
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আসন্ন শিক্ষাবর্ষের প্রাক্-প্রাথমিক থেকে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যবই মুদ্রণের কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ এবং মাঠপর্যায়ে বিতরণের সামগ্রিক অগ্রগতি বেশ সন্তোষজনক হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে।
তবে এর ঠিক বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে মাধ্যমিক স্তরের কার্যক্রমে, যেখানে মুদ্রণ ও সরবরাহের গতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে হাতে মাত্র দুই মাস সময় অবশিষ্ট থাকায়, জানুয়ারির প্রথম দিনে সব শিক্ষার্থী নিজেদের টেবিলে সব নতুন বই পাবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দকৃত বইয়ের মাত্র ৩ শতাংশের মতো এ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি, চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণির সিলেবাসে নতুন সংযোজিত হতে যাওয়া মোট চারটি পাঠ্যবইয়ের জন্য এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মুদ্রণ কার্যাদেশই প্রদান করা হয়নি।
পরিস্থিতি এমন দাঁড়ালেও, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সম্পূর্ণ আশাবাদী যে তারা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই সমস্ত মুদ্রণ শেষ করতে পারবেন। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে ছাপাখানা থেকে বইগুলো মাঠপর্যায়ে প্রেরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কর্তৃপক্ষ, যদিও কিছু প্রিন্টিং প্রেস সামান্য পিছিয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, ২০১০ সাল থেকেই সরকার দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের সব শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক উপায়ে নতুন বই প্রদান করে আসছে। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বছরের শুরুর দিনে সব শিক্ষার্থীর হাতে সব পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা ও অনিশ্চয়তার ইতিহাস রয়েছে।
বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় পরপর দুটি শিক্ষাবর্ষেই নির্দিষ্ট ডেডলাইনের মধ্যে সম্পূর্ণ বই বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, চলতি শিক্ষাবর্ষের শুরু হওয়ার এক মাস সাত দিন পর অর্থাৎ গত ৭ ফেব্রুয়ারি নাগাদ শতভাগ পাঠ্যবই সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছিল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তার আগের শিক্ষাবর্ষে তো পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হয়েছিল, যেখানে সমস্ত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে প্রায় তিন মাস দীর্ঘ সময় ব্যয়িত হয়েছিল। সময়মতো বই হাতে না পাওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল এবং অভিভাবকদের মধ্যেও তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।
আগামী শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রায় ৩১ কোটি বইয়ের মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিশু এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ উপযোগী ব্রেইল ও বর্ণমালার বইও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে একাই মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাপা হচ্ছে ২২ কোটির অধিক পাঠ্যবই এবং প্রাথমিক স্তরের বইয়ের নির্ধারিত সংখ্যা প্রায় ৮ কোটি ২১ লাখ ৬৭ হাজার।
এই বিপুল পরিমাণ পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সম্ভাব্য মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৯ কোটি টাকার কাছাকাছি। এনসিটিবির হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর পর্যন্ত প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৮৬ শতাংশের বেশি বইয়ের মুদ্রণ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
প্রয়োজনীয় বাঁধাই, কাটিং এবং পিডিআই বা প্রাক-সরবরাহ পরিদর্শন প্রক্রিয়া সফলভাবে শেষ করার পর প্রাথমিক স্তরের ৭৪ শতাংশ বই ইতিমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে, প্রথম ধাপের দরপত্রের আওতায় থাকা মাধ্যমিক স্তরের ২০ কোটি ৮৪ লাখের বেশি বইয়ের প্রায় অর্ধেক অংশের প্রিন্টিং শেষ হয়েছে গত ২১ অক্টোবরের মধ্যে।
তবে আনুষঙ্গিক প্রাক-সরবরাহ প্রক্রিয়া এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে মাধ্যমিক স্তরের মোটে ৪০ শতাংশ বই এ পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। এনসিটিবির পাঠ্যপুস্তক বিষয়ক সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের মূল টার্গেট হলো ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মুদ্রণ শেষ করা।
বর্তমান অগ্রগতির সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেছেন এবং নির্ধারিত সময়ে অর্থাৎ জানুয়ারি মাসেই শিক্ষার্থীদের হাতে সব নতুন পাঠ্যবই তুলে দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।
এদিকে আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে এনসিটিবি। এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের নানা সেক্টর ও ব্রিগেড ফোর্সের ইতিহাস, বীরশ্রেষ্ঠদের বর্ণাঢ্য জীবনী এবং ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি বইয়ে যুক্ত হচ্ছে।
পাশাপাশি, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ঐতিহাসিক ভূমিকাও পাঠ্যপুস্তকের পাতায় স্থান পাচ্ছে। অন্যদিকে, আগামী শিক্ষাবর্ষের চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে দুটি করে মোট চারটি একদম নতুন বই অন্তর্ভুক্ত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চরমোনাই ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চতুর্থ শ্রেণির নতুন বই দুটির নাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ ও ‘খেলাধুলা’। আর ষষ্ঠ শ্রেণির নতুন সংযোজিত বই দুটি হলো ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ ও ‘আনন্দময় শিক্ষা’।
এছাড়াও নবম-দশম শ্রেণির বাংলা পাঠ্যবইয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রচিত ‘স্বাধীনতাযুদ্ধের স্মৃতি’ শীর্ষক প্রখ্যাত নিবন্ধটি যুক্ত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বর্ণনার ভেতরেও প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের মেয়াদকালেও এই ঘোষণা সংক্রান্ত বিষয়ে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়েছিল। এর ফলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের পাঠ্যবই, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংশোধিত বই এবং বর্তমান সরকারের তৈরি করা বই মিলিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণার বর্ণনা তিনটি ভিন্ন রূপ ধারণ করছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এনসিটিবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানিয়েছেন যে, আগামী ২৫ অক্টোবর জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসিসি) একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা আহ্বান করা হয়েছে। ওই নির্ধারিত সভায় আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন লাভ করার পরই কেবল এই নতুন চারটি বইয়ের জন্য প্রিন্টিং অর্ডার বা কার্যাদেশ প্রদান করা হবে।