
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমাদের দেশের বিভিন্ন রেলপথে অনেক যাত্রী কাউন্টার থেকে নির্দিষ্ট মূল্যে টিকিট না কেটে বরং সরাসরি রেলওয়ের বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীদের সঙ্গে নানা উপায়ে যোগাযোগ করে থাকেন। এই প্রক্রিয়ায় কেউ ট্রেনের টিটিইকে নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্যাশ টাকা দিয়ে থাকেন, আবার কেউ বগির দায়িত্বে থাকা অন্য কোনো রেলকর্মীর মাধ্যমে ভেতরে বসার সিট বা স্থান নিশ্চিত করেন।
আবার বহু যাত্রীকে দেখা যায় তারা ট্রেনের ভেতরের নামাজের জন্য নির্ধারিত স্থানে কিংবা জেনারেটরবাহী বিশেষ বগিতে অতিরিক্ত চেয়ার পেতে বসে দীর্ঘ গন্তব্যে পৌঁছে যান। এর বিনিময়ে ওই সংশ্লিষ্ট কর্মচারীকে রেলওয়ের অফিশিয়াল ভাড়ার তুলনায় অনেক কম পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়ে থাকে।
যাত্রী এবং রেলকর্মী উভয়েই এই বিষয়ে পারস্পরিকভাবে সম্মত থাকায় অনেক সাধারণ মানুষ একে একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও সাধারণ লেনদেন হিসেবেই গণ্য করে থাকেন। কিন্তু সমাজের সচেতন মহলে প্রশ্ন জাগে যে, এভাবে সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূতভাবে ট্রেন ভ্রমণ করা কি আদৌ ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো বৈধ বিষয়?
রেলওয়ে মূলত একটি কাঠামোগত প্রাতিষ্ঠানিক পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে দেশজুড়ে পরিচালিত হয়ে আসছে যেখানে যাত্রী পরিবহনের বিনিময়ে সঠিক নিয়মে নির্ধারিত ভাড়া আদায় করাই একমাত্র বিধান। কোনো যাত্রী সেই যথাযথ ভাড়া পরিশোধ না করে রেলকর্মীকে ব্যক্তিগতভাবে কিছু কম টাকা দিয়ে একই সেবা ভোগ করলে প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য অধিকার মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়।
পবিত্র কুরআনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, তোমরা একে অপরের সম্পদ কখনোই অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না, যা সুরা বাকারার ১৮৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। এখানে সম্পদ বলতে কেবল ব্যক্তিগত মালিকানাধীন অর্থসম্পদকেই বোঝানো হয়নি, বরং যেকোনো পক্ষের ন্যায্য প্রাপ্য তা ব্যক্তির হোক বা কোনো প্রতিষ্ঠানের, তা এই আয়াতের নিষেধাজ্ঞার সম্পূর্ণ আওতাভুক্ত।
রেলওয়ের নির্ধারিত এই ভাড়া হলো মূলত প্রতিষ্ঠানটির একটি ন্যায্য ও অবধারিত প্রাপ্য, যা কোনো যাত্রীর রেলসেবা গ্রহণের সাথে সাথেই বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। যাত্রী সেই নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধ না করে একই ধরনের সেবা ভোগ করলে সেই প্রাপ্য অংশটুকু তিনি কোনো বৈধ বিনিময় ছাড়াই উপভোগ করেন, যা পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় সরাসরি ‘অনায়ারিকভাবে ভক্ষণ’ হিসেবে গণ্য।
সংশ্লিষ্ট রেলকর্মী এই কম টাকা নিতে নিজের পক্ষ থেকে সম্মত হয়েছেন বলেই এই আর্থিক হিসাবের মূল ভিত্তি একটুও বদলাবে না, কারণ ভাড়ার প্রকৃত হকদার তো ওই কর্মচারী নন বরং পুরো প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠানের অন্যের হক বা অধিকার নিয়ে গোপনে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন করার কোনো রকম আইনি বা ধর্মীয় এখতিয়ারই ওই কর্মচারীর নেই।
