
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বুধবার ভোরের দিকে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া গ্রামে একটি অভাবনীয় ও আতঙ্কজাগানিয়া ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় নোয়াখালীপাড়ার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বয়সী নারী শবে মেরাজ ভোরের আজানের পরপরই প্রাত্যহিক রুটিন অনুযায়ী রান্নাঘরে প্রবেশ করেন। উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের জন্য এক কাপ চা তৈরি করা, কিন্তু রান্নাঘরে পা রাখতেই তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে যায়। রান্নাঘরের ভেতরে এক অদ্ভুত ও ভীতিপ্রদ ফোঁস ফোঁস শব্দ তাঁর কানে ভেসে আসে এবং দৃষ্টি পড়তেই তিনি শিউরে ওঠেন। তিনি দেখতে পান, সেখানে ওত পেতে রয়েছে অত্যন্ত বিশাল আকারের একটি বিষধর সাপ। ভয়ে ও আতঙ্কে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তিনি তীব্র চিৎকার শুরু করেন, যা মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের নীরবতা ভেঙে দেয়। শবে মেরাজের সেই আকস্মিক চিৎকারে ঘুম ভেঙে আশেপাশের প্রতিবেশীরা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন এবং মুহূর্তের মধ্যে রান্নাঘরের সামনে জড়ো হন। উৎসুক ও আতঙ্কিত প্রতিবেশীরা যখন বুঝতে পারেন ভেতরে একটি বিশাল সাপ রয়েছে, তখন তাঁরা হুজুগে পড়ে সাপটিকে মেরে ফেলার জন্য নানা প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তবে শেষ পর্যন্ত বন বিভাগের সময়োপযোগী ও কার্যকর হস্তক্ষেপে পরিবেশবান্ধব ও দুর্লভ এই বিষধর প্রাণীটির প্রাণ রক্ষা পায়।
বিশাল আকৃতির এই সাপটি উদ্ধারের প্রাথমিক প্রচেষ্টায় সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে সবার আগে এগিয়ে আসেন পাশের গ্রাম রাজারছড়ার বাসিন্দা নূর মোহাম্মদ। এই নূর মোহাম্মদ কেবল সাধারণ কোনো গ্রামবাসী নন, তিনি বন সংরক্ষণের কাজে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করার উদ্দেশ্যে গঠিত কমিউনিটি প্যাট্রল গ্রুপের বা সিপিজির একজন নিবেদিতপ্রাণ সদস্য। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে নূর মোহাম্মদ সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, শবে মেরাজের নিজের ছেলে ছৈয়দুল আমিন ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তাঁকে জরুরি খবরটি দেন। ছৈয়দুল জানান যে তাদের পারিবারিক বসতঘরের ভেতরে একটি অচেনা ও বিপজ্জনক সাপ ঢুকে পড়েছে। খবর পেয়ে নূর মোহাম্মদ তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলে ছুটে যান এবং সেখানে গিয়ে দেখতে পান এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। তিনি লক্ষ্য করেন যে প্রায় একশ লোক সেখানে ভিড় জমিয়েছেন এবং সবাই মিলে লাঠিসোঁটা নিয়ে সেই সাপটিকে খুঁজে বের করে পিটিয়ে মেরে ফেলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
তীব্র জনরোষ ও উত্তেজনার মুখে পড়েও নূর মোহাম্মদ বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে সাহসিকতার সঙ্গে উপস্থিত জনতাকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইন সম্পর্কে স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বোঝাতে সক্ষম হন যে, এই ধরনের বন্য প্রাণী হত্যা করা আইনত একটি বড় অপরাধ। একই সঙ্গে তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত বন বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের বিষয়টি ফোনে অবিহিত করেন এবং সাহায্য চান। বন বিভাগের কর্মকর্তারাও সংবাদ পাওয়া মাত্রই কালবিলম্ব না করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে সশরীরে ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান। নূর মোহাম্মদের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া সাপটির বিশাল দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় বিশ ফুট এবং এর মোট ওজন ছিল সাত কেজি। পরবর্তীতে বন বিভাগের বনকর্মীদের সরাসরি উপস্থিতি ও তত্ত্বাবধানে নূর মোহাম্মদ নিজেই অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সাপটিকে একটি বস্তার ভেতর বন্দী করেন। এরপর নোয়াখালীপাড়ার সেই ঘটনাস্থল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শিলখালীর গর্জন বনে সাপটিকে নিরাপদে অবমুক্ত করা হয়।
