
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গণিতশাস্ত্রে একটি সংখ্যাকে একাধিক সংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা অত্যন্ত সাধারণ একটি বিষয়। যেমন কোনো জটিলতা ছাড়াই ১০ সংখ্যাটিকে ২, ৩ ও ৫-এর যোগফল হিসেবে দেখানো সম্ভব। এমনকি ঋণাত্মক সংখ্যা যুক্ত করেও এ ধরনের ফলাফল তৈরি করা যায়। তবে প্রশ্নটি সম্পূর্ণ আলাদা মোড় নেয় যখন নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা অর্জনের জন্য কেবল সাধারণ সংখ্যা নিলে চলে না। প্রতিটি সংখ্যাকে প্রথমে নিজের সঙ্গে তিনবার গুণ করে তবেই সেই তিনটি গুণফলের সমষ্টি বের করতে হয়। বহুল আলোচিত এই গাণিতিক সমস্যাটি মূলত 'সাম অব থ্রি কিউবস' বা তিনটি ঘনসংখ্যার যোগফল নামে পরিচিত। এই বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রে সংখ্যাগুলোর কিউব বা ঘন করে নির্দিষ্ট কোনো মান যেমন ১১৪ পাওয়ার কথা বলা হয়। আপাতদৃষ্টিতে এই প্রশ্নটি ভীষণ সহজ মনে হলেও দীর্ঘকাল ধরে গণিতবিদদের দারুণভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এ পর্যন্ত কোনো গবেষক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এই সমস্যার সুনির্দিষ্ট সমাধান খুঁজে বের করতে পারেনি। এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করতে হলে সবার আগে ঘনসংখ্যার জগত সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা জরুরি। কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যাকে সেই একই সংখ্যা দিয়ে পরপর তিনবার গুণ করলে যে ফল অর্জিত হয়, তাকেই ওই সংখ্যার ঘনসংখ্যা বলা হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ৩-এর ঘনসংখ্যা হলো ৩ গুণ ৩ গুণ ৩ অর্থাৎ ২৭। একইভাবে ৫ সংখ্যার ঘন হলো ৫ গুণ ৫ গুণ ৫ অর্থাৎ ১২৫। একটু গভীরভাবে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, মূল সংখ্যাটি যত বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকে, তার ঘনসংখ্যার মানও তত দ্রুত বাড়তে থাকে। যেহেতু আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ১১৪ সংখ্যাটি অর্জন করা, তাই আপাতত ৫-এর চেয়ে বড় কোনো সংখ্যার ঘনমান জানার প্রয়োজন নেই। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে ৫-এর চেয়ে ছোট তিনটি ঘনসংখ্যা যোগ করলেই কি কাঙ্ক্ষিত ১১৪ পাওয়া সম্ভব? ১-এর ঘন, ২-এর ঘন এবং ৩-এর ঘন যোগ করলে ফলাফল পাওয়া যায় ৩৬। এই মানটি আমাদের নির্ধারিত পছন্দের সংখ্যা থেকে অনেকটাই কম। ফলে সংখ্যাগুলোর মান সামান্য বাড়িয়ে ১, ২ ও ৩-এর পরিবর্তে ২, ৩ ও ৪ নিয়ে পরীক্ষা করা যেতে পারে। ২, ৩ ও ৪-এর ঘনসংখ্যার যোগফল হিসাব করলে মোট মান দাঁড়ায় ৯৯। এই ৯৯ সংখ্যাটি ১১৪-এর বেশ কাছাকাছি হলেও আমাদের লক্ষ্য পৌঁছাতে আরও ১৫ বেশি প্রয়োজন। এখানেই সাধারণ ধনাত্মক সংখ্যা নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রথম বড় সমস্যাটির মুখোমুখি হতে হয়। কেননা সাধারণ ধনাত্মক সংখ্যা দিয়ে চেষ্টা করতে করতে আমরা কেবল ৯৯ পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছি। এরপর সংখ্যাগুলো আরও একটু বড় করলে তা ১১৪-এর চেয়ে অনেক বেশি হয়ে যাবে। কারণ হিসেবে বলা যায়, কেবল ৫-এর ঘনসংখ্যার মানই হলো ১২৫। এর মানে দাঁড়ায় যে কেবল ধনাত্মক সংখ্যার ঘন যোগ করে কখনো ১১৪ পাওয়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে ঋণাত্মক সংখ্যার সাহায্য নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথ খোলা থাকে না। