
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইসলামি সমাজব্যবস্থায় উপহার আদান-প্রদান পারস্পরিক ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য বাড়ানোর একটি চমৎকার মাধ্যম। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পারস্পরিক উপহার বিনিময়ের ওপর জোর দিয়ে বলেছেন যে, এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যকার অন্তরের টান ও প্রীতি বৃদ্ধি পায়। তবে ইসলাম ধর্মে হালাল, হারাম এবং ন্যায়পরায়ণতার সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারিত রয়েছে, যার ফলে সব ধরনের উপহার গ্রহণ করা বা দেওয়া বৈধ নয়। অনেক সময় দেখা যায় যে উপহারের মোড়কের আড়ালে মূলত ঘুষ, সুদ কিংবা বিভিন্ন ধরনের অন্যায় লেনদেন সংঘটিত হয়, যা শেষ পর্যন্ত সমাজে বিশৃঙ্খলা ও অপরাধের জন্ম দেয়। আর এই কারণেই মহানবী (সা.) উপহারের নামে এ ধরনের ক্ষতিকর ও অবৈধ লেনদেন কঠোর হাতে দমন করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনরত কোনো ব্যক্তির জন্য সাধারণ সাধারণের কাছ থেকে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে বিচারক বা রাষ্ট্রীয় পদস্থ কর্মকর্তাদের কেউ কোনো উপঢৌকন দিলে তা মূলত তাদের ক্ষমতার প্রভাবেই দেওয়া হয়, যা প্রত্যক্ষভাবে ঘুষের একটি অন্য রূপ মাত্র। দায়িত্বশীল পদে বহাল থাকা অবস্থায় এই ধরনের উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণ হারাম এবং এটি সরাসরি রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ বা গুলুলের অন্তর্ভুক্ত। এই প্রসঙ্গে একবার মহানবী (সা.) ইবনে লুতবিয়া নামক এক সাহাবিকে জাকাত সংগ্রহের কাজে পাঠিয়েছিলেন, যিনি দায়িত্ব পালন শেষে ফিরে এসে কিছু সম্পদ নিজের কাছে রেখে বাকিগুলো জমা দেন এবং দাবি করেন যে এগুলো তাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা জানার পর নবীজি অত্যন্ত রাগন্বিত হয়ে বলেছিলেন যে, সে যদি নিজের বাবা-মায়ের ঘরে অলস বসে থাকত, তবে দেখত কেউ তাকে কোনো উপহার দেয় কি না। খ্যাতনামা ইসলামি পণ্ডিত মোল্লা আলী কারি তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ মিরকাতুল মাফাতিহ শরিহ মিশকাতিল মাসাবিহ-তে উল্লেখ করেছেন যে, বিচারকদের প্রাপ্ত উপহার মূলত তাঁদের পদের কারণে দেওয়া হয়ে থাকে, তাই এই ধরনের উপঢৌকন গ্রহণ করা হারাম এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের শামিল।
কারও চাকরি নিশ্চিত করা, বিপদ থেকে উদ্ধার করা কিংবা কোনো বৈধ কাজের ক্ষেত্রে সুপারিশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে একটি অত্যন্ত মহৎ কাজ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ ধরনের নিঃস্বার্থ উপকারের বিনিময় হিসেবে কোনো ধরনের উপহার গ্রহণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মহানবী (সা.) এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি তার অপর ভাইয়ের জন্য কোনো সুপারিশ করে এবং এরপর সেই ভাই তাকে কোনো উপহার দেয় আর সে তা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করে, তবে সে মূলত সুদের একটি বিশাল দরজায় গিয়ে উপস্থিত হলো। অর্থাৎ, সাধারণ কোনো উপকারের পর উপহার গ্রহণ করলে তা রূপ নেয় সুদের মতো ভয়াবহ পাপে। একই নিয়মের ব্যতিক্রম নয় মানুষের বিপদের সময় ঋণ প্রদানের বিষয়টিও। প্রয়োজনের সময় মানুষকে ঋণ দেওয়া একটি উত্তম কাজ হিসেবে পরিগণিত হলেও, ঋণদাতা ব্যক্তির জন্য কখনো ঋণগ্রহীতার পক্ষ থেকে কোনো অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করা বৈধ নয়, কারণ এটিও সুদের পর্যায়ে পড়ে। এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট হাদিসে এসেছে যে, যখন কেউ কাউকে ঋণ প্রদান করে এবং ঋণগ্রহীতা সন্তুষ্ট হয়ে তাকে কোনো উপহার দেয় কিংবা নিজের বাহনে চড়ার সুযোগ করে দেয়, তখন ঋণদাতার উচিত তা বর্জন করা। তবে হ্যাঁ, যদি ঋণ লেনদেনের অনেক আগে থেকেই উভয়ের মধ্যে নিয়মিত উপহার বিনিময়ের পূর্ব সম্পর্ক বিদ্যমান থাকে, তবে কেবল সেই বিশেষ ক্ষেত্রটি এর বাইরে বলে গণ্য হবে।
