
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ায় বা এসবিআইতে মারাত্মক সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে। সিরিউসিম নামের কুখ্যাত হ্যাকার গোষ্ঠী দাবি করেছে যে তারা এই ব্যাংকের অসংখ্য গ্রাহকের অতি গোপনীয় সব তথ্য নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। গ্রাহকদের ব্যক্তিগত নানা তথ্য ও নথিপত্র বাইরে চলে যাওয়ার বিষয়টি ইতোমধ্যে আংশিকভাবে স্বীকারও করে নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
হ্যাকারদের কবলে পড়া এসব তথ্যের মধ্যে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত পরিচিতি, ঋণের আবেদনপত্র এবং অ্যাকাউন্ট খোলার নানা কাগজপত্র রয়েছে। গত শুক্রবার এসবিআই জানিয়েছে যে যেসব গ্রাহক এই তথ্য চুরির সরাসরি শিকার হয়েছেন, তাদের প্রত্যেককে পৃথকভাবে ই–মেইল ও হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সতর্কবার্তা পাঠিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে ব্যাংকটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে যে গ্রাহকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং তাদের সঞ্চিত তহবিল সম্পূর্ণ নিরাপদ অবস্থায় রয়েছে। গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া কেবল ভারতেরই সর্ববৃহৎ ব্যাংক নয়, বরং এটি সারা পৃথিবীর মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। বর্তমানে এই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত আছেন অর্ধশতাব্দী বা ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ।
গত ১৬ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সাইবারপালস৫৬ নামের একটি মনিটরিং হ্যান্ডল থেকে প্রথম এই বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের তথ্য প্রকাশ্যে আনা হয়। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভারতের এই শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজার ডেটা বা তথ্য বিভিন্ন উপায়ে বাইরে বেরিয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে এমন দাবি জোরালো হচ্ছে যে ফাঁস হওয়া এই ডেটাসেটে গ্রাহকদের ব্যক্তিগত তথ্যাদির পাশাপাশি তাদের আবাসিক ঠিকানা, ঋণের আবেদন, সহায়ক নথিপত্র এবং আবেদনসংক্রান্ত অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রেকর্ডও রয়েছে। তবে সাইবারপালস৫৬ এই বিষয়গুলো সামনে আনলেও, এই দাবির সত্যতা ও মূল উৎস এখনো পুরোপুরি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একই সঙ্গে এটিও এখনো স্পষ্ট নয় যে ঠিক কতজন পৃথক গ্রাহক এই ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, কারণ একই ব্যক্তির একাধিক রেকর্ড সেখানে থাকতে পারে। এসবিআইয়ের নিজস্ব ডিজিটাল সিস্টেমে সরাসরি কোনো অনুপ্রবেশ ঘটেছে কি না কিংবা এই নথিপত্রগুলো ব্যাংকটি থেকে সংগৃহীত হয়েছে কি না, তা নিয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
সাইবার নিরাপত্তাবিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে পুরো বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে যাবতীয় সত্য তথ্য জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময়ের প্রয়োজন রয়েছে। সাইবারপালস৫৬ আরও সতর্ক করে বলেছে যে এই ঘটনা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তবে চুরি যাওয়া এই তথ্য ব্যবহার করে পরিচয় চুরি করে ভুয়া ঋণের আবেদন করার মতো বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
এটা একটা বড় আশঙ্কা হলেও, এর পাশাপাশি আরও নানা ধরনের আর্থিক অপরাধ ও অপব্যবহার হওয়ার জোরালো আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভারতে বসবাসকারী বিপুলসংখ্যক নাগরিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং তাদের একটি বিশাল অংশের মূল অ্যাকাউন্টই রয়েছে এই স্টেট ব্যাংকে।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, কেন্দ্রীয় সরকার এবং সাধারণ গ্রাহকদের জন্য প্রধান উদ্বেগের বিষয় হলো, ভারতের বহু মানুষের একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও তাদের প্রাথমিক বা প্রধান অ্যাকাউন্টটি এসবিআইতেই রয়েছে। ভারতের মোট জনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশ মানুষ অর্থাৎ দেড়শ কোটি মানুষের মধ্যে ৫০ কোটির বেশি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে এই ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে তালিকার শীর্ষ দুটি স্থানে চীনের ব্যাংক থাকলেও ভারতের এসবিআই রয়েছে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে। সাধারণ মানুষ এখনো এই ব্যাংকটিকে সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করেন এবং এসবিআই এমন কিছু বিশেষ সুযোগ–সুবিধা প্রদান করে যা অন্য কোনো ব্যাংক দিতে পারে না।
ব্যাংক বিশেষজ্ঞরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে এই প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের সাইবার আক্রমণের মুখে পড়লে এবং তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে ভারতীয় অর্থনীতি মারাত্মক বিপদের মুখে পড়ত, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি চরম ঝুঁকির সম্মুখীন হতো।
ভারতের আর্থিক খাত বর্তমানে যেসব ক্রমবর্ধমান সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি সামনে এলো। এর আগে চলতি বছরের শুরুর দিকে ভারতের প্রধান নিয়ন্ত্রক ব্যাংক বা রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সাইবার নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা আরও কঠোর করেছে।