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে ঋণাত্মক সংখ্যা ব্যবহার করেও খুব সহজে যোগফল তৈরি করা সম্ভব। তিনটি সংখ্যা সবসময় ধনাত্মক হতেই হবে, এমন কোনো কঠোর শর্ত এই গাণিতিক সমস্যায় নেই। তাছাড়া যেকোনো ঋণাত্মক সংখ্যার ঘনসংখ্যা সব সময়ই ঋণাত্মক হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করে। আমরা চাইলে যেকোনো সময় তিনটি সংখ্যার ঘনসংখ্যা বের করার প্রক্রিয়ায় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক সংখ্যা একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারি। যেমন ৪-এর কিউব, ৪-এর কিউব এবং ঋণাত্মক ৫-এর কিউব যোগ করলে ফলাফল পাওয়া যায় মাত্র ৩। এখন যদি এমন তিনটি সংখ্যা খুঁজে বের করতে হয় যাদের প্রত্যেকের ঘনসংখ্যা যোগ করলে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যাবে, তবে তা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ধরা যাক, কাঙ্ক্ষিত যোগফলটি হতে হবে ২৯, সেক্ষেত্রে খুব সহজেই একটি সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এখানে ৩-এর ঘন হলো ২৭ এবং ১-এর কিউব হলো ১, ফলে ২৭, ১ ও ১ যোগ করলে ২৯ পাওয়া যায়। এবার যদি সংখ্যাটিকে একটু বড় করা হয়, তবে কি ৩৩ সংখ্যাটিকে তিনটি ঘনসংখ্যার যোগফল হিসেবে লেখা সম্ভব? সবার আগে দেখতে হবে কোন তিনটি সংখ্যা যোগ করলে নিখুঁতভাবে ৩৩ পাওয়া যায়। সাধারণভাবে তিনটি সংখ্যা যোগ করে ৩৩ বানানোর অসংখ্য গাণিতিক উপায় বা বিকল্প রয়েছে। যেমন ১০, ১০ ও ১৩ যোগ করলে মোট যোগফল ৩৩ হয়। কিন্তু এখানে মূল সমস্যা হলো, এমন কোনো সংখ্যা নেই যাকে ঘন করলে ১০ বা ১৩ পাওয়া যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ২-এর ঘন হলো ৮ এবং ৩-এর ঘন হলো ২৭। ফলে এই ছোট সংখ্যাগুলোর ঘনসংখ্যা যোগ করে ৩৩ পাওয়া একেবারেই সহজ নয়। এদিকে যোগফলটিকেও নিখুঁতভাবে ৩৩ হতে হবে, সামান্য এদিক-বা দিক হলেও তা গ্রহণযোগ্য হবে না। আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ১০০-এর ঘনসংখ্যা হলো ১০ লাখ। সংখ্যাটি মাত্র ১০০ হলেও তার ঘনমান অত্যন্ত বিশাল আকার ধারণ করে। আবার ১ হাজার বা ১ হাজারের ঘন হলো এক শ কোটি। তাই ঘনসংখ্যার মান যত বড় হতে থাকে, ফলাফলের সংখ্যাও ঠিক তত দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। এছাড়া বড় ধনাত্মক ও ঋণাত্মক ঘনসংখ্যা যখন একসঙ্গে যোগ করা হয়, তখন তা যোগ-বিয়োগের মাধ্যমে পরস্পর কাটাকাটি করতে পারে। ফলে অনেক সময় একদম ছোট একটি উত্তর পাওয়ার জন্যও মাঝেমধ্যে অত্যন্ত বিশাল তিনটি সংখ্যার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ঠিক এই কারণেই এই বিশেষ সমস্যাটি নিয়ে কাজ করার সময় গণিতবিদদের কেবল ছোট সংখ্যা পরীক্ষা করলেই চলে না। তাদের অনেক বড় বড় সংখ্যার পরিসরের মধ্যেও এর সঠিক সমাধান খুঁজে বেড়াতে হয়। তর্কের খাতিরে যদি আমরা আপাতভাবে ধরে নিই যে কোনো গবেষক একটি সঠিক সমাধান খুঁজে পেয়েছেন। ধরা যাক একদম নিখুঁত হিসাব-নিকাশের মাধ্যমেই সমীকরণটি সফলভাবে মিলে গেল। তাহলে সমস্যাটির একটি ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেল এবং এটি প্রমাণিত হলো যে এর সমাধান বিদ্যমান। কিন্তু যদি হাজার কোটি সম্ভাবনা নিখūতভাবে পরীক্ষা করার পরও কোনো সমাধান না পাওয়া যায়, তবে কি জোর দিয়ে বলা যাবে যে এর কোনো সমাধান নেই? এর উত্তর হলো না, কারণ পরীক্ষা করা সংখ্যাগুলোর পরিধির বাইরেও আরও অসংখ্য সম্ভাবনা বা বিকল্প লুকিয়ে থাকে। এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই মূলত এই গাণিতিক সমস্যাটিকে সবার কাছে এতটা আকর্ষণীয় ও রোমাঞ্চকর করে তুলেছে। তবে আমাদের এখানেই থেমে থাকলে চলবে না, বরং আরও বহুদূর পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে যেতে হবে। এবার এমন একটি বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি দেখা যাক যা এই সমস্যার অসংখ্য সম্ভাবনা শুরুতেই বাদ দিতে বিশেষভাবে সাহায্য করে। আমাদের ৩২-এর হিসাব নির্ভুলভাবে মেলাতে হলে এই কৌশলটি খুব ভালোভাবে বুঝতে হবে। তবে এর জন্য উচ্চতর গণিতের কোনো জটিল জ্ঞান বা পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে না। এখানে কেবল সাধারণ ভাগশেষের ধারণা থাকলেই পুরো বিষয়টি সহজে বোধগম্য হয়। ধরা যাক, যেকোনো একটি সংখ্যাকে ৯ দিয়ে ভাগ করা হলো, সেক্ষেত্রে ভাগশেষ হিসেবে ০ থেকে ৮-এর মধ্যে যেকোনো একটি সংখ্যা আসতে পারে। উদাহরণস্বরূপ ১৪-কে ৯ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হিসেবে ৫ অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু পূর্ণসংখ্যার ঘনসংখ্যাগুলোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত চমৎকার ও ব্যতিক্রমী নিয়ম কাজ করে। যেকোনো পূর্ণসংখ্যার ঘনসংখ্যাকে ৯ দিয়ে ভাগ করলে ভাগশেষ হিসেবে কেবল ০, ১ অথবা ৮ পাওয়া সম্ভব। যেমন ১-এর ঘন ১, ২-এর ঘন ৮ এবং ৩-এর ঘন হলো ২৭। এই ২৭ সংখ্যাটিকে ৯ দিয়ে একটু ভাগ করলে ভাগশেষ থাকে ঠিক শূন্য। একটু পরীক্ষা করলেই দেখা যাবে যেকোনো পূর্ণসংখ্যার কিউবের ক্ষেত্রেই এই তিনটি নির্দিষ্ট ভাগশেষের যেকোনো একটি পাওয়া যায়। এই তিনটি ভাগশেষ একসঙ্গে যোগ করলে মোট ভাগশেষ ৪ বা ৫ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। ভাগশেষ ৮-কে এই ক্ষেত্রে মাইনাস ১ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। যদিও এটি উচ্চতর গণিতের সামান্য ধারণা, তবুও আপাতত কেবল এইটুকু মনে রাখলেই যথেষ্ট হবে। সব সময় তিনটি ঘনসংখ্যার ভাগশেষের যোগফল মাইনাস ৩ থেকে ৩-এর মধ্যে যেকোনো একটি মানে গিয়ে দাঁড়ায়। ৯ দিয়ে ভাগের সাধারণ হিসাবে এর মধ্যে কোনোভাবেই ৪ বা ৫ সংখ্যাটি পড়ে না। তাই কোনো সংখ্যাকে ৯ দিয়ে ভাগ করলে যদি ভাগশেষ ৪ বা ৫ পাওয়া যায়, তবে সেই সংখ্যাকে কখনোই তিনটি পূর্ণসংখ্যার কিউবের যোগফল হিসেবে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।