
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মানুষের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে এমন কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, যেগুলো অর্জিত হলে যাবতীয় অপূর্ণতা দূর হয়ে যাবে বলে মনে করা হয়। স্বপ্নের চাকরি পাওয়া, কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি লাভ করা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করা কিংবা নিজের লেখা কোনো বই প্রকাশের সুযোগ পাওয়ার মতো বিষয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে মানুষের আত্মবিশ্বাস, আত্মতৃপ্তি এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু একটিমাত্র অর্জন কি আসলেই মানুষের সব ধরনের অতৃপ্তি চিরতরে মুছে দিতে পারে? নাকি স্বীকৃতি পাওয়ার পরও মানুষ অবিরাম নতুন কোনো লক্ষ্যের পেছনে ছুটে চলতেই থাকে?
সম্প্রতি একটি নতুন বই প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এক লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এই চিরন্তন প্রশ্নটিকে আবার নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁর নিয়োজিত সাহিত্যিক এজেন্ট ইতোমধ্যে বইটির প্রস্তাব বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন এবং এখন প্রকাশকেরা বইটি লুফে নেন কি না, সেটি দেখার জন্যই কেবল অপেক্ষা চলছে। তবে এই দীর্ঘ অপেক্ষা কেবল একটি বই প্রকাশের অনিশ্চয়তার গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে যুক্ত হয়েছে লেখকের নিজের দীর্ঘ পরিশ্রমের প্রকৃত সার্থকতা এবং একজন মানুষ হিসেবে নিজের ভেতরের মূল্য নিয়ে নানা ধরনের সংশয়।
লেখক মনে করছেন, বইটি প্রকাশের জন্য যদি শেষ পর্যন্ত কোনো চুক্তি সই হয়, তবে তাঁর দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠা অনেকটাই কমে যাবে। বইটির পেছনে ব্যয় করা দীর্ঘ সময়কে তখন সার্থক বলে মনে হবে এবং অন্য কোনো কাজে সেই সময় ব্যয় করা উচিত ছিল কি না, সেই আফসোসের প্রশ্নটি আর তাঁকে তাড়া করবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, নিজের যেকোনো একটি অর্জন নিয়ে তখন পুরোপুরি সন্তুষ্ট হওয়া সম্ভব হবে।
এমন মানসিক অনুভূতি বা প্রত্যাশা অনেকের বাস্তব জীবনেই নানাভাবে প্রকাশ পায়। কেউ বিশ্বাস করেন যে কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি পেলে তাঁর পুরো জীবন সুশৃঙ্খলভাবে গুছিয়ে যাবে, আবার কেউ ভাবেন যে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ উপার্জন করতে পারলেই জীবনে কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা ও মানসিক তৃপ্তি চলে আসবে। অন্যদিকে, কেউ কেউ সামাজিক স্বীকৃতি কিংবা অন্য দশজনের প্রশংসার মাধ্যমে নিজের যোগ্যতা ও প্রতিভার সঠিক প্রমাণ খুঁজে বেড়ান। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, এসব লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পরও মানুষের প্রত্যাশার শেষ হয় না; বরং একটি লক্ষ্য পেরিয়ে আরেকটি নতুন লক্ষ্য এসে সামনে দাঁড়ায়।
মানুষের এই আকাঙ্ক্ষার পেছনে অবিরাম ছুটে চলার প্রবণতা কেন কখনো শেষ হয় না, তা নিয়ে ‘ফিফটি ওয়ার্ডস ফর স্নো’ নামের একটি পডকাস্টে ফরাসি মনোবিশ্লেষক জাক লাকাঁর একটি তাত্ত্বিক ধারণা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তাঁর এই ধারণার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অবজে পতি আ’। সহজ ও সাবলীল ভাষায় বলতে গেলে, এই নির্দিষ্ট ধারণাটি এমন এক ধরনের আকাঙ্ক্ষার উৎসকে নির্দেশ করে, যা মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা অর্জনের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটতে প্ররোচিত করে তোলে। মানুষ অবচেতনভাবেই মনে করে যে কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি হাতে পেলেই তার জীবনে সুখ, পরিপূর্ণতা এবং চূড়ান্ত মানসিক শান্তি ধরা দেবে, অথচ বাস্তবে সেই বস্তুর পক্ষে মানুষের সমস্ত প্রত্যাশা পূরণ করা কস্মিনকালেও সম্ভব নয়।
