
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
পাহাড়ের চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে গভীর হতাশা ও উদ্বেগের সুর শোনা গেছে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কণ্ঠে। এ প্রসঙ্গে স্বপন আক্ষেপের সুরে মন্তব্য করেন যে, বর্তমান এই সংকটময় অবস্থার দ্রুত অবসান না ঘটলে এখানকার সম্ভাবনাময় পর্যটনশিল্প সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে পতিত হবে।
গত বৃহস্পতিবার রাঙামাটির জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে এক সড়ক অবরোধের কবলে পড়ে প্রায় তিন হাজার ভ্রমণপিপাসী পর্যটক আটকা পড়েন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন এই পর্যটকদের উদ্ধার করে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেয়, তখন অবরোধকারীদের মধ্য থেকে একটি সশস্ত্র অংশ তাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং গুলি বর্ষণ করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং পর্যটকদের জীবন রক্ষা করতে পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও পাল্টা গুলি চালায়। অবশেষে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেই ওই তিন হাজার পর্যটককে সম্পূর্ণ নিরাপদে খাগড়াছড়ি জেলায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়।
স্থানীয় বিভিন্ন তথ্যসূত্রের বরাতে জানা গেছে, সাজেকের উজোবাজার এলাকায় ইউপিডিএফ-সমর্থিত কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন এবং গণঅধিকার রক্ষা কমিটির যৌথ ব্যানারে এই সড়ক অবরোধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
এই ধারাবাহিক অবরোধের নেপথ্য কারণ সম্পর্কে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, পাহাড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে গত এক মাস ধরে সাজেক ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে ইউপিডিএফ এবং জেএসএস (সন্তু লারমা দল)।
মূলত ইউপিডিএফ সমর্থित কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির যৌথ ব্যানারে বড় ধরনের সমাবেশ করে প্রতিপক্ষ জেএসএস (সন্তু)-কে অবিলম্বে সাজেক এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য একটি কঠোর আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছিল।
এই বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারের জের ধরেই কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে একের পর এক সাজেক এলাকায় অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার থেকে তারা তাদের পূর্বঘোষিত তৃতীয় দফার অবরোধ কর্মসূচি শুরু করেছিল।
সার্বিক বিষয়ে সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অতুলাল চাকমা গণমাধ্যমকে জানান যে, পাহাড়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফের তৈরি করা অস্থিরতার অংশ হিসেবেই গত ৮ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির ব্যানারে একটি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ওই একই সমাবেশ থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটির সভাপতি বাবুধন চাকমা প্রতিপক্ষ জেএসএস (সন্তু)-কে সাজেক এলাকা ত্যাগ করার জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ৪৮ ঘণ্টার একটি আল্টিমেটাম প্রদান করেছিলেন বলেও জানান ইউপিডিএফ চেয়ারম্যান। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে পাহাড়ি এই সংগঠন দুটির মধ্যে একাধিকবার সশস্ত্র গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাচা থোয়াই মারমা এই প্রসঙ্গে তাঁর সুনির্দিষ্ট মতামতে বলেন যে, একটি কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিতভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। গত বৃহস্পতিবার সংঘটিত অপ্রীতিকর ঘটনাটি মূলত সেই গভীর ষড়যন্ত্রেরই একটি সুনির্দিষ্ট অংশ বলে তিনি মনে করেন।
জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আরও উল্লেখ করেন যে, পাহাড়ে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে সরকারকে সর্বাবস্থায় অত্যন্ত সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
গত বৃহস্পতিবার সাজেকে সংঘটিত এই সহিংসতার নেপথ্য কারণ সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ বিভাগ জানায় যে, ইউপিডিএফের শীর্ষস্থানীয় নেতা বাবুধন চাকমা, আদী বাবু, মিলন চাকমা এবং বিজয় কান্তি চাকমার প্রত্যক্ষ পরিকল্পনা অনুযায়ী এই ঘটনা ঘটেছিল।
পুলিশের ভাষ্যমতে, নিরীহ পর্যটক এবং সাধারণ স্থানীয় লোকজনকে মানব ঢাল হিসেবে জিম্মি করে সাধারণ জনগণের নামকরণে সেখানে সহিংসতা চালানোই ছিল ওই নেতাদের মূল অসৎ উদ্দেশ্য। মূলত পাহাড়ে দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে পর্যদুস্ত ও কোণঠাসা হয়ে পড়ার কারণেই তারা এই এলাকায় এসে নতুন করে অবস্থান নিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে চলমান এই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন ও গণঅধিকার রক্ষা কমিটির অন্যতম নেতা নতুনজয় চাকমার সঙ্গে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া গেছে, যার কারণে এ বিষয়ে তাঁর কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, সাজেক এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আমেনা মারজান জানিয়েছেন যে, বর্তমানে এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক ও শান্ত রয়েছে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা