
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জনসাধারণের কাছে বিভিন্ন কথা বলা এবং নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া অত্যন্ত সহজ একটি বিষয়। প্রতিশ্রুতি প্রদান করতে কোনো প্রকার কষ্টের মুখোমুখি হতে হয় না এবং মুখে মুখে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা কিংবা স্বচ্ছতার কথা উচ্চারণ করাও খুবই সহজ। কিন্তু সম্পূর্ণ বিষয়টি অন্যের নিয়ন্ত্রণে সঁপে দিয়ে সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রক্ষা করা অত্যন্ত দুরূহ একটি কাজ। উদাহরণস্বরূপ, বিদেশি কোনো সরকার ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার চুক্তি অনুসারে উভয় পক্ষই যদি নিজ নিজ অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তারা একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপাতে শুরু করে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই শক্ত কোনো অবস্থান গ্রহণ করে অপর পক্ষকে বাধ্য করতে পারে না। ফলে স্বচ্ছতার প্রচণ্ড অভাব দেখা দেয় এবং সাধারণ মানুষের কাছে জবাবদিহি করার পথ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়ে। বিদেশি কোনো অপারেটরের লাভের অংক নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই শুল্কের হার বাড়িয়ে দিয়েছে। যদি শুল্ক পরে বাড়ানো হতো, তবে বিদেশি কোম্পানির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠার অবকাশ থাকত।
এই কারণে আগে থেকেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে নেওয়া হয়েছে, যার ফলে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের সাধারণ আমদানি-রপ্তানিকারকগণ। যেকোনো বিষয়ের ঝুঁকি সব সময় আগে থেকে স্পষ্টভাবে বোঝানো সম্ভব হয় না। একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটার পর মানুষ যত সহজে বুঝতে পারে ঠিক কেন ক্ষতি সাধিত হলো, তত সহজে সেই ক্ষতি আগে থেকে অনুধাবন করানো যায় না।
বিশেষ করে সেই ক্ষতি যখন ব্যবস্থাপনাগত বিভিন্ন ত্রুটি, ভূরাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং একাধিক অংশীজনের সক্ষমতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে। এই প্রসঙ্গে আমরা অন্যান্য উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর বাস্তব উদাহরণ সহজেই পর্যালোচনা করে দেখতে পারি। যেমন, জিবুতি রাষ্ট্রটি দোরালেহ টার্মিনালের প্রধান শেয়ারহোল্ডার হওয়া সত্ত্বেও চুক্তির নানা মারপ্যাঁচে এর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে চলে যায়।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে জিবুতি সরকার যখন জাতীয় স্বার্থ রক্ষার্থে এই চুক্তি বাতিল করে দেয়, তখন ডিপি ওয়ার্ল্ড সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের দ্বারস্থ হয়। লন্ডনে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিসি আদালত জিবুতির সেই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে বিদেশি কোম্পানির পক্ষে রায় প্রদান করে, যার ফলে দেশটির নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
অন্যদিকে, দেশের ভেতরের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দুর্নীতির কালো ছায়ার সুযোগ নিয়ে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র তথা ডিআরসির গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও খনিজসম্পদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিদেশি কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে পড়ে। এর ফলে কঙ্গোর মূল্যবান সব প্রাকৃতিক সম্পদ রপ্তানির প্রধান পথ এবং তাদের জাতীয় অর্থনীতির মূল লাইফলাইন সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
পাশাপাশি দেশটির দেশীয় সংস্থাগুলো ভয়াবহ ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে, যা উভয় দেশের জন্যই চরম দুর্ভাগ্যজনক ছিল। জিবুতি ও কঙ্গো উভয়ের এই বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে দেশের যেকোনো স্পর্শকাতর অবকাঠামোতে বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সার্বভৌমত্বের জন্য সুদূর ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এবার যদি এমন একটি কাল্পনিক পরিস্থিতি কল্পনা করা হয় যে, কোনো যুদ্ধাবস্থায় কোনো বিদেশি শক্তি যদি আমাদের দেশের বন্দর তাদের কোনো শত্রুকে আক্রমণের কাজে ব্যবহার করতে ইচ্ছুক হয়, যেই শত্রুর সঙ্গে আবার আমাদের নিজস্ব নির্ভরতার সম্পর্ক রয়েছে, তবে কী হবে? তখন দেশের নিজস্ব স্বার্থ গুরুতরভাবে ক্ষুণ্ন হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ হয়তো বাধ্য হতে পারে সেই বন্দর তাদের ব্যবহার করতে দিতে।
তখন সেই বন্দরটি ঠিক কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কার কতটুকু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে, তা নিয়ে অত্যন্ত বড় বড় কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হবে। তখন বাংলাদেশের নিজস্ব নীতিগত সার্বভৌমত্ব বিন্দুমাত্র থাকবে না এবং পুরো দেশ এক গভীর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করবে। এমনিতেই আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বেশ দুর্বল, তার ওপর সাম্প্রতিককালে ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে বাংলাদেশ তার কূটনৈতিক ও পররাষ্ট্রনীতিতে যথেষ্ট দুর্বলতার পরিচয় দিয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের দেশের পাল্টা শুল্ককে অবৈধ ঘোষণা করেছে, অথচ চুক্তি অনুযায়ী আমরা নিয়মিত বোয়িং বিমান কিনে যাচ্ছি এবং এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি আমদানির চুক্তিও করে যাচ্ছি। এমনকি বিদেশে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও বাংলাদেশ অনেক সময় তার সঠিক খবরই রাখে না।
উল্টো পুরো ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত না জেনেই নিজের দেশের সাধারণ নাগরিককে অযথা দোষারোপ করা হয়। এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে এটিই স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রয়োজন অনুযায়ী জোরালো ও শক্তিশালী কোনো ভূমিকা পালন করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। এর ফলে সাধারণ জনগণের মনের ভেতর নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি ও সম্ভাব্য ঝুঁকির আশঙ্কা দিন দিন বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
অতএব, যেকোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে অথবা জটিল কোনো ভূরাজনৈতিক সংকটের মুহূর্তে যে বাংলাদেশ নিজ দেশের স্বার্থ সঠিকভাবে রক্ষা করতে পারবে না, তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ আমাদের চোখের সামনেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে। বন্দরের পরিচালনাভার অন্যের হাতে হস্তান্তর করা যে এই ধরনের ঝুঁকিগুলোকে আরও বহুলাংশ বাড়িয়ে দেবে, তা নিছক কোনো হিসাব-নিকাশ করে অঙ্ক কষে বোঝানোর বিষয় নয়। কৌশলগত এই ঝুঁকিগুলোকে সব সময় সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দিয়ে পুরোপুরি পরিমাপ করা যায় না, বরং তা অতীতের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকেই সবচেয়ে ভালোভাবে উপলব্ধি করা সম্ভব।
সূত্র: আজকের পত্রিকা