
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় বামপন্থী ছাত্রনেত্রী নেহা বোরার একটি ভিডিও বার্তা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে। চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের সংগ্রাম থেকে শক্তি নেওয়ার কথা তিনি ওই বার্তায় উল্লেখ করেছিলেন। ভারতের আন্দোলনমুখর এই পরিচিত তরুণ নেত্রীর এমন বক্তব্য স্বাভাবিকভাবেই এদেশের সচেতন মহলের বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
তবে এই ভিডিওটি ডিজিটাল মাধ্যমে আসার পর থেকেই দুই দেশের সীমানার এপার ও ওপারজুড়ে এর বিষয়বস্তু নিয়ে নানা ধরনের রাজনৈতিক প্রচার শুরু হয়। বাংলাদেশের রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমগুলো নেহার বক্তব্যের নির্দিষ্ট কিছু খণ্ডিত অংশ বাছাই করে প্রচার করতে শুরু করে।
অন্যদিকে ভারতের সরকারঘনিষ্ঠ এবং ‘গোদি মিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত গণমাধ্যমগুলো ভিন্ন এক কৌশল নেয়। তারা এমন একটি আবহ তৈরি করার চেষ্টা চালায় যে নেহা কোনো উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর আন্দোলন থেকে প্রেরণা পেয়েছেন এবং বাংলাদেশের মতো ভারতেও ঠিক একইভাবে সরকার পরিবর্তনের চক্রান্ত করছেন।
প্রচারকৌশলের ধরন দুই দেশে ভিন্ন হলেও এর চূড়ান্ত পরিণতি দাঁড়ায় এক জায়গায়। নেহা ঠিক কোন শক্তির সংগ্রামের প্রতি এবং কী ধরনের যৌক্তিক দাবিতে সংহতি জানিয়েছিলেন, সেই মূল প্রেক্ষাপটটি সম্পূর্ণ আড়ালে চলে যায়।
অবশেষে নতুন আরেকটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে এই সমস্ত অসত্য প্রচারের কড়া জবাব দিয়েছেন নেহা বোরা। তাঁর এই বক্তব্য কেবল নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার জন্যই নয়, বরং দুই দেশের তরুণ প্রজন্মের পারস্পরিক সংহতি এবং ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি অনুধাবনের জন্যও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
নেহা জানান যে বিগত কয়েক দিনে তাঁর মূল ভিডিওটি এবং সেটির প্রায় ১০ হাজার ভিন্ন সংস্করণ অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তে দেখা গেছে। কিন্তু মূল ভিডিওর বিষয়বস্তু, তিনি কাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন এবং কার প্রতি সংহতি প্রকাশ করছিলেন—সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সুকৌশলে বাদ দেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত ওই খণ্ডিত ক্লিপের ওপরের কোণায় থাকা নির্দিষ্ট প্রতীকটি ইচ্ছাকৃতভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। অথচ ওই প্রতীকটিই এই সত্যের প্রমাণ দেয় যে ক্লিপটি মূলত বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাতীয় সম্মেলনের কর্মীদের প্রতি সংহতি জানাতেই তৈরি হয়েছিল।
নেহা পরিষ্কার ভাষায় বলেন যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্যই ওই সংগঠনটি যে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে, ভারত থেকে তাঁরা মূলত তারই অনুপ্রেরণা নেন। কিন্তু সংগঠনের লোগো, তাঁর নিজের নাম এবং সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সুনির্দিষ্ট পরিচয় মুছে দিয়ে ভিডিওটিকে রাজনৈতিক অপপ্রচারের হাতিয়ার বানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের ‘জেন–জি’ আন্দোলনের বহুমুখী ধারা নিয়েও নিজের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন তুলে ধরেছেন নেহা বোরা। তাঁর মতে, ওই গণঅভ্যুত্থানের এক প্রান্তে যেমন ধর্মীয় মৌলবাদী ও রক্ষণশীল শক্তি সক্রিয় ছিল, তেমনই অন্য প্রান্তে শক্তিশালী প্রগতিশীল ধারাও বজায় ছিল।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে প্রগতিশীল শক্তি মূলত স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য, শিক্ষার্থীদের ওপর চালানো নির্মম অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং সংখ্যালঘু হিন্দুসহ সব জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুরক্ষা দিতে লড়াই করেছে। তাঁদের অনুপ্রেরণার মূল উৎস ছিল এই প্রগতিশীল আন্দোলন।
বাংলাদেশ ও ভারতের ডানপন্থী গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে নেহার এই বক্তব্য লুফে নেয়। এই প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য ছিল যে তারা প্রকাশ্যে যতই একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াই করুক না কেন, পর্দার অন্তраলে তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর।
নেহার এই মন্তব্যের পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক তাৎপর্য। দুই দেশের ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো পরস্পরের বিরোধিতা করলেও একটি সুনির্দিষ্ট জায়গায় তাদের স্বার্থ হুবহু মিলে যায়, আর তা হলো রাজনীতির প্রগতিশীল ধারাটিকে সবসময় জনদৃষ্টির আড়ালে রাখা।
এক পক্ষ বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে এমন একটি রূপ দিতে চায় যাতে সেখানে বামপন্থী ও প্রগতিশীল শক্তির বিন্দুমাত্র অবদান নেই বলে মনে হয়। অন্য পক্ষ আবার সেটিকে কেবল একটি ইসলামপন্থী আন্দোলন হিসেবে তুলে ধরতে উদগ্রীব থাকে। কারণ এই বয়ান ব্যবহার করে ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারীদেরও সহজে কোণঠাসা করা যায়।
