
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের রাজনীতিতে নতুন এক মাত্রা যুক্ত করে গত শুক্রবার পাঞ্জাবের রাজ্য বিধানসভায় চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী ভগবন্ত সিং মান। প্যারিস থেকে ফেরার পথে দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে তিন ঘণ্টা আটকে রাখা, জিনিসপত্র তল্লাশি করা এবং ৫০ হাজার রুপি জরিমানার চালান কাটার সম্পূর্ণ নেপথ্য কারণ সামনে এনেছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, এই পুরো ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি হলেন খোদ দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ভাই মণীশ কুমার।
বিধানসভায় এই প্রসঙ্গে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ভগবন্ত সিং মান মণীশ কুমারের সুনির্দিষ্ট পরিচয়ও তুলে ধরেন। তিনি জানান যে মণীশ কুমার একজন ইন্ডিয়ান রেভিনিউ সার্ভিস বা আইআরএস কর্মকর্তা এবং তিনি বর্তমানে দিল্লি শুল্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, এটি মূলত কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট কায়দা।
ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জানান যে শুল্ক বিভাগের কর্মীরা বারবার তাঁর জিনিসপত্র তল্লাশি করার কথা বলতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত তল্লাশি চালিয়ে তাঁর কাছে আপত্তিকর বা অবৈধ কিছুই পাওয়া যায়নি। তল্লাশির পর কোনো কিছু না পেয়ে শুল্ক কর্মীরা তাঁকে চলে যাওয়ার অনুমতি দিলেও, তিনি যখন প্রস্থান করছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই কর্মকর্তারা আবার তাঁর কাছে ফিরে আসেন।
কর্মকর্তারা তখন মুখ্যমন্ত্রীকে জানান যে ওপর মহল থেকে তাঁদের ওপর অত্যন্ত বেশি চাপ রয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তাঁদের একটি চালান কাটতেই হবে। এরপর তাঁরা কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই তাঁর ওপর ৫০ হাজার রুপি জরিমানা ধার্য করেন। ঠিক এই সময়েই বিজেপির উদ্দেশে মান সরাসরি প্রশ্ন তোলেন যে দিল্লি বিমানবন্দরের ওই নির্দিষ্ট শুল্ক কর্মকর্তা কে এবং নিজেই উত্তর দিয়ে জানান যে তিনি দেশের সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের ভাই মণীশ কুমার।
মুখ্যমন্ত্রীর এই গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে সঙ্গেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এবং বিজেপি এর কঠোর প্রতিবাদ জানায়। দলটির পাঞ্জাব রাজ্যের সাধারণ সম্পাদক অনিল সারিন পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন যে এই ধরনের অবাস্তব কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী নিজের দায়দায়িত্ব কোনোভাবেই এড়াতে পারেন না। সারিনের মতে, মুখ্যমন্ত্রীর উচিত ছিল জনসমক্ষে স্পষ্টভাবে জানানো যে কোন সুনির্দিষ্ট কারণে শুল্ক বিভাগ তাঁকে ওই ৫০ হাজার রুপি জরিমানা করেছে।
বিজেপি নেতার মতে, জরিমানার সেই আসল কাগজটি যদি মুখ্যমন্ত্রী সকলের সামনে প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন, তবেই আসল সত্য সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে। তিনি আরও মন্তব্য করেন যে মুখ্যমন্ত্রীর যদি সাহস থাকে, তবে তিনি যেন সেই প্রমাণের কাগজটি জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।
প্রটোকল সংক্রান্ত নিয়মের কথা উল্লেখ করে অনিল সারিন ব্যাখ্যা করেন যে ভারতের নিয়ম অনুযায়ী দেশের মুখ্যমন্ত্রীরা অবশ্যই কিছু বিশেষ সুবিধা এবং ছাড় পেয়ে থাকেন। যেমন তাঁদের ক্ষেত্রে বিমানবন্দরে দেহ তল্লাশির মতো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না এবং তাঁদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্রও তল্লাশি করা হয় না। কিন্তু সারিন স্পষ্ট করে দেন যে এর অর্থ এই নয় যে মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে থাকা সঙ্গীরাও সেই একই সুবিধার যোগ্য হবেন এবং তাঁদের মালপত্রও তল্লাশির বাইরে থাকতে পারবে না।
এদিকে শুক্রবার পাঞ্জাব বিধানসভায় পাঞ্জাবের ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের বিতর্কিত কাজকর্ম নিয়ে একটি স্বাধীন উচ্চপর্যায়ের তদন্তের দাবি জানিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। এই প্রস্তাব নিয়ে যখন বিধানসভায় বিস্তারিত আলোচনা চলছিল, তখন অনেক সম্মানিত সদস্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ পর্যন্ত দাবি করেন। তবে লক্ষণীয় বিষয় হলো, যখন এই বিশেষ প্রস্তাবটি বিধানসভায় পাস হয়, তখন প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস, শিরোমনি অকালি দল এবং বিজেপি—এই তিন দলের কোনো সদস্যই সভাকক্ষে উপস্থিত ছিলেন না।
