
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাত্র পনেরো ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সময়ের ব্যবধানে দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর খুলনা মহানগরীতে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর দুটি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। বর্তমানের প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, আজকের এই বৃহস্পতিবারের একটি দিনে সকালবেলা পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় এবং পরবর্তীতে সন্ধ্যার ঠিক পরপরই জিন্নাহপাড়া এলাকায় দুষ্কৃতকারীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন যথাক্রমে একজন যুবক ও একজন গৃহবধূ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক সংগ্রহ করা তথ্য ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে পুলিশ ধারণা করছে যে, এই দুটি আলাদা হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে মাদক ব্যবসা সংক্রান্ত কোনো পুরানো বিরোধ বা দ্বন্দ্ব জড়িত থাকতে পারে।
আজকের দিনটির সন্ধ্যার ঠিক পর পর আনুমানিক রাত পৌনে আটটার দিকে জনবহুল জিন্নাহপাড়া এলাকার বউবাজারের সাত নম্বর গলির একেবারে মাথায় অত্যন্ত নৃশংসভাবে গুলি চালিয়ে খুন করা হয় পঁচিশ বছর বয়সী এক গৃহবধূকে, যার নাম ছিল খুশি। নিহত ওই নারী মূলত ওই একই এলাকার বাসিন্দা খোকন শেখের সুযোগ্য কন্যা এবং তিনি সুমন সরদারের সহধর্মিণী হিসেবে সংসার করছিলেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী ও পুলিশ প্রশাসনের তরফ থেকে পাওয়া বিবরণে প্রকাশ পেয়েছে যে, সন্ধ্যার ঠিক পরপরই নিজের বাসা থেকে বের হয়ে পূর্ব দিক বরাবর হেঁটে যাচ্ছিলেন খুশি। তাদের নিজেদের বাসস্থান থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে আগে থেকেই ওঁৎ পেতে লুকিয়ে থাকা দুজন দুষ্কৃতকারী আকস্মিক তাঁর দিকে অগ্রসর হয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি ছোড়ে।
এই অতর্কিত সশস্ত্র হামলার সময় ঘাতকদের ছোড়া একটি বুলেট সরাসরি গিয়ে লাগে খুশির মাথায়। এরপর মুহূর্তের মধ্যে সুযোগ বুঝে ওই দুর্বৃত্তরা দ্রুত একটি মোটরসাইকেলে চড়ে ঘটনাস্থল থেকে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় সাধারণ মানুষ দ্রুত এগিয়ে এসে মারাত্মকভাবে আহত খুশিকে উদ্ধার করেন এবং তাঁকে চিকিৎসার জন্য দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর জরুরি বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা তাঁকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার বিষয়ে লবণচরা থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ মোশারফ হোসেন গণমাধ্যমের কাছে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান যে, নিহত খুশি ওই সময়ে বাড়ি থেকে সম্পূর্ণ একা একা বের হয়েছিলেন, নাকি তাঁর সঙ্গে অন্য কেউ সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, সেই বিষয়টি এখনেও নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
তবে এই পুলিশ কর্মকর্তার কথা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী গৃহবধূর নিজ বাসস্থানের খুব কাছাকাছি এলাকাতেই দুজন অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্ত তাঁকে অতর্কিতে গুলি করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। বর্তমানে নিহত খুশির মৃতদেহটি ময়নাতদন্তের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে হাসপাতালের মর্গে যথাযথ নিরাপত্তায় সংরক্ষিত রয়েছে।
নিহত গৃহবধূ খুশি এবং তাঁর স্বামী সুমন সরদার ওরফে ব্লেড বাবু উভয়েই দীর্ঘ একটি দীর্ঘ সময় ধরে অবৈধ মাদক ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন বলে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানিয়েছেন খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার তথা খুলনা জোনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও নিশ্চিত করেন যে, ওই স্বামী-স্ত্রীর বিরুদ্ধে অতীতেও সুনির্দিষ্ট মাদক-সংশ্লিষ্ট একাধিক অপরাধের মামলা রয়েছে। পুলিশ প্রাথমিক অনুসন্ধানের ভিত্তিতে মনে করছে যে মূলত মাদক সংক্রান্ত অভ্যন্তরীণ বিরোধের জেরে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে, আর বর্তমানে এর গভীরে পৌঁছানোর জন্য নিবিড় তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়েছে যে, এই বিশেষ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় এনে গ্রেপ্তার করার জন্য পুলিশের বিশেষ অভিযান পুরোদমে চলমান রয়েছে।
