
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাঠের সবুজ ঘাসে জাদুকরী বল পায়ে সেই চিরপরিচিত ভুবনভোলানো হাসি নিয়ে আবারও মাঠে নামার অপেক্ষায় আছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা এক ফুটবলার। ২০১৮ সালে পেশাদার ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইতি টানার পর বিভিন্ন সময়ে প্রদর্শনী ম্যাচ ও বিশ্বের নানা প্রান্তে প্রীতি ম্যাচে অংশ নিলেও, এবার পুরোপুরি প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলেই দেখা যাবে তাকে। চমকপ্রদ এই খবরের মধ্য দিয়ে প্রায় ছলেষের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছেও প্রতিযোগিতামূলক খেলায় ফেরার ঘোষণা দিলেন এই ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি।
ইতালিয়ান ফুটবলের তৃতীয় স্তরের ক্লাব রাভেন্নার হয়ে আসন্ন মাসেই প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে মাঠে নামবেন এই তারকা মিডফিল্ডার। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ নভেম্বর স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষ ফোরলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মাঠে নামবেন তিনি। গতকাল সিরি সি লিগের এই দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে, যা মুহূর্তেই ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তুমুল আলোড়ন তৈরি করেছে।
গত জুনের দিকে সবাইকে সম্পূর্ণ অবাক করে দিয়ে রাভেন্না ক্লাবের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি, যদিও দীর্ঘ সময় ধরে দলটির জার্সিতে মাঠে নামা হয়নি। ২০০২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের এই সদস্য এর আগে স্প্যানিশ ক্লাব বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা ও মর্যাদাপূর্ণ চ্যাম্পিয়নস লিগ ট্রফি জয়ের পাশাপাশি ইতালির এসি মিলানের হয়ে সিরি আ শিরোপাও নিজের ঝুলিতে পুরেছিলেন। আক্রমণভাগের এই মিডফিল্ডার সর্বশেষ ২০১৫ সালে ফ্লুমিনেন্সের হয়ে পেশাদার প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেছিলেন এবং তার তিন বছর পর বুটজোড়া চিরতরে তুলে রাখার ঘোষণা দেন।
রাভেন্না ক্লাবের সঙ্গে খেলোয়াড় হিসেবে চুক্তি করার পাশাপাশি এর বন্ধু ইগনাজিও চিপ্রিয়ানির মালিকানাধীন এই ফুটবল দলটির কিছু অংশীদারিত্ব বা শেয়ারও কিনে নেন এই কিংবদন্তি খেলোয়াড়। বৈশ্বিক পর্যায়ে এই তারকার আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা ও ক্রেজকে কাজে লাগানোর জন্যই মূলত ক্লাব কর্তৃপক্ষ এমন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। অতীতে তাকে দলে ভেড়ানোর পর চিপ্রিয়ানি মন্তব্য করেছিলেন যে, এই দারুণ পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্যই হলো পুরো শহর এবং স্থানীয় সমর্থকদের দলটির আরও কাছাকাছি নিয়ে আসা।
গত আগস্ট মাসে যখন তিনি ইতালিতে পা রাখেন, তখন ক্লাবটির হয়ে তিনি ঠিক মাঠে নামবেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে নিজের বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারে ৩০০তম গোল করার একটি দারুণ সম্ভাবনাকে জীবন্ত রেখে রাভেন্না ক্লাবকে তিনি কেবল বলেছিলেন যে, তিনি মূলত দলটিকে সহায়তা করার জন্যই সেখানে এসেছেন।