উল্লেখ্য যে পাঞ্জাবের শাসনক্ষমতা বর্তমানে আম আদমি পার্টি বা আপ দলের হাতে রয়েছে এবং সেই দলেরই শীর্ষ নেতা ভগবন্ত সিং মান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে, কেন্দ্রে ও রাজ্যে বিজেপি তাদের বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষ হিসেবে অবস্থান করছে এবং ঐতিহ্যবাহী দল কংগ্রেসও আপের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী। ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর ইস্যুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে পাঞ্জাব রাজ্য সরকারের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপির এই রাজনৈতিক রেষারেষি ও দ্বন্দ্ব নিরন্তর অব্যাহত রয়েছে।
বিধানসভায় ওই নির্দিষ্ট প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় মুখ্যমন্ত্রী মান ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও দিল্লি বিমানবন্দরে তাঁকে হেনস্তা করার পুরো বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে অবতারণা করেন। শুল্ক কর্মকর্তা মণীশ কুমারের বিরুদ্ধে এই মারাত্মক অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তিনি তাঁর বিদেশ সফরের নানা বঞ্চনার কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান যে ভারতের নিয়মানুযায়ী দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের যে কোনো বিদেশ সফরে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে পূর্বানুমতি নিতে হয় এবং বিদেশ সফরের সামগ্রিক চরিত্র ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তবেই কেন্দ্র ‘নো অবজেকশন সার্টিফিকেট’ বা ছাড়পত্র ইস্যু করে থাকে।
মুখ্যমন্ত্রী মানকে এর আগেও একাধিকবার সরকারিভাবে বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল কেন্দ্র এবং এবারের ক্ষেত্রেও ফ্রান্সে যাওয়ার অনুমতি মানকে দিতে কেন্দ্র সরাসরি অপারগতা প্রকাশ করেছিল। তবে মুখ্যমন্ত্রী সেই কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বসে না থেকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন এবং শেষ পর্যন্ত হাইকোর্টের স্পষ্ট নির্দেশেই তিনি ১৭ থেকে ২১ অক্টোবর ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত ‘এসআইএএল প্যারিস ২০২৬’ নামক আন্তর্জাতিক খাদ্যমেলায় যোগ দিতে সক্ষম হন। ওই সফরে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর স্ত্রী গুরপ্রীত কৌরও সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
দিল্লির বিতর্কিত শুল্ক কর্মকর্তা মণীশ কুমারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ জানানোর সময় মুখ্যমন্ত্রী মান পাকিস্তানের একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান যে পাকিস্তানের পাঞ্জাবি কবি বাবা বসির হুসেন নাজমি তাঁকে আগামী নভেম্বর মাসের ২৭ তারিখে লাহোরে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্ব পাঞ্জাবি সম্মেলনে যোগদানের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
মান সে সময় বলেন যে তিনি ওই পাকিস্তানি কবিকে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তাঁকে যারা নিজ দেশের ফ্রান্সে যাওয়ার অনুমতি দেয় না, তারা কীভাবে তাঁকে পাকিস্তান যাওয়ার অনুমতি দেবে। অথচ এই দেশ থেকেই বহু সাধারণ পাঞ্জাবি কবি ও লেখক ভবিষ্যতে পাকিস্তান যাবেন এবং তাঁদের দৃঢ় আশা রয়েছে যে সরকার তাঁদের সেই সফরের অনুমতি প্রদান করবে, কারণ দুই দেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতি মূলত একই সূত্রে গাঁথা।
মুখ্যমন্ত্রী মান পরিশেষে এ কথাও স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেন যে তিনি একান্তভাবেই চান কারতারপুর করিডর খুলে দেওয়া হোক এবং বিধানসভার সরকার ও বিরোধী পক্ষের সকল সদস্য যেন একযোগে কারতারপুর সাহেব পরিদর্শন করতে যান। শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানক দেব তাঁর জীবনের শেষ আঠারোটি বছর কারতারপুরেই কাটিয়েছেন এবং সেখানেই তিনি মহাপ্রয়াণ লাভ করেন। তাঁর স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই সেখানে বিখ্যাত দরবার সাহেব গুরুদ্বার নির্মিত হয়েছিল এবং দেশভাগের পর সেই ঐতিহাসিক কারতারপুর পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। ভারতীয় সীমান্ত এলাকার গুরদাসপুর সীমান্ত থেকে পাকিস্তানের কারতারপুরের দূরত্ব মাত্র চার কিলোমিটার এবং এই ভিসামুক্ত করিডর দিয়ে ভারতীয় পুণ্যার্থীরা নিয়মিতভাবে কারতারপুর যাওয়া-আসা করে থাকেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।