
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
২০০৬ সালের বিশ আগস্ট তারিখে নিউ ইয়র্কের প্রথম আলো বন্ধুসভার উদ্যোগে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের স্মরণে একটি বিশেষ সন্ধ্যার আয়োজন করা হয়েছিল। বরেণ্য সেই সাহিত্যিকের চিরবিদায়ের মাত্র তিন দিন বাদে আয়োজিত ঐ স্মরণানুষ্ঠানে অত্যন্ত অসুস্থ শরীর নিয়েই হাজির হয়েছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের প্রাণের বন্ধু ও সহযাত্রী কবি শহীদ কাদরী। তিনি সেদিন উপস্থিত শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে তাঁর পরম প্রিয় কবিবন্ধু সম্পর্কে নানা স্মৃতিচারণা করেন এবং তাদের সুদীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। শহীদ কাদরীর সেই সুনির্দিষ্ট স্মৃতিচারণমূলক বক্তব্য পরবর্তীতে ২০০৮ সালের চব্বিশ অক্টোবর প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী পাতার পাতায় মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়েছিল। ‘আমাদের পকেটে তখন কবিতা থাকত’ শীর্ষক সেই বিশেষ মূল্যবান রচনাটি এতদিন কেবল কাগুজে সংস্করণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং পাঠকদের পড়ার সুযোগ ছিল কেবল মুদ্রিত রূপেই। তবে বরেণ্য এই দুই কবির মধ্যকার সম্পর্কের কথা এবার অনলাইন মাধ্যম ব্যবহারকারী পাঠকদের নাগালে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পুনরায় উন্মুক্ত করা হয়েছে, যা ইতিপূর্বে আদনান সৈয়দ কর্তৃক সাফল্যের সঙ্গে ধারণকৃত হয়েছিল।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে শহীদ কাদরী গভীর আক্ষেপের সুরে উল্লেখ করেন যে তিনি কোনোভাবেই তাঁর প্রবীণ বন্ধু শামসুর রাহমানের মহাপ্রয়াণের বিষয়টি সহজভাবে মেনে নিতে পারছেন না। ঘটনার প্রায় বছর দুয়েক আগে, অর্থাৎ ২০০৬ সালেই টেলিফোনে শামসুর রাহমানের সাথে তাঁর শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। সেই সময় তাদের উভয়ের শারীরিক অবস্থাই বেশ ভালো ছিল না এবং উভয়েই মারাত্মকভাবে অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ফোনালাপে শামসুর রাহমান অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে ইংরেজিতে তাঁকে দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বলেছিলেন যে তিনি আন্তরিকভাবেই চান যেন শহীদ কাদরী খুব দ্রুত সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। সেই ফোনালাপের পর আর কোনোদিন তাঁদের মাঝে সরাসরি কোনো ধরনের যোগাযোগ বা কথা হয়নি। তবে সৌভাগ্যবশত শহীদ কাদরী তাঁর একদম শুরুর দিককার সেই কৈশোরকাল থেকেই শামসুর রাহমানকে চেনার ও জানার সুযোগ পেয়েছিলেন। দীর্ঘ দিন, দীর্ঘ মাস এমনকি বছরের পর বছর ধরে তাঁরা দুজনে নিয়মিতভাবে কবিতা পাঠ করতেন এবং সাহিত্য নিয়ে সুদীর্ঘ আলোচনা চালিয়ে যেতেন।
কলকাতায় তাঁদের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু ছিলেন, মূলত যার মাধ্যমেই কবি শামসুর রাহমানের সাথে শহীদ কাদরীর প্রথম পরিচয় ঘটেছিল। তারা সলিলসমাধি ঘটিয়ে বাহান্ন সালে সপরিবারে ঢাকায় চলে এসেছিলেন। খোকন নামের সেই বন্ধুটির সাথে তাদের সুসম্পর্ক তৈরি হয়েছিল সুদূর কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে। পরবর্তীতে চুয়ান্ন সালে হঠাৎ করেই খোকন ঢাকায় তাঁদের নিজ বাসায় এসে উপস্থিত হন এবং জানা যায় যে তিনি বড় ভাইয়ের সাথে একই ক্লাসে পড়াশোনা করতেন। শহীদ কাদরীকে দেখামাত্রই খোকন প্রশ্ন করেছিলেন যে তারা কবে ঢাকায় এসে পৌঁছেছেন। সেসময় কিশোর শহীদ কাদরী ছিলেন মূলত প্রগতিশীল কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতার একজন মগ্ন পাঠক এবং সুকান্তর লেখার আদলেই নিজে কিছু লেখার চেষ্টা চালাতেন। তাই বড় ভাই খোকনকে উদ্দেশ করে তিনি বলেছিলেন যে শহীদ ইদানিং টুকটাক কবিতা লেখার চেষ্টা করে যাচ্ছে, খোকন এ বিষয়ে কিছু জানে কি না। তা শুনে খোকন সাথে সাথেই শহীদকে ডেকে বললেন যে তাঁর লেখা কবিতাগুলো একবার তাঁকে দেখানোর জন্য। খোকন কবিতাগুলো মনোযোগ দিয়ে দেখলেও সেগুলোর ব্যাপারে কোনো বিশেষ মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ করলেন না। বরং তিনি শহীদকে জিজ্ঞেস করলেন যে সে কখনো শামসুর রাহমানের নাম শুনেছে কি না।
