
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে ইসরায়েল। ঠিক ভোটের তিন দিন আগের দিন গতকাল শনিবার দেশটির প্রধান শহর তেল আবিবের রাজপথে নেমে আসেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ।
বর্তমান সরকারের তীব্র সমালোচনা করার পাশাপাশি এই বিক্ষোভকারীরা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের চালানো নজিরবিহীন হামলার সময় চরম নিরাপত্তাব্যবস্থার বড় ধরনের ব্যর্থতার একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি জানান।
আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলে আয়োজিত এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন।
এই গুরুত্বপূর্ণ ভোটের মাত্র তিন দিন বাকি থাকতেই তেল আবিবের সুপরিচিত হোস্টেজ স্কয়ার চত্বরে জড়ো হন অসংখ্য মানুষ এবং তারা জোরালোভাবে সরকারবিরোধী আন্দোলন প্রদর্শন করেন।
‘অক্টোবর কাউন্সিল’ নামক একটি সংগঠনের উদ্যোগে এই বিক্ষোভ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়। প্রায় তিন বছর আগে হামাস কতৃক জিম্মি হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা একত্র হয়ে এই সংগঠনটি গড়ে তোলেন।
শুরু থেকেই হামাসের মারাত্মক হামলা ঠেকাতে সরকারের মন্ত্রী ও প্রশাসনের চরম ব্যর্থতার সুষ্ঠু জবাবদিহি দাবি করে আসছে এই সংগঠনটি।
বিক্ষোভ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়ার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি বিশেষ পোস্ট দেয় অক্টোবর কাউন্সিল।
সেখানে উল্লেখ করা হয় যে, নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে তারা সত্য উদ্ঘাটন করতে, যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের মূল দাবিতে তিন বছর ধরে চলা আন্দোলনের এক চূড়ান্ত কর্মসূচি পালন করতে যাচ্ছেন।
ইসরায়েলের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে যে, শুধু রাজধানী তেল আবিব নয়, বরং এর বাইরেও দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারবিরোধী এই বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন।
দেশের এই বিশাল জনস্রোতে সংহতি প্রকাশ করে যোগ দেন দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাও।
তাদের মধ্যে অন্যতম একজন ছিলেন ইয়াশার পার্টির প্রভাবশালী নেতা গাদি আইজেনকট। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
তেল আবিবের চলমান বিক্ষোভে গাদি আইজেনকট প্রবেশ করলে উপস্থিত বিক্ষোভকারীরা তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং ‘কে আসছেন? পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী’—এই স্লোগানে চারপাশ মুখরিত করে তোলেন।
ইসরায়েলের আরেক স্বনামধন্য সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েল তাদের প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া সেই প্রতিবাদ সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্র্যাটস পার্টির শীর্ষ নেতা ইয়াইর গোলান।
ইসরায়েলি নাগরিক ও পেশায় আইনজীবী ড্যান আদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে নিজের অ্যাকাউন্টে একটি বার্তা লেখেন।
তিনি জানান যে, রাবিন চত্বর থেকে শুরু করে হোস্টেজ চত্বর পর্যন্ত পুরো মিছিলে সাধারণ মানুষের বিশাল ঢল নেমেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মানুষ পরিবর্তন চায়, আশার আলো দেখতে চায় এবং একটি সফল বিপ্লবের প্রত্যাশায় রাজপথে নেমে এসেছে, আর এই পরিবেশটি অত্যন্ত উদ্দীপনামূলক এবং এবার বিজয় সুনিশ্চিত।
এদিকে বিভিন্ন জনমত জরিপের ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে মঙ্গলবারের এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে বেশ হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি নেতৃত্বে পরিচালিত ডানপন্থী রাজনৈতিক জোটটি ২০২২ সালের শেষভাগ থেকে দেশের ক্ষমতায় রয়েছে।
আসন্ন নির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এই জোটের সঙ্গে প্রধান বিরোধী নেতা আইজেনকটের জোটের হাড্ডাহাড্ডি ও সমানে সমানে লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে শেষ পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক জোটই এককভাবে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে না।
ইসরায়েলের এবারের সাধারণ নির্বাচনটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরানে নতুন করে ইসরায়েল কোনো সামরিক হামলা চালাবে কি না, তা সম্পূর্ণভাবে এবারের নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর নির্ভর করবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বিরোধী নেতা আইজেনকট যদি শেষ পর্যন্ত ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হন, তবে তিনি তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ব্যাপারে তুলনামূলক কম আগ্রহী হবেন।
তা সত্ত্বেও, দেশের পররাষ্ট্রনীতির সিংহভাগ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইসরায়েলের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এবং শীর্ষ নেতাদের ভেতর পূর্ণ ঐকমত্য বজায় রয়েছে।
এই জাতীয় ঐকমত্যের একটি বড় উদাহরণ হলো একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণার প্রতি তাদের প্রবল ও অভিন্ন বিরোধিতা।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।