ইসলামের ফিকহশাস্ত্রের দৃষ্টিতে যেকোনো সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সম্পদ এবং তার সেবা হলো সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর কাছে কেবল একটি আমানতস্বরূপ। তিনি সেই বিশাল প্রতিষ্ঠানের কোনো মালিক নন, বরং তিনি কেবল একজন সাধারণ রক্ষক ও পরিচালনাকারী মাত্র। তাই একজন কর্মচারীর সাধারণ সম্মতি আর মূল প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অনুমতি কখনোই এক জিনিস হতে পারে না।
কর্তৃপক্ষের যথাযথ অনুমোদন বা অনুমতি ছাড়া অন্যের কোনো সম্পদ বা সেবা নিয়ে নিজেদের মধ্যে লেনদেন করলে প্রাচীন ফকিহগণ তাকে ‘ফুজুলি’ বা অনধিকার হস্তক্ষেপ বলে অভিহিত করেছেন। মূল মালিকের পূর্বানুমোদন বা সম্মতি না থাকলে এ ধরনের কোনো লেনদেন কখনোই কার্যকর হতে পারে না বলে ফিকহগ্রন্থ রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতারে বিস্তারিত বলা হয়েছে।
ইসলামের প্রাথমিক যুগে এ বিষয়ে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর একটি শিক্ষণীয় ঘটনা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য যেখানে জাকাত আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত এক কর্মচারী ফিরে এসে বলেছিলেন এটি আপনাদের আর এটি আমাকে উপহার দেওয়া হয়েছে। তখন রাসুল (সা.) তাকে তিরস্কার করে বলেছিলেন যে সে তার বাবা-মায়ের ঘরে বসে থেকে দেখত তাকে কেউ কোনো উপহার দেয় কি না।
অর্থাৎ নিজের অফিশিয়াল পদের সুবাদে অনৈতিকভাবে পাওয়া যেকোনো ব্যক্তিগত সুবিধা কোনো কর্মচারীর জন্য সম্পূর্ণ অবৈধ ও নিষিদ্ধ। হাদিসের অন্য একটি বর্ণনায় একজন বেতনভুক্ত কর্মচারীর এমন বাড়তি গ্রহণকে সরাসরি ‘গুলুল’ বা আত্মসাৎ বলে ঘোষণা করা হয়েছে যা সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে।
পবিত্র কুরআনের অন্য একটি আয়াতে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলা হয়েছে যে, হে মুমিনগণ, তোমরা নিজেদের মধ্যকার সকল চুক্তিসমূহ যথাযথভাবে পূর্ণ করো, যা সুরা মায়েদার ১ নম্বর আয়াতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলসেবা গ্রহণের সমস্ত অফিশিয়াল নিয়ম ও বৈধ শর্তগুলো অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা এই পবিত্র ধর্মীয় নির্দেশেরই একটি অন্যতম অংশ বিশেষ।
ইসলাম ধর্মে যেকোনো ধরনের ঘুষ গ্রহণের ওপর অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এবং মহানবী (সা.) ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহীতা উভয়কেই অভিশাপ দিয়েছেন বলে সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে। কোনো কর্মচারী তার দাপ্তরিক দায়িত্বের অবস্থান অবৈধভাবে ব্যবহার করে বিনা টিকিটে ভ্রমণের সুযোগ দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে টাকা নিলে তাতে ঘুষের উপাদান যুক্ত হয়।
