
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একজন মুমিনের দৈনন্দিন জীবনের অত্যন্ত অপরিহার্য দিক হলো বিভিন্ন ধরনের ইবাদত। নামাজ আদায়, রোজা রাখা, দান-সদকা করা কিংবা সাধারণ মানুষের উপকার করা—সবকিছুই মূলত নেক আমলের আওতাভুক্ত। তবে কেবল নির্দিষ্ট কিছু আমল সম্পাদন করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; বরং সেই নেক আমল মহান আল্লাহর দরবারে কবুল বা গ্রহণযোগ্য হওয়াটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। কারণ, বান্দার প্রতিটি আমলের প্রকৃত সফলতা পুরোপুরি নির্ভর করে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন এবং তাঁর পক্ষ থেকে যথাযথ প্রতিদান পাওয়ার ওপর। মূলত কোন বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে নেক আমল কবুল হয়, তা জেনে নেওয়া প্রত্যেক মুমিনের জন্যই অত্যন্ত আবশ্যক।
আমল বা ইবাদত কবুল হওয়ার একেবারে মৌলিক ও প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় ইমানকে। আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন, তাঁর প্রতিটি নির্দেশনার প্রতি পুরোপুরি আনুগত্য এবং সব ধরনের শিরক থেকে মুক্ত থাকা হলো একজন প্রকৃত মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি। বিশুদ্ধ ইমান ছাড়া মানুষের করা কোনো সৎকর্মই পরকালের জীবনে মুক্তি এবং কাঙ্ক্ষিত প্রতিদান পাওয়ার নির্ভরযোগ্য মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন যে, আর যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী, তারা সবাই জান্নাতে প্রবেশ করবে (সুরা নিসা, আয়াত: ১২৪)।
উল্লেখিত পবিত্র আয়াত থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহর কাছে মানুষের সৎকর্মের প্রতিদান পাওয়ার সঙ্গে ইমানের অত্যন্ত গভীর ও আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই যেকোনো মুমিন বান্দার প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব হলো সর্বদা বিশুদ্ধ ইমান নিয়ে জীবন পরিচালনা করা এবং শিরকসহ ইমানের পরিপন্থী যত বিষয় রয়েছে, তা থেকে নিজেকে নিরাপদে রাখা। ইমানহীন কোনো কাজেরই আখিরাতে কোনো মূল্য নেই, যা একজন মুমিনকে সবসময় স্মরণে রাখতে হবে।
কোনো নির্দিষ্ট কাজকে শরিয়তের পরিভাষায় ইবাদত হিসেবে পালন করতে হলে তা অবশ্যই মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। ধর্মের নামে এমন কোনো মনগড়া ইবাদত বা নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা শরিয়তে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়, যার পক্ষে কোনো সঠিক ধর্মীয় ভিত্তি নেই। মূলত ইবাদত হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একমাত্র মাধ্যম। এ প্রসঙ্গে বিশ্বনবীজি (সা.) অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের বিষয়ে এমন কিছু নতুন বিষয় সৃষ্টি করল, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যাত (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৬৯৭)।
নেক আমল কবুল হওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের হালাল উপার্জন এবং পবিত্র খাবার গ্রহণের গুরুত্ব একেবারেই অপরিসীম। একজন মানুষ নিয়মিত সালাত আদায় করছেন, সিয়াম পালন করছেন কিংবা প্রচুর দান-সদকা করছেন, কিন্তু তার যাবতীয় উপার্জন ও ভোগের উৎস যদি হারাম পন্থার হয়, তবে তা তার ইবাদত কবুলের পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে। এ বিষয়ে হাদিসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবাণী এসেছে, যেখানে রাসুল (সা.) বলেছেন যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি কেবল পবিত্র বস্তু বা হালাল ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না (সহিহ মুসলিম)।