গতকাল ক্লাবের পক্ষ থেকে প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে, এই আয়োজনটি পুরো পৃথিবীর ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়ে নেবে তাদের নিজেদের মাঠ স্তাদিও ব্রুনো বেনেলির দিকে। সারা দুনিয়ার ফুটবলভক্তরা প্রথমে ভেবেছিল এটি হয়তো কোনো গুজব বা কল্পনা, তবে এখন তারা অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে একটি দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের কথা ঘোষণা করতে পারছেন, যেখানে সেই জাদুকরী মুহূর্ত, সেই চেনা হাসি এবং এমন এক প্রতিভার পুনরুত্থান ঘটবে যা ক্লাবপ্রীতি ও দলীয় সীমানা ছাড়িয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের সমর্থকদের বিমোহিত করে চলেছে।
চিপ্রিয়ানি রেস্তোরাঁ ব্র্যান্ডের কর্ণধার ইগনাজিও চিপ্রিয়ানি বর্তমানে এই ক্লাবটি পরিচালনা করছেন, এবং তার কাছে এই তারকার এই দলের হয়ে ক্যারিয়ারের শেষ গোলটি সম্পন্ন করা একটি দারুণ স্বপ্নের মতো ব্যাপার। চলতি মৌসুমের লড়াই শুরু হওয়ার ঠিক আগে গত আগস্ট মাসে সমুদ্রসৈকতে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই তারকাকে ভক্ত-সমর্থকদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল রাভেন্না। সেই সময় ক্লাবটির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, মায়ামির ঘোষণা থেকে শুরু করে মারিনা দি রাভেন্নার সৈকতে ভক্তদের দেওয়া উষ্ণ অভ্যর্থনা পর্যন্ত মানুষের মনে উত্তেজনা ও কৌতূহল মিলে প্রত্যাশা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।
ইতালির মাটিতে এটি হতে যাচ্ছে এই বিশ্বতারকার ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বড় অধ্যায়। এর আগে ২০০৮ সাল থেকে ২০১১ সালের দীর্ঘ সময় ধরে তিনি মিলানের হয়ে মাঠ মাতিয়েছিলেন, যার আগে খেলেছিলেন বার্সেলোনার জার্সিতেও। বার্সেলোনা ক্লাবে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ফরাসি ক্লাব পিএসজির হয়ে খেলেছেন, এবং বার্সেলোনার হয়ে খেলার সেই স্বর্ণালী সময়েই বিশ্বসেরা হওয়ার পথে ২০০৫ সালে মর্যাদাপূর্ণ ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন।
অবিশ্বাস্য সব বলের কারিকুরি এবং চোখ জুড়িয়ে দেওয়া শৈল্পিক ফুটবলের জন্য ভক্ত-সমর্থকদের কাছে তার একটি অনন্য ও বিশেষ আবেদন সবসময়ই ছিল। সেই স্মৃতির কথা স্মরণ করে রাভেন্নার বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়েছে যে, কিছু খেলোয়াড়কে মানুষ স্মরণ করে তারা কী কী ট্রফি জয় করেছে তার জন্য, আর কিছু খেলোয়াড়কে মনে রাখে তারা মানুষকে কেমন দারুণ অনুভূতি উপহার দিয়েছেন তার জন্য। এই কিংবদন্তি এমন এক বিরল চ্যাম্পিয়ন, যিনি ফুটবলকে নিখাদ আনন্দে রূপান্তরিত করতে পারেন, হতে পারে সেটা কোনো অপ্রত্যাশিত মুভ কিংবা সম্পূর্ণ সৃষ্টিশীল কোনো মুহূর্তের মাধ্যমে, যার সেই হাসি স্টেডিয়াম থেকে স্টেডিয়ামে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এক সুন্দর সেতুবন্ধ তৈরি করে চলেছে।
ইতালিয়ান সিরি সি লিগে মোট ষাটটি ক্লাব অংশগ্রহণ করে থাকে, যেগুলোকে সমান বিশটি দল নিয়ে তিনটি আলাদা গ্রুপে ভাগ করা হয়। ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে বর্তমানে ‘বি’ গ্রুপে বা মধ্য ইতালির দলগুলোর সঙ্গে রয়েছে রাভেন্না। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১০টি ম্যাচে ২০ পয়েন্ট সংগ্রহ করে তারা ‘বি’ গ্রুপের পয়েন্ট তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে অবস্থান করছে। এই মুহূর্তে গ্রুপটির শীর্ষে থাকা স্পেৎজিয়া দলের চেয়ে তারা ৮ পয়েন্ট ব্যবধানে পিছিয়ে রয়েছে। আসন্ন ফোরলির বিপক্ষে কাঙ্ক্ষিত ডার্বি ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে রাভেন্নার ঘরের মাঠ ব্রুনো বেনেলিতেই।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।