
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিষয়ে গঠিত সংসদীয় ফোরামগুলো যেকোনো ব্যক্তিকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পারে এবং তাদের কাছে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন কাগজপত্র বা দলিলাদিও তলব করার এখতিয়ার রাখে। তবে কোনো ব্যক্তি যদি এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে উপস্থিত না হন কিংবা নথিপত্র সরবরাহ না করেন, তবে তাকে বাধ্য করার মতো পূর্ণাঙ্গ কোনো আইনি এখতিয়ার বা ক্ষমতা এই ফোরামগুলোর হাতে নেই। দেশ স্বাধীন হওয়ার দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও এই আইনি ঘাটতি বা শূন্যতা পূরণের উদ্দেশ্যে কোনো আইন প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। যদিও বিগত ২০১১ সালের দিকে এই বিষয়ে একটি আইনি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল, কিন্তু সেটি শেষ পর্যন্ত আর কোনো দিন পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তরিত হতে পারেনি। যার ফলে সংসদীয় এই ফোরামগুলোর তদন্ত করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং সামগ্রিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রাথমিক উদ্যোগগুলো অদ্যাবধি অসম্পূর্ণ ও ঝুলে রয়েছে।
আমাদের দেশের সংবিধানের ৭৬ নম্বর অনুচ্ছেদে এই সংসদীয় ফোরামগুলোর মূল গঠনপদ্ধতি এবং সুনির্দিষ্ট দায়িত্বাবলি স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই ফোরামগুলো মূলত যেকোনো খসড়া আইন বা বিল গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা, পাস হওয়া আইনগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন পর্যালোচনা করা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সামগ্রিক কার্যক্রম পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তদন্ত করার ক্ষমতা রাখে। এই সুনির্দিষ্ট কাজের অংশ হিসেবে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নিকট প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করতে বলতে পারে এবং তাদের অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে মৌখিকভাবে কিংবা লিখিতভাবে জবাব গ্রহণ করতে পারে।
সংবিধানের এই একই অনুচ্ছেদে আরও পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের মাধ্যমে সংসদীয় এই ফোরামগুলোকে যেকোনো সাক্ষীকে সশরীরে হাজির করা, শপথবাক্য পাঠ করিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা এবং যেকোনো প্রয়োজনীয় দলিলপত্র দাখিল করতে বাধ্য করার আইনগত ক্ষমতা প্রদান করা সম্ভব।
জাতীয় সংসদের প্রচলিত কার্যপ্রণালি বিধির ভেতরেও সংসদীয় ফোরামগুলোর পক্ষ থেকে যেকোনো ব্যক্তিকে সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র ও নথি তলব করার পরিষ্কার ক্ষমতা রাখা হয়েছে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি সেই তলব বা নির্দেশ অমান্য করেন, তবে তাঁকে জোরপূর্বক হাজির করা কিংবা নথি দিতে বাধ্য করার কোনো প্রকারের পূর্ণাঙ্গ আইনি ভিত্তি ফোরামগুলোর নেই। এমনকি তলব করার পরও যদি কেউ তা অমান্য করেন, তবে সেই ক্ষেত্রে কী ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, সে বিষয়েও কোনো পূর্ণাঙ্গ বিধান বা নিয়ম নেই।
বিভিন্ন বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা বারবার বলে আসছেন যে, এই ধরনের আইনি সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতার কারণে সংসদীয় ফোরামগুলোর তদন্ত করার ক্ষমতা এবং যেকোনো বিষয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সামর্থ্য দারুণভাবে খর্ব হচ্ছে। অতীতে এমন বহু ঘটনা ঘটেছে যেখানে ফোরামগুলোর পক্ষ থেকে করা তলব সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করার বেশ কিছু বাস্তব নজির রয়েছে।
বিশেষ করে নবম জাতীয় সংসদের মেয়াদকালে এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নানা মহলে আলোচনায় স্থান লাভ করেছিল। তৎকালীন সময়ে অর্থাৎ ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত একটি স্থায়ী ফোরাম দুর্নীতি দমন কমিশনের তৎকালীন প্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরী, দুইজন কমিশনার এবং একজন সাবেক সচিবকে সশরীরে হাজির হওয়ার জন্য তলব করেছিল। তবে তাঁদের কেউই শেষ পর্যন্ত ওই ফোরামের কোনো বৈঠকে উপস্থিত হননি।
সেই নির্দিষ্ট সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনকে তলব করার কোনো প্রকার আইনি ক্ষমতা সংসদীয় ফোরামের নেই। মূলত এই সুনির্দিষ্ট কারণেই কমিশনের পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত বৈঠকে অংশ না নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। দুদকের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বাধীন সংস্থাকে সংসদীয় ফোরাম তলব করতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন নিয়েও তখন ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
ঠিক একই বছরে সংসদীয় আরেকটি তদন্ত ফোরাম তৎকালীন স্পিকার জমির উদ্দিন সরকার, সাবেক ডেপুটি স্পিকার আখতার হামিদ সিদ্দিকী এবং সাবেক চিফ হুইপ খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনকে তলব করেছিল। তবে তাঁরাও নির্ধারিত সময়ে ফোরামের সামনে উপস্থিত হননি। বিশেষ করে খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন সেই নির্দিষ্ট ফোরামের বৈধতা এবং তাদের আইনগত এখতিয়ার কতখানি, তা নিয়ে শক্ত প্রশ্ন তুলেছিলেন।
বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, সে সময়ের এসব ধারাবাহিক ঘটনার সার্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ২০১১ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে ‘জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির (সাক্ষ্য গ্রহণ ও দলিলপত্র দাখিল) আইন’ শিরোনামে একটি খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছিল। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, শেষ পর্যন্ত সেই খসড়াটি আর আইনে পরিণত হয়নি। পরবর্তীতে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আর নতুন করে কোনো ধরনের উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়নি।
সে সময়ের ওই খসড়াটিতে সংসদীয় ফোরামগুলোকে যেকোনো অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজে দেওয়ানি আদালতের সমকক্ষ ক্ষমতা প্রদান করার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কোনো সাক্ষী যদি ফোরামের কাজে ন্যূনতম সহযোগিতা না করেন, তবে তাঁকে আর্থিক জরিমানা করার বিধান এবং তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ করার প্রস্তাবও সেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
উক্ত সূত্রটি আরও জানিয়েছে যে, ফোরামের পক্ষ থেকে দেওয়া সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট নির্দিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা সংস্থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাবও ওই খসড়ার ভেতরে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে সংসদীয় ফোরামগুলো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে নানা ধরনের সুপারিশ প্রদান করতে পারে। তবে সেই সব সুপারিশ বাস্তবায়নের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা কিংবা কঠোর আইনি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সংসদীয় কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ে গবেষক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত সুপারনিউমারারি অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে, নবম জাতীয় সংসদের সময়কালে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত এই বিষয়ে একটি ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তবে মন্ত্রিসভার বৈঠকে সংশ্লিষ্ট সেই খসড়াটি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে পরবর্তী কোনো সরকারই এই বিষয়ে আর ন্যূনতম কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।
অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ আরও জোরালোভাবে বলেন যে, এই রকম একটি আইন প্রণয়ন করা বর্তমানে অত্যন্ত জরুরি ও অবধারিত। সংসদীয় ফোরামগুলো যদি তাদের সামনে কোনো সাক্ষীকে উপস্থিত হতে বাধ্য করতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়, তবে সেই ফোরামগুলোর নিজস্ব কোনো কার্যকর ও ফলপ্রসূ ক্ষমতা অবশিষ্ট থাকে না।