উক্ত লেখকের কাছেও বর্তমানের এই বই প্রকাশের চুক্তিটি ঠিক তেমনই একটি আকাঙ্ক্ষার বস্তু হয়ে উঠেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো তাঁকে বইটি প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু লেখকের নিজের কাছে প্রত্যাশার পরিধি আরও অনেক বেশি বিস্তৃত—তিনি চান জীবনের দীর্ঘদিনের সব অপূর্ণতা থেকে মুক্তি পেতে, নিজের যোগ্যতা নিয়ে মনে জমে থাকা সন্দেহের চিরতরে অবসান ঘটাতে এবং নিজের দীর্ঘ প্রচেষ্টার একটি চূড়ান্ত স্বীকৃতি লাভ করতে।
আর ঠিক এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল সমস্যা। জীবনের সামগ্রিক সুখ, শান্তি ও নিজের আত্মমর্যাদাকে যখন কেবল একটি নির্দিষ্ট অর্জনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়, তখন সেই বিশেষ অর্জনের ওপর মানুষের অতিরিক্ত প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফলটি না পাওয়া গেলে যেমন মনে তীব্র হতাশা বাড়ে, তেমনি কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়ে গেলেও সেই সন্তুষ্টির রেশ খুব বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
অন্যের সাফল্য ও অগ্রগতি কি আদстви নিজের পিছিয়ে পড়ার কোনো অকাট্য প্রমাণ? পডকাস্টটির অন্য আরেকটি পর্বে জ্যোতিষী কেট রুট ‘রেট্রোগ্রেড’ নামক একটি আকর্ষণীয় শব্দ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। সাধারণত জ্যোতিষশাস্ত্রে বহুল ব্যবহৃত এই শব্দের সঙ্গে মহাকাশের কোনো গ্রহের আপাত বিপরীতমুখী গতির ধারণা গভীরভাবে যুক্ত রয়েছে। পৃথিবী এবং সৌরজগতের অন্য গ্রহগুলোর নিজস্ব অবস্থানের পার্থক্যের কারণে কখনো কখনো কোনো নির্দিষ্ট গ্রহকে পৃথিবী থেকে দেখলে মনে হয় সেটি যেন পেছনের দিকে হেঁটে চলেছে। অথচ বাস্তব সত্য হলো গ্রহটি তার নিয়মিত নির্দিষ্ট কক্ষপথেই স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে, আর গতির এই বিপরীতমুখী দৃশ্যটি কেবল পর্যবেক্ষকের নিজস্ব অবস্থানের কারণেই তৈরি হয়।
কেট রুটের এই আলোচনায় বিষয়টি কেবল জ্যোতিষশাস্ত্রের গণ্ডিতে আটকে থাকেনি, বরং মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো গভীরভাবে ফিরে দেখা এবং আত্মপর্যালোচনার একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবেও অত্যন্ত সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। মানুষের জীবনে অতীতে ঠিক কী কী ঘটনা ঘটেছে, সেই সমস্ত ঘটনা থেকে ঠিক কী শিক্ষালাভ করা গেছে এবং কোন বিশেষ অভিজ্ঞতাগুলোকে বোঝার জন্য জীবনে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হয়নি—এই সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রতিটি মানুষের জন্যই একান্ত প্রয়োজন।
অন্য মানুষের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবনকে প্রতিনিয়ত তুলনা করার পুরনো প্রবণতাটি এই পুরো প্রসঙ্গের অত্যন্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বয়সে ছোট বা জুনিয়র কেউ যখন এমন কিছু সহজে অর্জন করে ফেলেন, যা অন্য একজন মানুষ বহু বছর ধরে অর্জন করার স্বপ্ন দেখে আসছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই নিজের বর্তমান অগ্রগতি নিয়েও বড় ধরনের সন্দেহ তৈরি হতে পারে। অন্যের এই তরতর করে এগিয়ে যাওয়াকে তখন নিজের ব্যর্থতা বা পিছিয়ে পড়ার অকাট্য প্রমাণ বলে মনে হতে শুরু করে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের পরিস্থিতি, সুযোগ-সুবিধার পরিধি, অভিজ্ঞতা এবং সামগ্রিক অগ্রগতির ধরন সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বতন্ত্র। কাজেই অন্য কোনো মানুষের বড় অর্জন দিয়ে নিজের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা বিচার করা বা মাপা কোনোভাবেই যথাযথ বা সঠিক কাজ হতে পারে না।
