
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থায় চলা তীব্র সংকটের প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন রাজপথে নেমে এসেছেন লাখো সাধারণ মানুষ। গত শনিবার রাজধানী প্যারিসসহ পুরো দেশজুড়ে আয়োজিত এই বিশাল বিক্ষোভে বিভিন্ন বয়সী ও পেশার নাগরিকরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সঙ্গে আলাপকালে এমিলি গ্রঁদ্রি নামের এক ফরাসি মা জানান, কোনোভাবেই সহজে হাল ছেড়ে বসে থাকা সম্ভব ছিল না এবং তাদের বাধ্যতামূলকভাবেই আবার রাজপথের আন্দোলনে ফিরতে হয়েছে।
গত সপ্তাহের বিক্ষোভের সময় এই নারী অংশ নিতে গিয়ে কাঁদানে গ্যাসের মারাত্মক মুখোমুখি পড়েছিলেন। তবে নিজের সন্তানকে নিরাপদে আগলে রাখার সংকল্প নিয়ে তিনি গত শনিবার পুনরায় প্যারিসের বিক্ষোভ মিছিলে যোগ দেন।
এমিলির ১৫ বছর বয়সী কিশোর সন্তান অ্যারন সংবাদমাধ্যমকে জানায়, তাদের স্কুল ভবনগুলোর অবস্থা অত্যন্ত জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে এবং প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকেরও মারাত্মক সংকট চলছে। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দেশের সরকার পুরোপুরি উদাসীনতা প্রদর্শন করে চলেছে বলে সে অভিযোগ করে।
চলমান মিছিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বাধা সৃষ্টি করাকে নিছক ক্ষমতার অপব্যবহার বলে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করে ওই তরুণ।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ২২ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ক্লারা লেব্বাদি রয়টার্সকে নিজের মতামত প্রকাশ করে বলেন, কোনো দোকানে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটলে সাধারণ মানুষ ও কতৃপক্ষ কান্নাকাটি শুরু করে দেয়।
কিন্তু যারা সারা বছর ধরে দিন দিন আরও বেশি গরিব হয়ে পড়ছেন, তাদের কষ্টের কথা ভেবে মায়া দেখানোর মতো কেউ নেই বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এই তরুণী শিক্ষার্থী।
বিক্ষোভকারীদের বহন করা একটি প্ল্যাকার্ডেও এই জমে থাকা ক্ষোভ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। সেখানে লেখা ছিল যে, জিনিসপত্র ভাঙচুর করা হলে অপরাধে কারাদণ্ড দেওয়া হয়, কিন্তু সাধারণ মানুষকে যারা আঘাত করেন তাদের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
বিক্ষোভে সামিল হওয়া আরেক ফরাসি শিক্ষার্থী লাওয়ের মন্তব্য অনুযায়ী, কোনো ধরনের ভয়ের মুখে পড়ে আন্দোলন বন্ধ করে দিলে কখনোই নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায় করা সম্ভব হবে না।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের সঙ্গে আলাপকালে যোগাযোগকর্মী নাদেজ উল্লেখ করেন যে, সবাই বেশ খানিকটা ভয় পেলেও নিজেদের সাংবিধানিক অধিকারটুকু টিকিয়ে রাখার স্বার্থে তাদের রাস্তায় নামতে হয়েছে।
বার্তা সংস্থা এপিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শিক্ষক বেনেদিক্ত পিত্তিওঁ জানান, তরুণ প্রজন্মের যৌক্তিক দাবিগুলো সরকার কান দিয়ে শুনছে না বলেই তিনি তার ১৬ বছরের কিশোরী মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মিছিলে দাঁড়িয়েছেন।
অন্যদিকে, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকিং পরামর্শক পিয়ের তার আট বছর বয়সী আদরের নাতনির একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার গভীর আশা ও প্রত্যাশা নিয়ে আজকের এই মিছিলে যোগ দিয়েছেন।
ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া আনুষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশজুড়ে আয়োজিত এই বিক্ষোভ কর্মসূচিতে সর্বমোট ৪ লাখ ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
তবে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর দাবি অনুযায়ী, এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশগ্রহণকারী মানুষের প্রকৃত সংখ্যাটি ছিল প্রায় আট লাখের কাছাকাছি।
চলমান এই ব্যাপক বিক্ষোভের কারণে বিশ্বখ্যাত ল্যুভর জাদুঘর বাধ্য হয়ে বন্ধ রাখা হয়, যার ফলে দর্শনার্থীরা ঐতিহাসিক চিত্রকর্ম ‘মোনালিসা’ দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
একই কারণে মুসে দর্সে এবং প্যারিস অপেরার মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলোও সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সামগ্রিক পরিস্থিতি কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে মোট ৭০ হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়।
তবে শেষ পর্যন্ত গত শনিবার গভীর রাতে প্যারিস ও মার্সেই শহরের বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারী বিক্ষোভকারীদের সরাসরি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।