
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জনসংখ্যার বিরাট একটা অংশ পল্লী অঞ্চলে বসবাস করলেও, অগ্রগতি, কর্মসংস্থান ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তাদের জীবনসংগ্রাম ও প্রত্যাশাগুলো প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত মূল্যায়ন পায় না। বিগত দুই কিংবা তিন দশকে সামগ্রিক অর্থনীতি গতিশীল হয়েছে, কৃষিজ উৎপাদন বেড়েছে এবং যোগাযোগের মাধ্যমগুলোর উন্নতি ঘটেছে। তথাপি বহু গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় মানসম্মত শিক্ষা, স্বাস্থ্যপরিষেবা, নিশ্চিত আয় এবং আইনগত সুরক্ষার সুযোগ এখনও বেশ সীমিত। এই বৈষম্য কেবল আর্থিক ফারাকের বিষয় নয়, বরং এর সাথে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার সম্পর্কও গভীরভাবে জড়িত।
জাতীয় উৎপাদনে কৃষিখাতের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং আধুনিক বীজ, সেচপদ্ধতি, যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষকদের হাড়ভাঙা খাটুনি এই উৎপাদন বাড়াতে সাহায্য করেছে। কিন্তু ফসল বাড়লেই চাষির উপার্জন একই অনুপাতে বৃদ্ধি পায় না, কারণ উৎপাদন ব্যয়, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, সংরক্ষণের সুযোগের অভাব এবং বাজারে দরদাম করার সীমাবদ্ধতা তাদের লাভ কমিয়ে দেয়। জমির বিভাজন ও অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ কৃষিনির্ভর পরিবারগুলোর জীবিকা নির্বাহকে আরও দুর্বিষহ করে তুলছে, যার ফলে তরুণ প্রজন্ম কৃষিতে ভবিষ্যৎ না দেখে শহরমুখী হচ্ছে। তবে বড় শহরগুলোতেও সবার জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি থেকে শিল্প ও সেবামুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর ঘটা উন্নয়নের একটি স্বাভাবিক ধাপ হলেও, এই পরিবর্তনের মূল্য যেন প্রান্তিক আয়ের মানুষদের একা পরিশোধ করতে না হয় তা নিশ্চিত করা সরকারেরই মূল দায়িত্ব। দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী, দক্ষতার প্রসার এবং পল্লী অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বিক্ষিপ্ত কোনো প্রকল্প হিসেবে না দেখে সার্বিক নীতিমালার আলোকে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুর্নীতি, তদারকির ঘাটতি এবং জবাবদিহিতার অভাবে অনেক সময় সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগের সুবিধা প্রকৃত হকদারদের কাছে পৌঁছায় না। ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় প্রশাসন, আদালত কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা যদি হয় হেনস্থা, দীর্ঘসূত্রিতা বা প্রভাবশালীদের একচ্ছত্র সুবিধাভোগ, তবে রাষ্ট্র তার সেবা প্রদানের পরিবর্তে দূরত্ব সৃষ্টির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
পল্লীর মানুষকে কোনো অবমূল্যায়ন বা করুণার পাত্র হিসেবে না ভেবে তাদের সমান অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সমান অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের মতামত শোনার পর সেই অনুযায়ী নীতমালায় পরিবর্তন আনা সম্ভব হলে রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থাবোধ যেমন বৃদ্ধি পাবে, তেমনি পল্লী ও শহরাঞ্চলের মধ্যকার ব্যবধান কমানোর পথও ত্বরান্বিত হবে।
এই কারণে কেবল আর্থিক বরাদ্দ বৃদ্ধি করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেবা প্রাপ্তির মান, অভিযোগ জানানোর কার্যকরী ব্যবস্থা এবং অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রতিকারও নিশ্চিত করা আবশ্যক। স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যের উন্মুক্ত প্রকাশ এবং সামাজিক নিরীক্ষা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
পল্লী উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় এনজিও বা বেসরকারি সংস্থাগুলোর অবদানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ক্ষুদ্রঋণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির ক্ষেত্রে তারা বহু কাজ করেছে। তবে এই উন্নয়নের পরিধি থেকে কারা বাদ পড়ে যাচ্ছে, সেই মৌলিক প্রশ্নটি তোলাও অত্যন্ত জরুরি। অনেক গ্রামীণ তরুণ-তরুণী নিজেদের মেধা ও দক্ষতা অনুযায়ী কোনো কাজ বা নিজস্ব উদ্যোগ শুরু করার সুযোগ পান না। বিশেষ করে কৃষির বাইরে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ, কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রদান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন এবং স্থানীয় শিল্পগুলোর সাথে বাজারের সংযোগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
