক গবেষণা সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি।
এদিকে এই গবেষণার কার্যপ্রণালি ও কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়েও নিজেদের জোরালো প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অ্যাট বাফেলোর বিজ্ঞ অধ্যাপক ভিনসেন্ট জে. লিঞ্চ। তাঁর সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই গবেষণায় ব্যবহৃত বিশ্লেষণপদ্ধতির ভেতরে এমন কিছু মারমুখী ত্রুটি থাকতে পারে যার ফলে অনেক উপকারী জিনগত পরিবর্তনকে ভুলবশত ক্ষতিকর কিংবা ক্ষতিকর পরিবর্তনকে উপকারী হিসেবে চিহ্নিত করার মারাত্মক ঝুঁকি থেকেই যায়।
এতসব ভিন্ন ভিন্ন মতপার্থক্য ও বৈজ্ঞানিক বিতর্ক সত্ত্বেও গবেষক দলটি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে জোনাথনের মতো সুদীর্ঘকাল বেঁচে থাকা প্রাণীদের নিয়ে পরিচালিত এসব চুলচেরা গবেষণা মানবদেহের বার্ধক্য প্রক্রিয়া এবং মরণব্যাধি ক্যানসার সম্পর্কে সম্পূর্ণ নতুন ধারনার জন্ম দিতে পারে। আর তাদের এই অর্জিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান সুদূর ভবিষ্যতে সাধারণ মানুষের সুস্থ ও রোগমুক্তভাবে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার নতুন পথ ও উপায় খুঁজে পেতে দারুণভাবে সহায়তা করবে।