
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইরানের ভূখণ্ডে পুনরায় সামরিক অভিযান চালানোর জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মার্কিন এই শীর্ষ নেতা স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেছেন যে, তিনি অতীতে তেহরানের ওপর চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছিলেন এবং পরিস্থিতির প্রয়োজনে আগামী দিনে তার প্রশাসন আরও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে, তেহরান শুরু থেকেই হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়ে রেখেছে যে, তাদের ওপর নতুন করে কোনো আক্রমণ শুরু হলে তারা চুপচাপ বসে থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের মাটিতে মার্কিন মিত্রদের লক্ষ্য করে তীব্র প্রতিশোধমূলক হামলা চালানো হবে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত যৌথ সামরিক হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা ঘটেছিল। পরবর্তীতে সেই যুদ্ধের ভয়াবহতা দ্রুত পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলজুড়ে বিস্তার লাভ করে। বর্তমান সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সরাসরি পাল্টাপাল্টি লড়াইয়ের মাত্রা কিছুটা স্তিমিত থাকলেও, ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সশস্ত্র সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে নিয়মিত বিরতিতে হামলার ঘটনা ঘটছে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাবে সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের মূল্য যেভাবে অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, মূলত তার কারণেই ট্রাম্প সাময়িকভাবে ইরান সংকট থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। জ্বালানির এই চড়া দামের জেরে খোদ মার্কিন মুলুকেও মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিয়েছে, যার ফলে সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে নতুন কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বাড়তি ঝুঁকি নিতে চাচ্ছেন না বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
তবে প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস–এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, আগামী ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া মধ্যবর্তী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরপরই ওয়াশিংটন আবার নতুন করে সামরিক আগ্রাসন শুরু করতে পারে। সম্ভাব্য এই নতুন হামলায় শুধু মার্কিন বাহিনী একা নয়, বরং দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলকেও পাশে পাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। এই বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বিস্তারিত আলোচনা সম্পন্ন করেছেন বলে জানা গেছে।
গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় এক বক্তব্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, তেহরানকে যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে বিরত রাখতে হবে। তার এই পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের একটি অংশের কাছে অপছন্দের হতে পারে স্বীকার করে তিনি জানান যে, দেশের অনেক দেশপ্রেমিক নাগরিক ও মানুষ এটিকে সমর্থন করছেন। অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের আরও আগেই এই সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল বলে মন্তব্য করে তিনি আরও যোগ করেন যে, তারা ইতিমধ্যেই ইরানের ওপর নরক বানিয়ে ছেড়েছিলেন এবং প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আরও বেশি কঠোর হতে পারেন।
ওয়াশিংটন ও তেল আবিব যৌথভাবে নতুন কোনো সামরিক আগ্রাসন চালালে পারস্য উপসাগরীয় এলাকায় সর্বাত্মক পাল্টা আঘাত হানার কঠোর পসরা সাজিয়েছে তেহরান। সম্ভাব্য এমন শত্রুতামূলক উত্তরের অংশ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত সাতটি দেশের গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগার ও স্থাপনা, সমুদ্রের তলদেশে থাকা ডেটা ক্যাবল, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসেন রেজাই।
চলমান সংঘাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের উপদেষ্টা মেহেদি মোহাম্মাদি জানিয়েছেন যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা চালানোর বিষয়ে নীতিগতভাবে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন। তবে এবারের আক্রমণ পরিচালিত হলে ইরান এটিকে তাদের অস্তিত্ব রক্ষার চূড়ান্ত লড়াই হিসেবে গণ্য করবে। তেহরানের নতুন সামরিক রণকৌশলে কোনো ধরনের সীমারেখা বা রেডলাইন মানা হবে না, যার ফলে আসন্ন এই যুদ্ধ শত্রুপক্ষের যেকোনো হিসাব-নিকাশ বা ধারণার চেয়েও অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেবে।
উভয় পক্ষের এই তীব্র হুমকি-ধমকির আবহেই কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে এক রাতের ব্যবধানে মোট সাতটি বড় তেলবাহী জাহাজ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আগুনে পুড়েছে। গত বৃহস্পতিবার ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ওই সাতটি জলযানের মধ্যে তিনটি প্রণালির পানিতে পাতা নৌ-মাইনের বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকি চারটি জাহাজে সরাসরি আক্রমণ চালিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি।
তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ভাষায় জানানো হয়েছে যে, আক্রান্ত এই জাহাজগুলোর সঙ্গে মার্কিন স্বার্থ জড়িত ছিল এবং ওয়াশিংটনের প্রত্যক্ষ উৎসাহ ও প্ররোচনায় এগুলো হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে চলাচল করছিল। মাত্র একদিনের ব্যবধানে এতগুলো জলযানে হামলার এই ঘটনা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে উত্তেজনা বিপজ্জনকভাবে বৃদ্ধির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের ওপর মার্কিন আগ্রাসনের মোকাবিলায় আইআরজিসি তাদের নতুন নীতি ঘোষণা করেছে, যার সূত্র ধরে তেহরানের ওপর যেকোনো ধরনের সামুদ্রিক অবরোধ আরোপ করাকেও সরাসরি যুদ্ধের সমতুল্য হিসেবে গণ্য করা হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।