সেই মুহূর্ত পর্যন্ত কিশোর শহীদ কাদরী বরেণ্য কবি শামসুর রাহমানের নামই শোনেননি। তখন সদরঘাটের ঠিক উল্টো দিকের রাস্তাটিতে খান মজলিস নামের একটি পরিচিত বুক স্টল বা বইয়ের দোকান ছিল। সেই স্টলটিতে ‘পরিচয়’, ‘নতুন সাহিত্য’, ‘দেশ’ এবং ‘পূর্বাশা’র মতো সেকালের প্রায় সব ধরনের মানসম্মত সাহিত্যপত্রিকাই নিয়মিত আসত। এর মাঝেই হয়তো শহীদ কাদরির নিজের লেখা এক কিংবা দুটি কবিতা কোথাও না কোথাও ছাপাও হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন সময়ে মহিউদ্দিন আহমদ একটি নতুন সাহিত্য পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করতেন এবং সেটির নামকরণ করা হয়েছিল ‘স্পন্দন’। সেই ‘স্পন্দন’ সাহিত্যপত্রিকাটিতেই শহীদের লেখা একটি কবিতা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। নিজের কবিতা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তিনি নিজেকে একজন আস্ত লেখক ভাবা শুরু করেছিলেন এবং মনে এক ধরনের অহংকার তৈরি হয়েছিল। সেই প্রকাশিত কবিতাটি মূলত একদম টিপিক্যাল মার্ক্সবাদী ধারার ছিল এবং খানিকটা মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের লেখার ভাবধারার অনুকরণে রচিত হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি ‘পূর্বাশা’ ও ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা নিয়মিত পড়া শুরু করলেন এবং তাঁর সাহিত্যিক চিন্তাভাবনা ধীরে ধীরে রোমান্টিক কবিতার ভাবধারার দিকে মোড় নিতে শুরু করল। সেই সুবাদেই তিনি ‘জলকন্যার জন্যে’ শিরোনামে বিখ্যাত কবিতাটি রচনা করেছিলেন। কবিতাটি আদতে বেশ আনাড়ি হাতের লেখা হলেও, ওই কবিতার সম্পূর্ণ শরীরজুড়ে প্রবহমান ছিল এক ধরনের অদ্ভুত বিষণ্ন রোমান্টিকতার ছোঁয়া।
পত্রিকায় কবিতা ছাপা হওয়ার সেই দিনগুলোতে খোকন একদিন শহীদ কাদরীকে ডেকে বললেন যে তিনি তাঁর এই প্রতিভার কথা শামসুর রাহমানকে জানাবেন এবং খুব শীঘ্রই তাঁদের দুজনের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেবেন। ‘জলকন্যার জন্যে’ কবিতাটি পত্রিকায় প্রকাশের পর শহীদ প্রায় নিয়মিতভাবেই সেই বইয়ের দোকানে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন এবং অত্যন্ত আগ্রহভরে বারবার নিজের কবিতাটি নিজে পড়তেন। এমনকি তিনি খুব আড়চোখে এদিক-সেদিক তাকায়ে খেয়াল করতেন যে অন্য কোনো সাধারণ পাঠক তাঁর সেই কবিতাটি গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়ছে কি না। প্রতিদিনের রুটিন হিসেবে তাঁকে বাধ্যতামূলকভাবে এই কাজটি করতে হতো। অবশেষে এক দুপুরবেলার দিকে তিনি যখন সেই পরিচিত স্টলে দাঁড়িয়ে নিজের কবিতাটি একা একা পড়ছিলেন, তখন তাঁর ঠিক পেছনেই অন্য কেউ দাঁড়িয়ে তাঁকে নিবিড়ভাবে লক্ষ করছেন বলে তিনি স্পষ্টভাবে টের পাচ্ছিলেন। এরপর কিছুটা কৌতূহলী হয়ে তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে পেলেন যে অত্যন্ত ফরসা চেহারার, অর্থাৎ সর্বার্থেই এক সুন্দর ও সুপুরুষ ব্যক্তি অত্যন্ত মনোযোগের সাথে ‘স্পন্দন’ পত্রিকাটা মেলে ধরে তাঁর সেই কবিতাটি পড়ছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে দুজনে চোখাচোখি হয়ে গেল এবং শামসুর রাহমান নিজে থেকেই কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইলেন যে তিনি কি শহীদ কাদরী কি না।