গ্রামাঞ্চলের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও তাদের নেতারা মানুষের মনে গভীর আস্থা রাখেন এবং সামাজিক জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই বাস্তবতাকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে শিক্ষা, দক্ষতা এবং নাগরিক অংশগ্রহণের পরিসর আরও বেশি বিস্তৃত করা দরকার। মাদ্রাসাশিক্ষাসহ সকল ধরনের শিক্ষাব্যবস্থায় মানসম্মত সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উচ্চশিক্ষায় প্রবেশাধিকারের পথ আরও সুগম করা উচিত।
রাষ্ট্রের সাথে গ্রামীণ জনপদের দূরত্বের আরও একটি বড় দিক হলো রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি। ভোটের সময় যাতায়াত থাকলেও স্থানীয় মানুষের মতামত বাজেট, উন্নয়নমূলক প্রকল্প ও সেবা প্রদানে কতটা প্রতিফলিত হয় তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। কৃষক, শ্রমিক, খেতমজুর ও তরুণ সমাজের অভিজ্ঞতা যদি রাজনৈতিক দল ও স্থানীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে যথাযথ স্থান না পায়, তবে নীতিনির্ধারণের সাথে বাস্তবতার ফারাক থেকে যায়। প্রতিনিধিত্ব বলতে কেবল নির্বাচিত পদে কারা আছেন তা বোঝায় না, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাধারণের অংশগ্রহণ, জনপ্রতিনিধির জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত জনশুনানির আয়োজনও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সে কারণে পল্লী উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় জনগণের মতামতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়ে যুক্ত করা একান্ত প্রয়োজন। কোন এলাকায় সেচসুবিধা, রাস্তাঘাট, সংরক্ষণাগার, বাজারসংযোগ, ইন্টারনেট বা স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি তীব্র, তা স্থানীয় তথ্য ও পরামর্শের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা উচিত। কৃষিপণ্যের উপযুক্ত মূল্য প্রাপ্তির জন্য উৎপাদক সমবায় সমিতি গঠন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ এবং সরাসরি বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ আরও বাড়ানো যেতে পারে। একই সাথে স্থানীয় সরকারকে পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষমতা প্রদান করা দরকার।
এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের সফলতা কেবল কত টাকা খরচ হলো বা কয়টি অবকাঠামো তৈরি হলো তা দিয়ে মাপা সমীচীন হবে না। বরং কত মানুষের আয় স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, কতজন তরুণ প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন, কৃষক তাদের উৎপাদিত ফসলের কতটা সঠিক মূল্য পেয়েছেন এবং সেবাকেন্দ্রে মানুষের ভোগান্তি কতখানি হ্রাস পেয়েছে—এই সূচকগুলোও বিবেচনায় রাখা দরকার। কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নীতি প্রণয়নের পাশাপাশি উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা থাকলে স্থানীয় জনতাও সামগ্রিক অগ্রগতি যাচাই করতে পারবেন। এতে বরাদ্দের অপব্যবহার রোধ করা এবং চাহিদা অনুযায়ী অগ্রাধিকার পরিবর্তন করা সহজতর হবে। এই ধরনের জবাবদিহিতা উন্নয়নকে কেবল প্রকল্পনির্ভরতা থেকে মুক্ত করে মানুষের বাস্তব জীবনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত করবে।
গ্রামাঞ্চলকে উন্নয়নের প্রান্তসীমায় রেখে জাতীয় অগ্রযাত্রাকে কোনোভাবেই দীর্ঘস্থায়ী করা যাবে না। সরকারের দায়িত্ব শুধু সামান্য সহায়তা দেওয়া নয়, বরং মানুষের কাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা এবং উন্নয়নের সুফলগুলোতে অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহে স্বচ্ছতা বজায় রাখা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, কৃষকের উপযুক্ত আয় এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ—এই সবকটি বিষয়কে একই মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। গ্রামীণ মানুষকে কোনো অবমূল্যায়ন বা করুণার চোখে না দেখে সমান অধিকারসম্পন্ন নাগরিক ও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তাদের কথা শুনে সেই অনুযায়ী নীতি পরিবর্তন করা সম্ভব হলে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে এবং গ্রাম-শহরের মধ্যকার ব্যবধান দূর করার পথ সুগম হবে। এই নিবন্ধের লেখক মামুন রশীদ একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক এবং ফিন্যান্সিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের লিড পার্টনার।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।