
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা কারওয়ান বাজারের একটি পরিচিত গালিতে তিন চাকার সাধারণ একটি ভ্যানগাড়ির ওপরেই গড়ে তোলা হয়েছে সম্পূর্ণ আধুনিক এক কফিশপ। এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগের নেপথ্যে রয়েছেন উদ্যোক্তা রুবেল আহমেদ, যিনি নিজের দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতা ও সাহসকে পুঁজি করে অভিনব এই ব্যবসা শুরু করেছেন।
গ্রাহকদের সময় বাঁচানোর বিষয়টি মাথায় রেখে এই কফিশপে চালু করা হয়েছে স্মার্টফোন অ্যাপের মাধ্যমে আগাম ফরমায়েশ দেওয়ার সুবিধা। কর্মব্যস্ত মানুষ অফিস থেকে বের হওয়ার আগেই অ্যাপে নিজেদের পছন্দের পানীয়ের অর্ডার নিশ্চিত করছেন এবং নিচে নেমে ভ্যানের সামনে আসতেই হাতে পেয়ে যাচ্ছেন কাঙ্ক্ষিত কফি।
ডিজিটাল লেনদেনের যুগে এই ভ্যানগাড়ি ক্যাফেতে ক্যাশ টাকা লেনদেনের কোনো ঝামেলা রাখা হয়নি, বরং সব ধরনের বিল পরিশোধের জন্য রাখা হয়েছে ‘বাংলা কিউআর’ স্ক্যান করার ব্যবস্থা। এনটিভির পেছনের গলি হিসেবে পরিচিত এই স্থানে আগে থেকেই কিছু সাধারণ চায়ের দোকান থাকলেও, এই ভ্যানগাড়িটি তার আধুনিক সেবা দিয়ে সবার নজর কাড়ছে।
দোকানে কোনো হোম ডেলিভারির ব্যবস্থা না থাকলেও আশপাশে কর্মরত চাকরিজীবীদের জন্য এই সেলফ-পিকআপ পদ্ধতি দারুণ স্বস্তি নিয়ে এসেছে। বড় কোনো ক্যাফের মতো এখানেও ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চমানের কফি তৈরির আধুনিক যন্ত্র, যা পুরো উদ্যোগটিকে স্মার্ট বাংলাদেশের একটি বাস্তব রূপ দান করেছে।
এমজিএইচ গ্রুপের নামী ক্যাফে চেইন ‘বারিস্তা’য় দীর্ঘসময় বারিস্তা হিসেবে কাজ করার সুবাদে অর্জিত দক্ষতাই রুবেলকে এমন সাহসী পদক্ষেপ নিতে অনুপ্রাণিত করেছিল। পরবর্তীতে বারিস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর যখন পেয়ালা নামের প্রতিষ্ঠান চালু হয় এবং তাঁর কর্মজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে, তখন তিনি অন্যের অধীনে কাজ না করার সিদ্ধান্ত নেন।
চাকরির মায়া ত্যাগ করে ২০১৮ সালে নিজের জমানো সঞ্চয় ও সাহসিকতাকে সম্বল করে প্রায় চার লাখ টাকা খরচ করে একটি ইতালিয়ান বাণিজ্যিক কফি মেশিন ক্রয় করেন রুবেল। সেই দামি যন্ত্রটি তিন চাকার একটি সাধারণ ভ্যানগাড়ির ওপর স্থাপন করার মাধ্যমেই শুরু হয় ‘প্যাসিফিক ক্যাফে’ নামের এই ব্যতিক্রমী প্রতিষ্ঠানের যাত্রা।
বর্তমানে এই ভ্রাম্যমাণ কফিশপের পুরো কার্যক্রমে উদ্যোক্তা রুবেলের সঙ্গে অত্যন্ত উদ্যম ও নিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন তাঁর ছোট ভাই দুর্জয় ভুঁইয়া। ভ্যানগাড়ির অত্যন্ত সীমিত পরিসর হওয়া সত্ত্বেও পানীয়ের মান ও স্বাদের দিক থেকে কোনো ধরনের আপস করা হচ্ছে না, বরং বড় ক্যাফের সমকক্ষ স্বাদই নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এই ক্যাফের মূল মেন্যুতে গরম কফির পাশাপাশি রয়েছে হরেক রকমের আইটেম যার মধ্যে এসপ্রেসো ৯০ টাকা, ক্যাফে ম্যাকিয়াতো ১০০ টাকা এবং আমেরিকানো ১০০ টাকা মূল্যে বিক্রি হয়। এছাড়া ক্যাপাচিনো ১০০ টাকা, লাতে ১৩০ টাকা এবং মোকাসিনো ১৫০ টাকা মূল্যে গ্রাহকদের পরিবেশন করা হচ্ছে।
গরমের দিনে ক্লান্তি দূর করতে ঠান্ডা কফির সমাহারও বেশ সমৃদ্ধ, যার মধ্যে আইসড আমেরিকানো ১২০ টাকা, আইসড লাতে ১৩০ টাকা এবং মোকা ফ্রাপ্পে ১৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ওরিও কফি শেক ১৬০ টাকা এবং ওরিও চকলেট শেক ১৭০ টাকা মূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।
চা প্রেমীদের তৃষ্ণা মেটাতে রয়েছে বৈচিত্র্যময় আয়োজন, যেখানে সাধারণ গ্রিন টি বা রঙ চা মাত্র ১০ টাকায় এবং মিল্ক টি ২০ টাকায় মিলছে। মসলা রঙ চা ও লেমন চা ১৫ টাকা এবং মসলা মিল্ক চা ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসচেতন ক্রেতাদের জন্য বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে ২০ টাকার টনিক টি এবং ৩০ টাকার হানি লেমন টি। এছাড়া তরুণ প্রজন্মের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে ৩০ টাকার চকলেট ও পিনাটস টি এবং ৪০ টাকার কফি চকলেট ও চকলেট পিনাটস টি।
জুস এবং মিল্কশেকের দুনিয়ায় ফ্রেশ জুস ও লেমনেড ৫০ টাকা, লাস্যি ও আইস টি ৭০ টাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে। বিভিন্ন ফলের মিল্কশেক যেমন পেঁপে, চকলেট, ম্যাঙ্গো, বাদাম, খেজুর, স্ট্রবেরি ও কলার মিল্কশেক প্রতিটি ৮০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।
একটু প্রিমিয়াম ঘরানার স্বাদের জন্য ওরিও কফি ও ওরিও চকলেট মিল্কশেকের দাম রাখা হয়েছে ১০০ টাকা। এর সঙ্গে দ্রুত নাস্তা হিসেবে ৮০ টাকার স্যান্ডউইচ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে ৭০ টাকার দই-চিড়া সম্প্রতি মেন্যুতে যুক্ত করেছেন রুবেল।
সহ-উদ্যোক্তা দুর্জয় ভুঁইয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাদের এই ভ্যানগাড়িতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ কাপ কফি এবং একশ কাপের বেশি চা বিক্রি হয়ে থাকে। এছাড়া বিয়েবাড়ি, করপোরেট মিটিং বা বড় কোনো জমায়েতে অন্তত ২০০ কাপ কফির অর্ডার পেলে তারা এই আধুনিক মেশিনসহ নির্দিষ্ট ভেন্যুতে হাজির হন।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার এবং অন্যান্য সরকারি ছুটির দিনগুলো বাদ দিয়ে সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্যাসিফিক ক্যাফের এই চা-কফি বিক্রির ব্যস্ততা অব্যাহত থাকে।