
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির ঠিক কেন্দ্রভাগে অবস্থিত অতিবৃহৎ বা সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশ ঘিরে প্রচুর পরিমাণে ধাতুর এক প্রকাণ্ড ভান্ডার আবিষ্কার করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। মহাশূন্যে অবস্থিত আধুনিক জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মাধ্যমেই মূলত এই গ্যাসীয় উপাদানগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গবেষকদের ভাষ্যমতে, এই উপাদানগুলো মূলত প্রাচীন সুপারনোভা তথা তারার ভয়াবহ বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্টি হয়েছে। পরবর্তীতে এই বিস্ফোরণ থেকেই মিল্কওয়ে গ্যালাক্সির মূল কেন্দ্রের ব্ল্যাকহোলটির চারপাশে ভারী সব ধাতু ছড়িয়ে পড়েছিল। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গবেষণা পত্রিকা 'দ্য অ্যাস্ট্রোনোমিক্যাল জার্নাল'-এ এই বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের গবেষণালব্ধ তথ্য অনুযায়ী, মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম মৌল দুটির চেয়ে ভারী যেকোনো উপাদানের সাধারণ শ্রেণি হলো ধাতু। এর মধ্যে অক্সিজেন, কার্বন, লোহা কিংবা সোনার মতো মূল্যবান উপাদানগুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাধারণত যেকোনো নক্ষত্রের জীবনচক্রের একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে এর কেন্দ্রস্থলের ভেতরে নিউক্লিয়ার ফিউশন বিক্রিয়া সংঘটিত হয়। আর এই বিশেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ ধরনের ভারী উপাদানগুলোর উৎপত্তি ঘটে এবং পরবর্তীতে তা মহাকাশের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে নতুন নতুন নক্ষত্র গঠনের অন্যতম অংশ হয়ে ওঠে।
গ্যাসীয় অবস্থায় শনাক্ত হওয়া এই ধাতব পদার্থগুলোর সামগ্রিক গঠন কাঠামো এর ঠিক পাশেই অবস্থিত কয়েকটি নক্ষত্রের মূল রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এই প্রসঙ্গে কানাডার স্বনামধন্য ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, যা মন্ট্রিল শহরে অবস্থিত, সেখানকার গবেষক বিজ্ঞানী নিকোল ফোর্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, আমরা সবাই জানি যে আমাদের গ্যালাক্সির একেবারে কেন্দ্রস্থলে একটি ব্ল্যাকহোল অবস্থান করছে এবং এটি নিজের চারপাশের সমস্ত উপাদানকে অত্যন্ত প্রবল শক্তিতে নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। তবে আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করছি যে এটি অন্যান্য সাধারণ সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের তুলনায় অনেক কম গতিতে বা ধীরে ধীরে চারপাশের উপাদানগুলো গ্রহণ করছে। ঠিক কী কারণে এমন অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটছে, তা পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য ব্ল্যাকহোলের মূল খাদ্য হিসেবে পরিচিত গ্যাস, ধূলিকণা এবং এটিকে প্রদক্ষিণরত নক্ষত্রগুলোর সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলো জানা অত্যন্ত জরুরি।
ওই ব্ল্যাকহোলের একেবারে কাছাকাছি অঞ্চলের গ্যাস নিঃসরণের পুরো বিষয়টি স্থানীয় মেঘের সার্বিক পরিস্থিতির দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়ে থাকে। এই কারণে শুধুমাত্র গ্যাসের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করেই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয় যে ব্ল্যাকহোলটি আসলে ঠিক কতটা সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে ব্ল্যাকহোলের ঠিক চারপাশে প্রচুর পরিমাণে ধাতুর উপস্থিতি মূলত গ্যাস ঠান্ডা হওয়ার সামগ্রিক গতিপ্রকৃতিকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে থাকে। আর এই গ্যাসের শীতল হওয়ার গতিই মূলত নির্ধারণ করে দেয় যে গ্যাসটি ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় ব্ল্যাকহোলের ভেতরের দিকে টেনে নেওয়া হবে।
অত্যন্ত শক্তিশালী জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের এই অভিনব পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিজ্ঞানীদের জন্য দারুণ এক সুযোগ তৈরি করেছে। এর সাহায্যে গবেষকরা যেকোনো দূরবর্তী গ্যালাক্সির সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশের ধাতুর সঠিক বণ্টন প্রক্রিয়া এবং একই সঙ্গে আমাদের এই পৃথিবীতে ভারী মৌলগুলো পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজে বুঝতে পারবেন বলে দৃঢ় ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।