
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
উত্তরপশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষা জনপদ চাঁপাইনবাবগঞ্জে কৃষি, আম চাষ এবং সীমান্ত বাণিজ্যের বিপুল অপার সম্ভাবনা ও শক্ত ভিত বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় শিল্পায়ন হচ্ছে না। এই অঞ্চলের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে একটি সংবাদমাধ্যমের কাছে বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আবদুল ওয়াহেদ।
স্থানীয় অর্থনীতি সচল রাখার ক্ষেত্রে কৃষি খাত, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রবাসীদের পাঠানো আয় এবং সীমান্ত বাণিজ্যের অত্যন্ত জোরালো ভূমিকা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এই অঞ্চলে স্থলবন্দর ও রেলবন্দর সচল থাকার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে সুস্বাদু মৌসুমি ফল আমের জন্য বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। প্রতিবছর এই জেলা থেকে আনুমানিক সাড়ে তিন থেকে চার হাজার কোটি টাকার আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয় এবং ধান ও চালসহ সামগ্রিক কৃষি উৎপাদনে অঞ্চলটি উদ্বৃত্ত অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনৈতিক এই ভিত্তির পাশাপাশি জেলার প্রায় ৯০ হাজার মানুষ জীবিকার তাগিদে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স স্থানীয় অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এতসব ইতিবাচক উপাদান থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র গ্যাস সরবরাহের অভাব এবং ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে এই জনপদে প্রত্যাশিত গতিতে শিল্পায়ন গড়ে উঠছে না।
কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে গুটিকয়েক বড় প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনা করলেও যেভাবে ব্যাপকভিত্তিক শিল্পায়ন হওয়া বাঞ্ছনীয় ছিল, তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের পাশাপাশি পেয়ারা, ড্রাগন ও কলার মতো ফল বিপুল পরিমাণে উৎপাদিত হয়ে থাকে এবং সঠিক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে এই সমস্ত ফল প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব।
বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক সুবিধাজনক অবস্থান তথা সীমান্ত ও রেল যোগাযোগের বড় সুযোগকে কাজে লাগাতে পারলে কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পের পাশাপাশি সীমান্ত বাণিজ্যের পরিধি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। তবে সাধারণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের অতিরিক্ত উচ্চ সুদের হার এক বড় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এই অতিরিক্ত চাপের মুখেই বহু ছোট ব্যবসায়ী শেষ পর্যন্ত ঋণখেলাপি হয়ে পড়ছেন, যা থেকে পরিত্রাণের জন্য সুদের হার একক অঙ্কে নামিয়ে আনা জরুরি।
বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাগুলোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আমনুরা এলাকাকে অত্যন্ত সম্ভাবনাময় বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে আমনুরায় একটি বিশেষায়িত কৃষিভিত্তিক রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা বা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি জানিয়ে আসা হচ্ছে।
আমনুরা অঞ্চলে সুপরিসর রেলওয়ে জংশন থাকায় কৃষিপণ্যভিত্তিক শিল্প স্থাপন করার জন্য দারুণ পরিবেশ ও অনুকূল সুযোগ রয়েছে। এই রেলপথ ব্যবহার করেই অত্যন্ত সাশ্রয়ী মূল্যে প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটান থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি করা এবং উৎপাদিত পণ্য একই পথে ঐসব দেশে রপ্তানি করা সম্পূর্ণ সম্ভব।
রেল যোগাযোগের এই অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে খুব সহজেই মোংলা সমুদ্রবন্দরের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। আমনুরায় যদি প্রস্তাবিত এই কৃষিভিত্তিক ইপিজেডটি সফলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে এই অঞ্চলের প্রায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার শিক্ষিত ও কর্মক্ষম বেকার যুবকের নিশ্চিত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
অপরদিকে রহনপুর রেলবন্দরকে একটি পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর রেলবন্দরে রূপান্তরিত করা হলে ভারত, নেপাল এবং ভুটানের সঙ্গে সামগ্রিক আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া সোনামসজিদ স্থলবন্দরের বর্তমান কার্যক্রমের সক্ষমতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ের বিবেচনায় প্রায় ৩২০ কোটি টাকার একটি সাসেক প্রকল্প বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
উক্ত প্রকল্পটির কাজ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে সোনামসজিদ বন্দরের পণ্য আমদানির সামগ্রিক সক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সোনামসজিদ স্থলবন্দর থেকে শুরু করে সরাসরি সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল পর্যন্ত একটি আধুনিক চার লেনের মহাসড়ক নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি, যা বাস্তবায়িত হলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজ ও দ্রুততর হবে।
এই এলাকার তরুণ সমাজের মধ্যে নতুন নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য শুরু করার পাশাপাশি ছোটখাটো বিভিন্ন কৃষিভিত্তিক উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার ব্যাপক আগ্রহ ও প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। এমনকি বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের উদ্যোগে নানা ধরনের অটোমোবাইল ওয়ার্কশপও গড়ে তুলছেন, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে।
বর্তমানে এই পুরো জেলায় আনুমানিক এক হাজার নারী উদ্যোক্তা বিভিন্ন উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন নারী উদ্যোক্তা অত্যন্ত সফলভাবে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সামগ্রিক অর্থনীতিতে কাঙ্ক্ষিত গতি সঞ্চারিত করার জন্য সোনামসজিদ স্থলবন্দরের আধুনিকায়ন, রহনপুর রেলবন্দরের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাশাপাশি আমনুরায় কৃষিভিত্তিক ইপিজেড স্থাপন এবং সোনামসজিদ থেকে হাটিকুমরুল পর্যন্ত চার লেন সড়ক নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোসহ স্থানীয় সকল সম্ভাবনাকে অত্যন্ত পরিকল্পিত পন্থায় কাজে লাগাতে হবে। পরিশেষে উল্লেখ করা হয় যে, এই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলে ব্যাপকভিত্তিক নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।