এই পুরো উদ্ধার অভিযান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের অধীনস্থ শিলখালী রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে মানুষের আতঙ্ক ও কৌতূহলের পাত্র হওয়া প্রাণীটি আসলে একটি ‘কিং কোবরা’ বা রাজগোখরা সাপ, যা আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উপকারী। তৌহিদুল ইসলাম জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁরা নোয়াখালী পাড়ায় ছুটে যান এবং সেখানে গিয়ে দেখেন যে শত শত লোক লাঠিসোঁটা হাতে সাপটিকে মেরে ফেলার জন্য উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছে।
উদ্ধার কাজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বন কর্মকর্তা তৌহিদ বলেন যে, উন্মত্ত লোকজনকে নিবৃত্ত করা ও শান্ত করা তাঁদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও বেগ পেতে হয়েছিল। তবে তাঁদের অনেক চেষ্টার পর অবশেষে সাপটিকে কোনো ক্ষতি ছাড়াই জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হন এবং পরে লোকালয় থেকে দূরে গভীর বনে অবমুক্ত করে দেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, বন বিভাগের লোকজন সাপটিকে অক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়ায় স্থানীয় জড়ো হওয়া লোকজনের একটি বড় অংশ বেশ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে।
দীর্ঘকাল ধরে বন্যপ্রাণী ও বিশেষ করে সাপ নিয়ে নিবিড় গবেষণা ও কাজ করে আসছেন খ্যাতনামা সর্প–বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাঈদ। সাম্প্রতিক তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান যে, আমাদের এই বাংলাদেশে বর্তমানে সব মিলিয়ে মোট ১০৭ প্রজাতির সাপের অস্তিত্ব রয়েছে। এই বিশাল প্রজাতির বৈচিত্র্যের মধ্যে কেবল বিষধর সাপের সংখ্যা হলো ৩২ প্রজাতি। আর যত ধরনের বিষধর সাপ আমাদের এই ভূখণ্ডে রয়েছে, তার মধ্যে কিং কোবরা বা রাজগোখরাই হচ্ছে আকৃতিতে সবচেয়ে বড়। তিনি আরও জানান যে এই সাপ পূর্ণ বয়সে প্রায় ৪৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা এটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা বিষধর সাপ হিসেবে পরিচিত করে তুলেছে।
সর্প–বিশেষজ্ঞ আবু সাঈদের পেশাদারী পর্যবেক্ষণ ও অনুমান অনুযায়ী, কিং কোবরা সাধারণত অন্য সাপ, বিশেষ করে দাঁড়াশ সাপ খেয়ে বেঁচে থাকে। দাঁড়াশ সাপ সচরাচর মানুষের বসতবাড়ির আশেপাশে এবং কৃষিজমিতেই বেশি বিচরণ করে থাকে। তাঁর মতে, হয়তো এই বিশালাকার কিং কোবরাটি কোনো একটি দাঁড়াশ সাপকে তাড়া করতে করতে ভুলবশত বা অজান্তেই মানুষজনের এই রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল। আইনগত দিক তুলে ধরে তিনি জানান, বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন–২০২৬ এর ৪১ ধারার ৩ উপধারায় এই বিশেষ প্রাণীটি সম্পর্কে কঠোর বিধান রয়েছে। এই আইন অনুযায়ী, কেউ যদি প্রথমবার এই সাপ হত্যা করে, তবে তার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর যদি একই অপরাধ কোনো ব্যক্তি পুনরায় করে, তবে তার ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত জেল অথবা পাঁচ লক্ষ টাকা জরিমানা করার কঠোর আইনি বিধান স্পষ্টভাবে বলা আছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তৈরি করা লাল তালিকা অনুযায়ী কিং কোবরা বা রাজগোখরা সাপটি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বা ভালনারেবল ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত। নির্বিচারে বন উজাড় করার ফলে এই বন্য প্রাণীটি আজ তাদের নিজস্ব প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারাচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত নানামুখী সংকটের মুখোমুখি হয়ে অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।