ভবিষ্যতের কোনো কাঙ্ক্ষিত স্বীকৃতির অন্ধ অপেক্ষায় বর্তমানের বাস্তব জীবনকে কোনোভাবেই অবহেলা করা উচিত নয়। পডকাস্টে কেট রুট এই প্রসঙ্গে একটি অত্যন্ত অর্থবহ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন: মানুষের এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষের জন্ম নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য কি কেবল নানা কিছু অর্জন করা? তিনি ভবিষ্যতে বই লিখে অচেনা কোনো অজানা পাঠকের প্রভূত উপকার করার তীব্র আকাঙ্ক্ষার কথাও সবিস্তারে উল্লেখ করেন।
তবে সেই অচেনা মানুষকে উপকার করার সুযোগ কেন কেবল ভবিষ্যতের কোনো নির্দিষ্ট অর্জনের ওপর নির্ভর করবে, সেই যৌক্তিক প্রশ্নটিও তিনি সবার সামনে নিয়ে আসেন। মানুষ তো চাইলেই বর্তমানেই তার চারপাশের কাছের মানুষগুলোর পাশে একান্তভাবে দাঁড়াতে পারে, তাদের মনের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে পারে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনে একটি অত্যন্ত অর্থপূর্ণ ও ইতিবাচক ভূমিকা পালন করার সুযোগ নিতে পারে।
কেট রুট অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে তাঁর নিজের মায়ের মৃত্যুর বেদনাবিধুর সময়ে তিনি এই সত্যটি সবচেয়ে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। প্রিয় মানুষের সঙ্গে জীবনের শেষ সময়গুলো কাটানোর মহামূল্যবান মুহূর্তেও কখনো কখনো তাঁর অবচেতন মন চলে যেত সেই বিশেষ অভিজ্ঞতাটিকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে চমৎকার কোনো লেখা তৈরি করা যায়, সেই চিন্তায়। ঠিক তখনই তাঁর মনে তীব্র এক প্রশ্ন জেগে ওঠে যে ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ে হয়তো বই পড়তে পারেন, এমন একজন অচেনা বেনামী পাঠকের কথা ভেবে কেন তিনি তার ঠিক পাশের মানুষটির সঙ্গে কাটানো বর্তমানের এই অমূল্য মুহূর্তটিকে কম গুরুত্ব দেবেন?
তাঁর সেই গভীর উপলব্ধির সারকথা হলো, ভবিষ্যতের অচেনা পাঠকের সঙ্গে মনের যোগাযোগ তৈরি করার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যেমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, ঠিক তেমনি বর্তমানের প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গে আন্তরিকভাবে যুক্ত থাকাও সমানভাবে জরুরি। বরং বর্তমানের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের প্রতি গভীরভাবে মনোযোগী হলেই কেবল ভবিষ্যতে লেখার মধ্য দিয়ে অন্য পাঠকদের দেওয়ার মতো ভেতরের অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আরও অনেক বেশি সমৃদ্ধ হয়ে উঠতে পারে।
এই উপলব্ধি কেবল গুটিকয়েক পেশাদার লেখকের জন্যই নয়, বরং সমাজের প্রতিটি মানুষের জন্যই সমভাবে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও জরুরি। পড়াশোনা, ভালো চাকরি, আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের নিরন্তর চেষ্টায় মশগুল হয়ে অনেকেই তাদের বর্তমানের সুন্দর সম্পর্কগুলো এবং জীবনের ছোটখাটো আনন্দগুলোকে স্বেচ্ছায় পেছনে ফেলে রাখেন। তাঁরা মনে করেন যে জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্যগুলো একবার পূরণ হলেই কেবল নিজের জন্য কিছুটা অবসর সময় বের করা যাবে। কিন্তু মানুষের জীবনের একটি লক্ষ্য পূরণের পর যখন আরেকটি নতুন লক্ষ্য এসে সামনে হাজির হয়, তখন বর্তমানের সুন্দর সময়গুলোকে উপভোগ করার সুযোগ ধীরে ধীরে আরও সীমিত হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করা মানুষের জীবনের জন্য নিঃসন্দেহে খুবই জরুরি, তবে সেই নির্দিষ্ট পরিকল্পনার বলি বানিয়ে বর্তমানের জীবন্ত জীবনকে পুরোপুরি উপেক্ষা বা বর্জন করার কোনোই প্রয়োজন নেই।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।