পিতা-মাতার জন্য সন্তানদের মাঝে উপহার বন্টনের ক্ষেত্রে ইনসাফ বা সমতা বজায় রাখা অপরিহার্য একটি শর্ত। কোনো ধরনের সুনির্দিষ্ট ও গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া নিজের সন্তানদের মধ্যে কাউকে অধিক পরিমাণে বা অধিক মূল্যের উপহার দেওয়া এবং অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা ইসলামি ন্যায়বিচারের পরিপন্থী কাজ। প্রখ্যাত সাহাবি নোমান ইবনে বশিরকে তাঁর পিতা একটি মূল্যবান দাস উপহার দেওয়ার ঘটনা যখন মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থাপন করা হয়, তখন তিনি তা অনুমোদন করেননি। বরং তিনি অবিলম্বে ওই পিতাকে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি যেন মহান আল্লাহকে ভয় করেন এবং তাঁর সব সন্তানের মাঝে উপহার প্রদানে সম্পূর্ণ ইনসাফ রক্ষা করেন। সন্তানদের উপহারের ক্ষেত্রে এই ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ নবীজি স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন, কারণ এটি ভাইবোনেদের মনে জিঘাংসা, হিংসা এবং পারস্পরিক মনকষাকষির জন্ম দিয়ে পারিবারিক বন্ধন নষ্ট করে।
যেভাবে বিচারক বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য উপঢৌকন গ্রহণ করা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ, ঠিক একইভাবে নিজেদের অবৈধ স্বার্থ হাসিল করার উদ্দেশ্যে কিংবা অন্য কারও ন্যায্য অধিকার নষ্ট করার লক্ষ্যে তাঁদের উপহার প্রদান করাও সমানভাবে নিষিদ্ধ। এটি মূলত এক ধরনের মোড়কবদ্ধ ঘুষ ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। এই বিষয়ে মহানবী (সা.) অত্যন্ত হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন যে, ঘুষ প্রদানকারী এবং ঘুষ গ্রহণকারী উভয়ের ওপরই আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হয়। ইসলামের অন্যতম সংস্কারক ও চিন্তাবিদ শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি তাঁর বিখ্যাত হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ গ্রন্থে লিখেছেন যে, শাসকশ্রেণি বা বিচারকদের উপঢৌকন প্রদান করার এই পুরোনো প্রথা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচার এবং বৈষম্যের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। যে সমাজে এই কালচার স্বাভাবিক বা নিয়মিত রূপ লাভ করে, সেই সমাজে অসহায় মজলুম মানুষের অধিকার পুরোপুরি ভূলুণ্ঠিত হয় এবং সামগ্রিক সামাজিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়।
পরিশেষে বলা যায় যে, উপহার মূলত পারস্পরিক সম্প্রীতি, ভালোবাসা এবং আন্তরিকতার এক অনন্য প্রতীক। কিন্তু যখনই এই পবিত্র উপহারের মধ্যে জাগতিক কোনো স্বার্থের সংমিশ্রণ ঘটে, পদের অপব্যবহার হয়, কিংবা সুদ ও বৈষম্যের প্রবেশ ঘটে, তখন তা আর সুন্দর উপহার থাকে না; বরং সেটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নেয়। একজন প্রকৃত মুমিন বা মুসলমান হিসেবে আমাদের সবার প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব হলো, উপহার আদান-প্রদান করার ক্ষেত্রে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রদর্শित সেই সুস্পষ্ট সীমারেখাগুলো নিখুঁতভাবে মেনে চলা এবং সমাজের সকল অনিয়ম রোধ করা।