এরপর নবীজি (সা.) এমন একজন মানুষের করুণ অবস্থার কথা উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করেছিলেন, যিনি অত্যন্ত দীর্ঘ সফরে ক্লান্ত এবং ধুলামলিন অবস্থায় দুই হাত আসমানের দিকে তুলে আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত আকুলভাবে দোয়া করেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, তার ভক্ষণকৃত খাবার হারাম, পানীয় হারাম, পরিহিত পোশাক হারাম এবং তার গোটা জীবনটাই পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ হারাম উপার্জন দিয়ে। এরপর রাসুল (সা.) অত্যন্ত ভাবগম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন রেখেছিলেন যে, এমন অবস্থায় কীভাবে সেই ব্যক্তির দোয়া কবুল হতে পারে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০১৫)।
বর্ণিত এই হাদিস থেকে খুব সহজেই বোঝা যায় যে, হালাল উপার্জন এবং একটি পবিত্র জীবনযাপন করা ইবাদত কবুলের ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হারাম উপার্জন মানুষের সমগ্র আত্মিক জীবনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং মহান আল্লাহর দরবারে ইবাদত কবুলের পথে দুর্লঙ্ঘ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই নেক আমল ও ইবাদত বন্দেগি করার পাশাপাশি মানুষের উচিত উপার্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এবং ভোগের সব স্তরে শরিয়তের হালাল-হারামের সুনির্দিষ্ট বিধান অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলা।
ইবাদত কবুলের অন্যতম প্রধান এবং শেষ শর্তটি হলো ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। অর্থাৎ মানুষ বা সমাজের প্রশংসা পাওয়ার জন্য, সামাজিক মর্যাদা অর্জনের উদ্দেশ্যে কিংবা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য নয়; বরং একমাত্র মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার লক্ষ্যেই সব ধরনের ইবাদত সম্পাদন করা। পবিত্র কোরআনে নির্দেশ দিয়ে বলা হয়েছে যে, তাদের তো এ ছাড়া আর কোনো নির্দেশই দেওয়া হয়নি যে তারা অত্যন্ত একনিষ্ঠভাবে কেবল আল্লাহর ইবাদত করবে, দ্বীনকে তাঁরই জন্য সম্পূর্ণ খালেস করে (সুরা বাইয়্যিনাহ, আয়াত: ৫)।
কোনো ব্যক্তি যদি কেবল দুনিয়াবি মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশায় দান-সদকা করেন, সমাজে নিজেকে একজন বড় ধার্মিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে ইবাদত করেন কিংবা কেবল সামাজিক খ্যাতি বা মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যেই কোনো নেক কাজ করেন, তবে তা সম্পূর্ণভাবে ইখলাসের পরিপন্থী। ইসলাম ধর্মে এই ধরনের লোকদেখানো মানসিকতাকে ‘রিয়া’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, যা অত্যন্ত কঠোরভাবে নিন্দিত ও নিষিদ্ধ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন যে, অতএব চরম দুর্ভোগ ও ধ্বংস সেইসব নামাজির জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে চরমভাবে উদাসীন এবং যারা লোকদেখানোর জন্যই তা করে থাকে (সুরা মাউন, আয়াত: ৪-৬)।
তাই যেকোনো ভালো আমল বা ইবাদত করার ঠিক আগে নিজের অন্তরের নিয়ত বা সদিচ্ছা গভীরভাবে যাচাই করে নেওয়া উচিত। নিজের বিবেกকে প্রশ্ন করা অত্যন্ত প্রয়োজন যে, আমি কি সত্যিই কাজটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি, নাকি কেবল মানুষের প্রশংসা কুড়ানোর অসৎ উদ্দেশ্যে করছি? নিজের নিয়ত সবসময় বিশুদ্ধ রাখা এবং যেকোনো ধরনের লোকদেখানো মনোভাব বা প্রবৃত্তি থেকে সার্বক্ষণিক বেঁচে থাকার চেষ্টা করাটাই হলো মূলত ইখলাসের সোজা পথে অবিচল থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। লেখাটির শেষাংশে এই পুরো বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিশিষ্ট আলেম, লেখক ও গবেষক রায়হান আল ইমরান।