
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীদের অস্ত্রোপচারের টেবিলে যাওয়ার পূর্বে বহু দিন প্রতীক্ষায় থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, এখানে সব মিলিয়ে দশটি অপারেশন থিয়েটার বা ওটি বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি নির্ধারিত রয়েছে কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য এবং বাকি তিনটি বরাদ্দ করা হয়েছে ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের কার্যক্রমে। তবে কার্ডিয়াক সার্জারির সাতটির মধ্যে দুটি অপারেশন থিয়েটারের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় সেগুলো এই মুহূর্তে ব্যবহার অনুপযোগী। এর ফলে কার্যত পাঁচটি ওটি দিয়েই অস্ত্রোপচারের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এই সচল পাঁচটি ওটির একটি শিশুদের হৃদ্রোগ অস্ত্রোপচারের জন্য, তিনটি প্রাপ্তবয়স্কদের কার্ডিয়াক সার্জারির কাজে এবং একটি ইনফেকশন কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে।
এই অপারেশন থিয়েটারগুলোতে বিভিন্ন চিকিৎসাবিজ্ঞান ইউনিট পালা করে অস্ত্রোপচারের কাজ সম্পন্ন করে থাকে। কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে ১০টি, শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে ২টি এবং ভাসকুলার সার্জারি বিভাগে ৪টি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি স্বতন্ত্র ইউনিটের সার্বিক নেতৃত্বে অবস্থান করেন একজন অধ্যাপক কিংবা সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার চিকিৎসক।
সুদূর চাঁদপুর থেকে দুই বছরের কন্যাসন্তানকে নিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন একজন অভিভাবক। গত পাঁচই অক্টোবর শিশুটিকে এই হাসপাতালের একুশ নম্বর ওয়ার্ডের শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে ভর্তি করানো হয়েছে। শিশুটির ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন করার কথা রয়েছে। তবে চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, অস্ত্রোপচারের নির্দিষ্ট তারিখ পাওয়ার জন্য তাকে দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করতে হতে পারে। এর আগে আগস্ট মাসের শুরুর দিকে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করানোর জন্য আনা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় কোনো শয্যা খালি না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। অনেক দিন অপেক্ষার পর অবশেষে তাকে ভর্তি করানো গেছে।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার গোসাই গ্রামের সাত বছরের অপর একটি শিশু গত একত্রিশ আগস্ট একই ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছে। জন্মগত হৃদ্রোগে আক্রান্ত এই শিশুটির হৃৎপিণ্ডের ওপরের দুটি প্রধান প্রকোষ্ঠের মধ্যবর্তী দেওয়ালে ছিদ্র রয়েছে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে সাইনাস ভেনোসাস অ্যাট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট হিসেবে পরিচিত। এর পাশাপাশি ফুসফুস থেকে হৃদ্যন্ত্রে রক্ত ফিরিয়ে নেওয়ার রক্তনালির একটি অস্বাভাবিক সংযোগ রয়েছে, যাকে পার্শিয়াল অ্যানোম্যালাস পালমোনারি ভেনাস কানেকশন বলা হয়। এর ফলে ডান ফুসফুসের একটি রক্তনালি নির্দিষ্ট জায়গার পরিবর্তে অন্য স্থানে যুক্ত হয়েছে। অতিরিক্ত হিসেবে তার ফুসফুসের ধমনির রক্তচাপও সামান্য বেশি, যা মৃদু পালমোনারি হাইপারটেনশন নামে পরিচিত।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন যে শিশুটির দ্রুত অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু রোগীর প্রচণ্ড চাপের কারণে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারিত হয়নি। রোগীর আত্মীয়স্বজনের ধারণা অনুযায়ী, এর জন্য আরও প্রায় এক মাস অপেক্ষা করতে হতে পারে।
কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগে মোট চুয়াল্লিশটি শয্যা রয়েছে। এই বিভাগের জন্য নির্দিষ্ট একটি অপারেশন থিয়েটারে প্রতিদিন কেবল একটি করে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা হয়। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার বাদ দিয়ে এভাবে মাসে বিশ থেকে চব্বিশটি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়ার পর শিশুদের নিবিড় পরিচর্যার জন্য আলাদা আইসিইউতে দশটি শয্যা রয়েছে, যার মধ্যে মাত্র চারটিতে ভেন্টিলেটর সুবিধা বিদ্যমান।
শিশু কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, তাঁদের যে পরিমাণ সার্জন ও অন্যান্য জনবল রয়েছে, তা দিয়ে আরও একটি অপারেশন থিয়েটার সচল রেখে কার্যক্রম চালানো সম্ভব।
ছোট শিশুদের হৃদ্রোগজনিত অস্ত্রোপচারের একটি বিরাট অংশই মূলত জন্মগত ত্রুটি সংশোধনের উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে অ্যাট্রিয়াল সেপটাল ডিফেক্ট, ভেন্ট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্ট, টেট্রালজি অব ফ্যালট সংশোধন, আর্টেরিয়াল সুইচ এবং জটিল হৃদ্রোগের চিকিৎসায় গ্লেন ও ফন্টান অপারেশন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রোগের তীব্রতা ও কাঠিন্য অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে ক্যাথেটারভিত্তিক চিকিৎসাও প্রদান করা হয়ে থাকে।
চিকিৎসকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই চিকিৎসালয়ে পারফিউশনিস্ট, ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিন এবং অ্যানেসথেসিওলজি বিশেষজ্ঞের তীব্র সংকট রয়েছে। পারফিউশনিস্টের ছয়টি অনুমোদিত পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো পদেই কোনো ব্যক্তি কর্মরত নেই। হৃৎপিণ্ডের অস্ত্রোপচারের সময় হার্ট-লাং মেশিনের সাহায্যে মানবদেহে রক্ত ও অক্সিজেনের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করেন একজন পারফিউশনিস্ট। বর্তমানে হার্ট-লাং টেকনিশিয়ানদের দিয়েই এই কাজ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের দশটি ইউনিটের অধীনে মোট একশো পঞ্চাশটি শয্যা রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের অধীনে শয্যার সংখ্যা চৌদ্দ থেকে সতেরোটি পর্যন্ত হয়ে থাকে। ভর্তি হওয়া রোগীদের অস্ত্রোপচারের তারিখ পেতে বেশ দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রোগীর শারীরিক জটিলতা বেশি থাকলে এই অপেক্ষার সময় আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
প্রাপ্তবয়স্কদের কার্ডিয়াক সার্জারির জন্য তিনটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। এই ওটিগুলোতে দশটি ইউনিট পালা করে অস্ত্রোপচার করে থাকে। সপ্তাহের শুক্রবার বাদে মাসে প্রায় সত্তরটি অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। এছাড়া অন্য একটি ওটি ইনফেকশন কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের জন্য নির্ধারিত রয়েছে।
এই বিভাগের অধীনে থাকা আটত্রিশটি আইসিইউ শয্যার মধ্যে চব্বিশটি বর্তমানে সচল আছে এবং এগারোটিতে ভেন্টিলেটর যুক্ত রয়েছে। পুরোনো অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতিতে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে মাঝেমধ্যে বাধ্য হয়েই অস্ত্রোপচার কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়। এর ফলে কার্যকর ওটির সক্ষমতা হ্রাস পায় এবং অপেক্ষমাণ রোগীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।
ভাসকুলার সার্জারি বিভাগে তিনটি অপারেশন থিয়েটার রয়েছে। যার একটি জরুরি চিকিৎসার জন্য এবং অন্য দুটি নিয়মিত অস্ত্রোপচারের কাজে ব্যবহৃত হয়। এই বিভাগে ধমনি এবং শিরাসহ মানবদেহের বিভিন্ন রক্তনালির রোগের চিকিৎসা দেওয়া হয়। রক্তনালি সরু হয়ে যাওয়া বা পুরোপুরি বন্ধ হওয়া, রক্ত জমাট বাঁধা, পায়ে রক্ত চলাচলের মাত্রা কমে যাওয়া, অ্যানিউরিজম এবং রক্তনালির আঘাতের মতো জটিল সমস্যায় অস্ত্রোপচার অথবা এন্ডোভাসকুলার পদ্ধতিতে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত পাঁচজন চিকিৎসক জানিয়েছেন যে, অপারেশন থিয়েটারের সীমিত সক্ষমতার কারণে রোগীদের চাহিদা অনুযায়ী অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে না। এর ফলে জটিল রোগীদের চিকিৎসাসেবায় দীর্ঘসূত্রতার সৃষ্টি হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব রোগীর ক্ষেত্রে অতি দ্রুত অস্ত্রোপচার প্রয়োজন, তাঁদের চিকিৎসায় বিলম্ব হলে শারীরিক জটিলতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করার প্রবল আশঙ্কা থাকে।
চিকিৎসকদের মতে, অপেক্ষমাণ রোগীর অতিরিক্ত চাপ কমাতে হলে অচল অপারেশন থিয়েটারগুলো দ্রুত সচল করা দরকার। একই সঙ্গে পুরোনো ওটি আধুনিকায়ন এবং অস্ত্রোপচার সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইসিইউ, এইচডিইউ এবং প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির প্রাপ্যতাও নিশ্চিত করা আবশ্যক।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবদুল ওয়াদুদ চৌধুরী স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে ভর্তি থাকলে একদিকে যেমন চিকিৎসার খরচ বৃদ্ধি পায়, অন্যদিকে তেমনি বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণের ঝুঁকিও তৈরি হয়। একই সঙ্গে রোগীর সঙ্গে থাকা স্বজনদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ায় তাঁদের ওপরও অতিরিক্ত মানসিক চাপ পড়ে। তাহলে কেন অপারেশন থিয়েটারের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে, ওই সমস্ত ওটির মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। তাঁরা নতুন তিনটি অপারেশন থিয়েটার স্থাপনের জন্য একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি তৈরি করছেন। পাশাপাশি ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের সার্বিক উন্নয়নের জন্যেও আলাদা ডিপিপি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
হাসপাতালের জনবল সংকটের বিষয়ে পরিচালক উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি রয়েছে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে। একটি চিকিৎসালয় ২৪ ঘণ্টা সচল রাখতে হয় এবং তিনটি ভিন্ন শিফটে কাজ পরিচালনা করতে হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং নিরাপত্তাকর্মী না থাকলে হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়ে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা