
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সময়ের প্রবাহে মানবজীবনের কত স্মৃতি মুছে যায়, আবার মনের কোণে জমা হয় নতুন অধ্যায়। ঠিক তেমনি বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দ্বৈরথ এল ক্লাসিকোর ঐতিহ্যও রূপ বদলায়। একটা সময় লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দ্বৈরথে মুখর থাকত মাঠ, সঙ্গে পেপ গার্দিওলা আর জোসে মরিনিওর কৌশলগত লড়াই তৈরি করত অন্যরকম উন্মাদনা। সেই সোনালী দিনগুলোর চরিত্রেরা আজ অনুপস্থিত, তবে স্মৃতির শিখা পুরোপুরি নিভে যায়নি। বর্তমান প্রজন্মের মঞ্চে পা রেখেছেন লামিনে ইয়ামাল এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে, যাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল শাখা-প্রশাখা মেলতে শুরু করেছে এবং পূর্ণতা পেতে আরও সময় প্রয়োজন। তবে এত পরিবর্তনের পরও এল ক্লাসিকো মানেই চিরন্তন রোমাঞ্চ ও স্নায়ুচাপের লড়াই।
আগামীকাল রাতে ক্যাম্প ন্যুতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী দুই ক্লাব বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। স্প্যানিশ লা লিগায় নয়টি ম্যাচ শেষে সাতাশ পয়েন্ট অর্জন করে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে আছে বার্সেলোনা। অন্যদিকে সমান সংখ্যক ম্যাচে একুশ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। এই ম্যাচে মাদ্রিদের ক্লাবটি যদি পরাজিত হয়, তবে দুই দলের মধ্যকার পয়েন্টের ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে নয় পয়েন্টে। বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিকের সামনে সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে বহু দূরে সরিয়ে দেওয়ার, আর অন্যদিকে জোসে মরিনিওর কাঁধে চেপেছে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে দলকে রক্ষা করার কঠিন চ্যালেঞ্জ।
এই হাইভোল্টেজ লড়াইয়ের ঠিক আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল অঙ্গনে প্রধানত পাঁচটি ভিন্ন বিষয় নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা ও চুলচেরা বিশ্লেষণ। পরিসংখ্যান অনেক সময় ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেওয়ার চেষ্টা করে, যা রাফিনিয়ার ক্ষেত্রে দারুণভাবে মিলে যায়। ব্রাজিলীয় এই ফরোয়ার্ড যতগুলো এল ক্লাসিকোয় অংশগ্রহণ করেছেন, তার প্রতিটিতেই জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে বার্সেলোনা। এই ম্যাচগুলোতে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সাতটি গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও তিনটি গোল। অর্থাৎ রিয়াল মাদ্রিদের মুখোমুখি হলেই যেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রাফিনিয়ার দেখা মেলে।
চলতি ফুটবল মৌসুমেও দারুণ ছন্দে আছেন এই তারকা। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে দশ ম্যাচে ইতিমধ্যে চোদ্দটি গোল আদায় করে নিয়েছেন। এর মধ্যে লিগের আটটি ম্যাচেই বারোটি গোল করে তিনি বর্তমানে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে চোটের কারণে কিছুদিন মাঠের বাইরে থাকলেও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে পিএসজির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি দলে ফিরেছেন। যদিও সেই ম্যাচে বার্সেলোনা পরাজিত হয়েছিল, তবুও রাফিনিয়ার মনে বিন্দুমাত্র আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি হয়নি। ম্যাচ শেষে তিনি নিজেই বলেছেন যে ওই পরাজয় আসন্ন এল ক্লাসিকোর ফলাফলে কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না।
তাঁর এই অটুট আত্মবিশ্বাসকে অমূলক বলা চলে না, কারণ রাফিনিয়ার পা থেকে যদি জাদুকরী পারফরম্যান্স বেরিয়ে আসে, তবে রিয়ালের রক্ষণভাগ রীতিমতো বিপদের মুখে পড়তে পারে। ফুটবল অনেক সময় অদ্ভুত সব বৃত্তের জন্ম দেয়, যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ জোসে মরিনিও। একসময়ে বার্সেলোনার সহকারী কোচের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি, যদিও প্রধান কোচ হওয়ার আজীবন স্বপ্ন তাঁর অপূর্ণই থেকে গিয়েছিল। পরবর্তীতে রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান কোচের দায়িত্ব গ্রহণ করে তিনি সেই বার্সেলোনারই সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ও প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছিলেন।
ফুটবলপ্রেমীদের নিশ্চয়ই মনে আছে ২০১১ সালের সেই স্প্যানিশ সুপার কাপের কথা, যখন বার্সেলোনার সহকারী কোচ তিতো ভিয়ানোভার চোখের মধ্যে আঙুল ঢুকিয়ে এক কলঙ্কজনক অধ্যায় তৈরি করেছিলেন মরিনিও। ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত সেই দৃশ্য আজও ভক্তদের মনে তাজা রয়েছে। সেই চেনা চরিত্রের মরিনিও এবার আবারও ফিরে এসেছেন রিয়ালের ডাগআউটে। লস ব্লাঙ্কোসদের প্রধান কোচ হিসেবে এটি তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম এল ক্লাসিকো। বয়স হয়তো তাঁর ভেতরের মারমুখী ভাবকে কিছুটা প্রশমিত করেছে, কিন্তু একজন পেশাদার কোচের ভেতরের আগুন কি এত সহজে নিভে যাওয়ার পাত্র?
রিয়ালের ডাগআউটে নিজের প্রথম মেয়াদে তিনি মোট সতেরোটি এল ক্লাসিকোয় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার মধ্যে পাঁচটিতে জয়, ছয়টিতে ড্র এবং ছয়টিতে পরাজয়ের স্বাদ পেয়েছিলেন। ২০১৩ সালে রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে যাওয়ার আগে তিনি টানা পাঁচটি ক্লাসিকোয় অপরাজিত থাকার গৌরব অর্জন করেছিলেন। বর্তমান সুযোগ রয়েছে এই সংখ্যাটিকে ছয়ে উন্নীত করার। এর আগে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে মাত্র দুই জন কোচ মিগুয়েল মুনোজ এবং ভিসেন্তে দেল বস্ক এই বিশেষ কীর্তি গড়তে পেরেছিলেন।
অন্যদিকে বার্সেলোনা কোচ হান্সি ফ্লিকের এল ক্লাসিকোর পরিসংখ্যান রীতিমতো ঈর্ষণীয় ও চমৎকার। তিনি এ পর্যন্ত সাতটি ম্যাচে অংশ নিয়ে ছয়টিতেই জয় তুলে নিয়েছেন। ফলে ক্যাম্প ন্যুর এই লড়াই কেবল দুই দলের ফুটবলারদের কৌশলগত বুদ্ধিমত্তার দ্বৈরথ নয়, বরং দুই ডাগআউটের দুই ভিন্ন ব্যক্তিত্বের সম্মান রক্ষার লড়াই। নিজের ঘরের মাঠ ক্যাম্প ন্যুতে বার্সেলোনা যেন এক অপরাজেয় শক্তির প্রতীক। নিজেদের দর্শকদের সামনে তারা বর্তমানে টানা তেইশটি লিগ ম্যাচে জয়ের ধারা বজায় রেখেছে। গত ফুটবল মৌসুমের উনিশটি ম্যাচের প্রতিটিতেই তারা জয়লাভ করেছিল।
চলতি মৌসুমেও নিজেদের মাঠে খেলা প্রথম চার ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছে কাতালানরা। চলতি মৌসুমে ঘরের মাঠে খেলা পাঁচটি ম্যাচে তারা প্রতিপক্ষের জালে একুশটি বল জড়িয়েছে, যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে প্রতি ম্যাচে গড়ে চারের অধিক গোল। এর বিপরীতে রিয়াল মাদ্রিদের অ্যাওয়ে বা বহিঃমাঠের পারফরম্যান্স বেশ অস্বস্তিকর। তাদের সর্বশেষ চার লিগ অ্যাওয়ে ম্যাচের দুটিতে জয় পেলেও বাকি দুটিতে পরাজয়ের তিক্ততা সইতে হয়েছে। রিয়াল বেতিস ও আতলেতিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে হারলেও এস্পানিওল ও এলচের মাঠ থেকে জয় নিয়ে ফিরেছিল তারা।
তবে এই পরিসংখ্যানের বাইরেও ইতিহাসের পাতার এক কোণে লুকিয়ে আছে এক রহস্যময় মুচকি হাসি। বার্সেলোনার ঘরের মাঠে খেলা সর্বশেষ ছয়টি লিগ ম্যাচের তিনটিতেই জয় তুলে নিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। অথচ তার আগের ষোলটি ম্যাচে তাদের মোটে জয় ছিল তিনটি। তাই ক্যাম্প ন্যু বার্সেলোনার জন্য নিশ্চিতভাবেই এক দুর্ভেদ্য দুর্গ হলেও রিয়ালের কাছে সেটি একেবারে অসম্ভব কোনো কেল্লা নয়। আক্রমণভাগের দিক বিচার করলে বার্সেলোনা যেন আক্ষরিক অর্থেই এক গোল তৈরির কারখানা।
চলতি মৌসুমে বার্সা সব মিলিয়ে বারোটি ম্যাচে প্রতিপক্ষের জালে পঞ্চাশটি গোল করেছে। প্যারিস সেন্ট জার্মেইর কাছে চার-দুই গোলের ব্যবধানে হেরে যাওয়ার আগে তারা টানা এগারোটি ম্যাচে জয় তুলে নিয়েছিল। তবে ফরাসি ক্লাবটি বিশ্ববাসীর সামনে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে হান্সি ফ্লিকের এই বার্সেলোনা দলের মধ্যেও কিছু দুর্বলতা লুকিয়ে আছে। ফ্লিকের হাই প্রেসিং ট্যাকটিকস বা অতি আক্রমণাত্মক pressing কৌশল প্রতিপক্ষ দলকে সবসময় দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে রাখে। চলতি লিগে তারা প্রতি ম্যাচে মাত্র ছয় দশমিক আটটি শট নিজেদের গোলমুখে হজম করে, যা এই পরিসংখ্যানের বিচারে টুর্নামেন্টের সেরা দল হিসেবে তাদের প্রতিষ্ঠিত করেছে।
অথচ এই পরিসংখ্যানের ঠিক বিপরীত চিত্রটি বেশ ভয়ংকর ও উদ্বেগের। প্রতিপক্ষের নেওয়া প্রতিটি শটের বিপরীতে প্রত্যাশিত গোল বা এক্সজি মান এই লিগে বার্সেলোনার সবচেয়ে বেশি। এর মানে দাঁড়ায়, বার্সা প্রতিপক্ষকে খুব বেশি গোল করার সুযোগ দেয় না, কিন্তু সেই সীমিত সুযোগগুলো যদি কোনোভাবে প্রতিপক্ষ পেয়ে যায়, তবে গোল হওয়ার সম্ভাবনা বহুগুণ বেড়ে যায়। তার ওপর দলের রক্ষণভাগের অন্যতম ভরসা জুলস কুন্দে চোটের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অনুপস্থিত থাকছেন। এমবাপ্পে এবং ইয়ান দিওমান্দের মতো ক্ষিপ্র তারকারা কি বার্সার রক্ষণভাগের এই ফাটল দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে বড় বিপদ ডেকে আনবেন?
বড় ম্যাচে দলের সেরা ও বড় খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি সাধারণত যেকোনো দলের জন্যই গভীর দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এবারের এল ক্লাসিকোয় ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ছাড়াই রিয়াল মাদ্রিদের আক্রমণভাগে অস্ত্রের কোনো কমতি বা ঘাটতি নেই। শৃঙ্খলাজনিত নিষেধাজ্ঞার কারণে এই ব্রাজিলীয় তারকা মাঠে নামতে পারছেন না। তবে তাঁর শূন্যস্থান পূরণের জন্য প্রস্তুত রয়েছেন ইয়ান দিওমান্দে। সেভিয়ার বিপক্ষে রিয়াল মাদ্রিদের করা তিনটি গোলই তৈরি হয়েছিল বাঁ প্রান্ত ধরে। সেভিয়া এবং লাইপজিগের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট করে দিওমান্দে ইতিমধ্যে নিজের অসাধারণ সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন।
আর ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে তো এক আতঙ্কের নাম। বার্সেলোনার বিপক্ষে খেলা তাঁর মোট ছয়টি ম্যাচে ইতিমধ্যেই ছয়টি গোল করা হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রতি পঁচাত্তর মিনিটে একটি করে গোল করার দারুণ রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। অন্যদিকে জুড বেলিংহামও কম যান না, বার্সার বিপক্ষে ছয়টি এল ক্লাসিকোয় তিনি চারটি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে দুটি গোল করিয়েছেন। বিশেষ করে তাঁর করা তিনটি গোলই ছিল দলের জন্য ম্যাচ জেতানো। সুতরাং, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র দলে না থাকলেও রিয়ালের আক্রমণভাগে পর্যাপ্ত বিষদাঁত ও ধার রয়েছে।
তবে এই ম্যাচের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিসংখ্যানটি লুকিয়ে রয়েছে অন্য একটি জায়গায়। দীর্ঘ ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এল ক্লাসিকোর দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দুই দলের জয়ের পাল্লা বর্তমানে একদম সমান, উভয়েরই জয় ১০৬টি করে এবং অমীমাংসিত বা ড্র ম্যাচের সংখ্যা ৫২টি। এই দীর্ঘ লড়াইয়ে রিয়াল মাদ্রিদ মোট ৪৪৪টি গোল করেছে, আর বার্সেলোনার গোলসংখ্যা ৪৪১টি। চলতি লিগ মৌসুমে টানা নয়টি জয় তুলে নিয়ে ১৯৬৮-৬৯ মৌসুমে মিগুয়েল মুনোজের রিয়াল মাদ্রিদের গড়া সেরা শুরুর রেকর্ড ইতিমধ্যে ছুঁয়ে ফেলেছে বার্সেলোনা।
এই ম্যাচে যদি বার্সা আরেকটি জয় তুলে নিতে পারে, তবে অতীতের সেই রেকর্ডটি সম্পূর্ণ তাদের একক অধিকারে চলে যাবে। সব মিলিয়ে একদিকে জোসে মরিনিওর পুরোনো হিসাব চুকিয়ে দেওয়ার তীব্র তাগিদ কাজ করছে, অন্যদিকে হান্সি ফ্লিকের সামনে হাতছানি দিচ্ছে নতুন এক সাম্রাজ্য গড়ে তোলার সুবর্ণ স্বপ্ন। বর্তমান মাঠে লিওনেল মেসি নেই, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও নেই। তবুও বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বিখ্যাত এই দ্বৈরথের উত্তেজনায় বিন্দুমাত্র ভাটা পড়েনি। কারণ ফুটবলার বদলায়, দলের কোচ বদলায়, কালক্রমে যুগও বদলে যায়, কিন্তু এল ক্লাসিকোর মূল হৃৎস্পন্দন ও উন্মাদনা কখনো বদলায় না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।