বাংলাদেশের মানুষের প্রতি সংহতি প্রকাশের বিষয়ে নেহা বলেন যে ভারতের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী এমন এক অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি করেছে যেখানে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি শুনলেই এদেশের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিচলিত বা বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে ওঠে। অথচ বাংলাদেশের প্রগতিশীল ও ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানানোর অর্থ হলো তাদের সব প্রগতিশীল লড়াইয়ের প্রতি সমর্থন জোগানো।
বাংলাদেশ ও ভারতের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতা পুরোপুরি একরকম না হলেও উভয় দেশেই ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিকভাবে বিভাজনের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আবেগ কাজে লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের সন্দেহের তালিকায় রাখা, ভিন্নমত পোষণকারীদের রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া এবং প্রতিবেশীর ঘটনা দিয়ে নিজের দেশের বিদ্বেষ জিইয়ে রাখা—এই কৌশলগুলোতে স্পষ্ট মিল রয়েছে।
একইভাবে তিনি স্পষ্ট করেন যে ভারতের ‘জেন–জি’ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানানোর অর্থ হলো যন্তর মন্তরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে চলা আন্দোলনকে সমর্থন করা। অথচ এর কিছুদিন পর একই স্থানে যে তথাকথিত ‘সংরক্ষণ তোলো’ আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং যেটিকে তিনি সাজানো নাটক বলে অভিহিত করেছেন, তার প্রতি কোনো সমর্থন নেই। তাঁর সাফ কথা হলো, যেকোনো আন্দোলনের প্রতি তাঁদের সংহতির একমাত্র ভিত্তি হলো প্রগতিশীল চিন্তা, গণতন্ত্র এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
এই সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাটি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য বলে মনে করেন তিনি। চব্বিশের ঐতিহাসিক গণ–অভ্যুত্থানে সমর্থন জোগানোর অর্থ এই নয় যে সেখানে অংশ নেওয়া প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিকে নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়া হচ্ছে।
একইভাবে এই অভ্যুত্থানকে সমর্থন করার অর্থ কখনোই এর পরবর্তীতে সংঘটিত হওয়া সংখ্যালঘু নির্যাতন, মব সহিংসতা, সাংস্কৃতিক আক্রমণ কিংবা মানুষের মতপ্রকাশে বাধার দেওয়ার মতো ঘটনাগুলোর প্রতি কোনো সমর্থন নয়। বরং যে গণতান্ত্রিক তাড়না সাধারণ মানুষকে রাজপথে টেনে এনেছিল, এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া সেই আকাঙ্ক্ষারই স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা।
নেহা তাঁর বিরুদ্ধে সমাজে নৈরাজ্য সৃষ্টির যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারও তীব্র জবাব দিয়েছেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে যেকোনো সুস্থ গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি হলো সর্বজনীন ভোটাধিকার। এসআইআর বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের সেই গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার চক্রান্ত চলছে বলে তাঁর অভিযোগ, আর তাঁর লড়াই মূলত সেই অন্যায্য ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।
যাঁদের ভোটাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে কাঠামোর বাইরে রাখা হচ্ছে, তাঁদের হাতে গণতন্ত্রের সুফল পৌঁছে দেওয়াই তাঁর মূল উদ্দেশ্য। গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখা এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব যাঁদের হাতে ন্যস্ত, আন্দোলনকারীরা মূলত তাঁদেরই জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনতে চান।
অর্থাৎ সরকারের কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত কিংবা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্তৃপক্ষকে সাধারণ মানুষ প্রশ্নবিদ্ধ করলেই সেটি কখনোই নৈরাজ্যের আহ্বান হয়ে দাঁড়ায় না। গণতান্ত্রিক কাঠামোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়ে সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন তোলার অধিকারও গণতন্ত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আন্দোলনে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগের সরাসরি জবাবে নেহা জানান যে তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে যন্তর মন্তরে টানা ২৩ দিন অনশন কর্মসূচি পালন করেছেন। উল্টো রাষ্ট্র, বিজেপি সরকার এবং পুলিশ তাঁদের ‘ভাইরাস’, ‘আরশোলা’ ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ বলে সম্বোধন করেছে এবং পেলেটগান ও লাঠিপেটার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। কিন্তু এত উসকানির পরও তাঁরা কখনো পাল্টা হাত তোলেননি।
সবশেষে নেহা বোরা তাঁর দেশের চিন্তাশীল ও পড়াশোনা জানা তরুণ সমাজকেই এই বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছেন যে গণতন্ত্রের পক্ষে রাজপথে লড়াই করা মানুষদের বিরুদ্ধে চালানো এসব অপপ্রচারের কোনো বাস্তব ভিত্তি আছে কি না। তাঁর দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা হলো, রাজপথের রাজনৈতিক লড়াই মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েই এখন তাঁদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো হচ্ছে। তবে তাঁরা এমন একটি সচেতন প্রজন্ম, যাঁরা তথাকথিত ‘গোদি মিডিয়া’ দেখে বড় হননি; বরং প্রতিটি বিষয় গভীরভাবে ভেবে, বুঝে ও বিচার–বিশ্লেষণ করতে শিখেছেন।