এদিকে রাতের বেলায় গৃহবধূ খুশিকে যেখানে খুন করা হয়, সেখান থেকে আনুমানিক প্রায় তিন কিলোমিটার দূরবর্তী স্থানে অবস্থিত শহরের পূর্ব বানিয়াখামার এলাকায় আজকের এই দিনটির সকালের দিকে তাওহিদুল ইসলাম নামের বত্রিশ বছর বয়সী এক যুবককে একইভাবে গুলি করে হত্যা করে পালিয়েছে অস্ত্রধারী দুর্বৃত্তরা।
খুলনা সদর থানার অন্তর্গত পূর্ব বানিয়াখামার এলাকার পরিচিত আনসার আলী গলির ঠিক সামনের জনাকীর্ণ রাস্তায় এই চাঞ্চল্যকর ও ভয়াবহ গুলির ঘটনাটি ঘটেছিল।
পরবর্তীতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে নিহত তাওহিদুলের নিথর দেহ উদ্ধার করে এবং তা ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে জরুরি বিভাগে পৌঁছানোর পর কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে নিশ্চিত করেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থল থেকে তল্লাশি চালিয়ে একটি পরিত্যক্ত মোটরসাইকেল এবং সেখান থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে দুটি গুলির ব্যবহৃত খোসা বা কার্তুজ সফলভাবে উদ্ধার করেছে। এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের পরপরই পুরো এলাক জুড়েই এক ধরনের অজানা আতঙ্ক ও থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে।
পুলিশ ও স্থানীয় অধিবাসীদের যৌথ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায় যে, আজকের এই ভোরের দিকে আনুমানিক সাড়ে পাঁচটার সময় পূর্ব বানিয়াখামারের খাদেমুল উলুম মাদ্রাসার সামনের রাস্তায় বেশ কয়েকজন যুবকের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির একপর্যায়ে ওই দুর্বৃত্তরা তাদের সঙ্গে থাকা অবৈধ অস্ত্র বের করে গুলিবর্ষণ শুরু করে, যার ফলে তাওহিদুলের পিঠের অংশে একটি গুলি সজোরেবিদ্ধ হয়। এর ফলশ্রুতিতে ঘটনাস্থলেই তাঁর করুণ মৃত্যু ঘটে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন গণমাধ্যমকে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন যে, নিহত তাওহিদুল ইসলাম অতীতে কারাগারে বন্দি থাকা খুলনার অত্যন্ত কুখ্যাত শীর্ষ সন্ত্রাসী পলাশ গ্রুপের একজন অন্যতম সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও পারিপার্শ্বিক অনুমানের ভিত্তিতে ধারণা করা হচ্ছে যে, কোনো একটি পূর্ব শত্রুতার জেরে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী গ্রুপের ছোড়া গুলিতেই তাঁর এই শোচনীয় মৃত্যু ঘটেছে। পুলিশ ইতিমধ্যে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত খুনিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করতে পেরেছে এবং তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার লক্ষ্য নিয়ে জোরালো অভিযান শুরু করেছে।
পুলিশের রেকর্ডপত্র অনুযায়ী জানা যায় যে, নিহত তাওহিদুলের বিরুদ্ধে এর আগেও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে একাধিক ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছিল।
উল্লেখ্য যে, চলতি বছরের গত জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বিগত নয় মাসের এই দীর্ঘ সময়ে পুরো খুলনা মহানগরী এলাকা জুড়ে মোট ৩৩টি পৃথক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এর বিপরীতে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের দৃঢ় দাবি অনুযায়ী, ইতিমধ্যেই এই সমস্ত ঘটনার মধ্যে মোট ৩১টির চাঞ্চল্যকর রহস্য পুলিশ সফলভাবে উদ্ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে।
এছাড়া খুলনা মহানগর পুলিশের নিজস্ব অপরাধমূলক তালিকা বা ডাটাবেজ অনুযায়ী, বর্তমান সময়ে পুরো খুলনা শহরজুড়ে অন্তত ১০টি ভিন্ন ভিন্ন শীর্ষ অপরাধী চক্র অত্যন্ত সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। এলাকার নিয়ন্ত্রণ বা আধিপত্য নিজেদের হাতে ধরে রাখা অথবা পূর্বের কোনো হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণ করার তীব্র মানসিকতা থেকে মূলত এই চক্রগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের জেরে মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলা ও প্রাণঘাতী হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো ঘটে চলেছে।