তখন সম্পূর্ণ অভিভূত হয়ে শহীদ কাদরী প্রতিবেশের উত্তর দিয়ে বললেন যে হ্যাঁ তিনি সেটাই এবং জানতে চাইলেন তিনি কীভাবে তা বুঝতে পারলেন। সেই সময়ে সদরঘাটে ‘রিভার ভিউ’ নামের চমৎকার একটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট ছিল, যেখানে বসে চা খাওয়ার সময়ে শহীদ শামসুর রাহমানকে জানিয়েছিলেন যে তিনি ‘দেশ’ পত্রিকায় তাঁর চমৎকার কবিতাগুলো নিয়মিত পড়েন। কথা বলতে বলতেই কবি শামসুর রাহমান তাঁর নিজের পকেট থেকে বেশ কয়েকটি কবিতা বের করে উপস্থিত শহীদ কাদরীকে সশব্দে পাঠ করে শোনালেন। শহীদ কাদরী সানন্দে উল্লেখ করেন যে সেই সোনালী দিনগুলোতে তাঁদের সবার পকেটে সবসময়ই কোনো না কোনো কবিতা লুকিয়ে থাকত।
নিজের মুগ্ধতার কথা প্রকাশ করে শহীদ কাদরী আরও বলেন যে তিনি নিজেও শামসুর রাহমানকে তখন জানিয়েছিলেন যে তাঁর নিজের পকেট থেকেও একটা কবিতা রয়েছে এবং তিনি তা শোনাতে চান কি না। এরপর তিনি নিজের সেই পকেটস্থ কবিতাটি তাঁকে খুব আগ্রহ করে আবৃত্তি করে শুনিয়েছিলেন। সেই কবিতাটিও আগের মতোই গতানুগতিক রোমান্টিক ধারার অনুসারী একটি সাধারণ কবিতা ছিল। কবিতার একটি নির্দিষ্ট লাইনের ভেতরে থাকা ‘ভূল’ শব্দটির দিকে সুকৌশলে ইঙ্গিত করে কবি শামসুর রাহমান অত্যন্ত স্নেহের সাথে তাঁকে সংশোধন করে দিয়েছিলেন যে ‘ভুল’ শব্দটির আসল বানান আসলে ‘ভুল’ হবে।
সেই রেস্টুরেন্ট থেকে তাঁরা দুজন সরাসরি শামসুর রাহমানের বাসায় চলে গিয়েছিলেন এবং সেখানে পৌঁছানোর পর শামসুর রাহমান তাঁকে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে ‘কালের পুতুল’ নামের বইটি পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সেই বিশেষ দিনটি থেকেই তাঁরা দীর্ঘকাল ধরে ঢাকার অলিগলিতে মধ্যরাত অব্দি একসাথে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়িয়েছেন, চা পান করেছেন এবং নিয়মিত সিগারেট ফুঁকেছেন। তাঁদের সেই মধুর ও প্রাণবন্ত সাহিত্য আড্ডায় নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন ফজল শাহাবুদ্দীন এবং মাঝে মাঝে তাঁদের সাথে এসে যুক্ত হতেন বিশিষ্ট কবি আল মাহমুদ।
কবি শামসুর রাহমানের সাথে তাঁর জীবনের এত বিশাল পরিমাণ স্মৃতি ও মায়া জড়িয়ে রয়েছে যে এই মুহূর্তে তিনি ঠিক বুঝতে পারছেন না যে কোন স্মৃতিটি রেখে কোন স্মৃতিটি তিনি আগে বলবেন। এখনো তাঁর অবচেতন মনে প্রবলভাবে বিশ্বাস জন্মায় যে শামসুর রাহমান বুঝি এখনো বেঁচে আছেন এবং তিনি অসুস্থতা কাটিয়ে সুস্থ হয়ে যখনই ঢাকায় ফিরে যাবেন, তখনই আবার তাঁর সাথে দেখা হবে। তাই সংবাদমাধ্যম, খবরের কাগজ কিংবা টেলিভিশন—যেখান থেকেই এই মৃত্যুর সংবাদ প্রচার করা হোক না কেন, শামসুর রাহমানের এই চিরবিদায়ের খবরটি তাঁর কাছে চরমভাবে অপ্রত্যাশিত ঠেকেছে। তিনি পুরোপুরিভাবে এখনো এই গভীর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি এবং মন থেকে মেনে নিতে পারছেন না।
শহীদ কাদরীর একান্ত ব্যক্তিগত মতামত অনুযায়ী তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে উনিশ শ সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পর বর্তমান সময় পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিক ফসল হলেন কবি শামসুর রাহমান। বাংলাদেশের এই সুন্দর মাটিতে যা কিছু সত্যিকার অর্থে সুন্দর, যা কিছু সুচারু ও পরিপাটি, যা কিছু গভীর সংবেদনশীল, যা কিছু মহৎ এবং যা কিছু নিখাদ শ্রেষ্ঠ—সেসবকিছুর একটি পরম ও অসামান্য সমন্বয় অলৌকিকভাবে ঘটেছিল একমাত্র তাঁরই ব্যক্তিত্বের মাঝে। শহীদ কাদরী অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে শামসুর রাহমানকে সারা বাংলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও অমূল্য সম্পদ বলে অভিহিত করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।