যাত্রীর মূল ভাড়া এড়ানো বা টিকিট যাচাইকারীকে কোনো ধরনের নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দিতে রাজি করানোই যদি যাত্রার মূল উদ্দেশ্য হয়, তবে তাকে কোনোভাবেই নিছক পারিশ্রমিক বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। তবে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সম্পূর্ণ অনুমোদিত কোনো নির্দিষ্ট ফি বা বৈধ সেবামূল্য এই নিষেধাজ্ঞার কোনোভাবেই আওতাভুক্ত হবে না, তাই বিধান নির্ধারণে অর্থ গ্রহণের উদ্দেশ্য ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অনেক সময় কোনো কোনো যাত্রীকে ট্রেনের ভেতর নামাজের জন্য নির্ধারিত পবিত্র স্থানে বসানো হয় আবার জেনারেটর ম্যান বা অন্য কোনো কর্মচারী ইঞ্জিন বা জেনারেটরবাহী বগিতে বাড়তি চেয়ার পেতে দেন। কিন্তু এভাবে বসার সুনির্দিষ্ট স্থান বদলালেও ভ্রমণের সামগ্রিক বিধান কোনোভাবেই বদলে যায় না।
মূলত দেখতে হবে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেখানে কোনো সাধারণ যাত্রীকে বসানোর অনুমতি দিয়েছে কি না এবং সেই মৌখিক বা লিখিত অনুমতি টিকিটের কোনো বিকল্প হিসেবে আইনগতভাবে স্বীকৃত কি না। ইবাদতের একান্ত প্রয়োজনে নির্ধারিত স্থান কিংবা ট্রেন চলার নিরাপত্তা ও ব্যবহারবিধির আওতাধীন বগিগুলো ব্যক্তিগত অর্থের বিনিময়ে যাত্রী পরিবহনের জায়গা বানানোর কোনো অনুমোদন থাকার কথা নয়।
কোনো রেলকর্মী যদি যাত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেন যে কোনো সমস্যা হবে না, তবুও তার সেই মৌখিক কথাটি কোনো চূড়ান্ত আইনি বা ধর্মীয় প্রমাণ হতে পারে না। বরং আমাদের দেখতে হবে যে কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী ট্রেন যাত্রাটি সম্পূর্ণ অনুমোদিত কি না এবং প্রতিষ্ঠানের ন্যায্য প্রাপ্য ভাড়া যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয়েছে কি না।
বাংলাদেশের প্রচলিত রেলওয়ে আইন অনুযায়ী বৈধ টিকিট বা পাস ছাড়া ট্রেন ভ্রমণ করা এবং প্রতারণামূলকভাবে রেলের সেবা গ্রহণ করা সম্পূর্ণ জরিমানা ও শাস্তিযোগ্য একটি অপরাধ। বাংলাদেশের রেলওয়ে আইন ১৮৯০-এর ৬৬, ৬৮, ১১২ ও ১১৩ ধারায় এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট আইনি বিধান রয়েছে।
কোনো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে রেলকর্মীর বিশেষ অনুমতিতে টিকিট ছাড়া ভ্রমণের বিধান থাকলেও সেই অনুমতি অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্মীর নিজ আইনগত ক্ষমতা ও প্রযোজ্য শর্তসমূহের সীমার মধ্যে হতে হবে। রেলওয়ের নির্ধারিত নিয়মে টিকিট সংগ্রহ করা, অনুমোদিত পাস ব্যবহার করা কিংবা বৈধ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রযোজ্য ভাড়া দিয়ে স্বীকৃত অনুমতিপত্র নেওয়া কেবল বৈধ ভ্রমণের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
সামান্য কিছু অর্থ বাঁচিয়ে বা কম দিয়ে গন্তব্যে নিরাপদে পৌঁছানো গেলেই সেটিকে কোনোমতেই সাশ্রয়ী বা বৈধ ভ্রমণ বলে ভেবে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই। ইসলামের মূল দাবি হলো মানুষের এবং প্রতিষ্ঠানের সমস্ত প্রাপ্য অধিকার পুরোপুরি অক্ষুণ্ন রেখে সম্পূর্ণ বৈধ পন্থায় নিজের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করা। এই পুরো বিষয়টির বিস্তারিত ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন ঢাকার জামিয়া আরাবিয়া দারুস হাদিস রাজাবাড়ীর সম্মানিত শিক্ষক ফয়জুল্লাহ রিয়াদ।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।