
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি ও অন্যের বদলে পরীক্ষা দেওয়ার অপরাধে গত নয় মাসে তিন শতাধিক প্রার্থী ও ভুয়া পরীক্ষার্থীকে সাজা প্রদান করা হয়েছে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই রায়গুলো ঘোষণা করেছেন। মূলত লিখিত বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফল হওয়ার পর মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়ে অথবা সরাসরি চাকরিতে যোগদানের সময় হাতের লেখা ও বায়োমেট্রিক তথ্যে গরমিল ধরা পড়ার পরই মূল অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলার রক্ষকদের জালে আটকা পড়েন। এই বিশেষ আদালত থেকে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বনিম্ন ১৫ দিন থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান কার্যকর করা হয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবীরা এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, সহজে চাকরি পাওয়ার প্রবল মোহ, পর্যাপ্ত ও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অনুপস্থিতি এবং বিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মানের ক্রমাবনতিই মূলত এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী এ বি এম আলতাফ হোসেন মন্তব্য করেছেন যে, মূলত নৈতিক মূল্যবোধের চরম পতনের কারণেই চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় প্রক্সি দেওয়ার প্রবণতা লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। শুধু সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, জালিয়াতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মূল চাকরিপ্রার্থী এবং তাদের বদলি হিসেবে পরীক্ষা দিতে আসা ভুয়া পরীক্ষার্থী—উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই নিয়মিত ফৌজদারি আইনে মামলা দায়ের করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। পাশাপাশি, দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের আজীবনের জন্য সব ধরনের পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
ডিজিটাল জালিয়াতির মতো আধুনিক অপরাধগুলো পুরোপুরি দমন করতে সব পরীক্ষাকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিয়েছেন এই আইনজীবী। একই সঙ্গে একটি যুগোপযোগী ও আধুনিক পরীক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি বলে তিনি মনে করেন।
সুপ্রিম কোর্টের অপর আইনজীবী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ব্যারিস্টার মশিউর রহমান সবুজ তার বিশ্লেষণে উল্লেখ করেন যে, দীর্ঘদিন ধরে পরীক্ষার খাতায় শিক্ষার্থীদের অযাচিতভাবে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে পাস করানোর একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি চালু রয়েছে। এর ফলে শিক্ষার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মনে গভীর ‘পরীক্ষাভীতি’র জন্ম নিচ্ছে, যা তাদের শর্টকাট বা অপরাধের পথ বেছে নিতে প্ররোচিত করছে।
প্রতারণার এই অপরাধ রোধে তিনি কড়া শাস্তির সুপারিশ করে বলেন, জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত চাকরিপ্রার্থী এবং প্রক্সি পরীক্ষার্থী উভয় পক্ষকেই অন্তত পাঁচ বছরের মেয়াদে যেকোনো ধরনের পাবলিক পরীক্ষা থেকে বহিষ্কার করা আবশ্যক।
আইনগত দিক বিচার করলে দেখা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধির ২৬০ থেকে ২৬৫ ধারা মোতাবেক পরিচালিত সংক্ষিপ্ত বিচারিক আদালতের মাধ্যমে দুই বছরের কম সাজা পাওয়ার যোগ্য অপরাধগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করা হয়।
ডিএমপির সংরক্ষিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিগত বছরের মার্চ মাস থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সময়ের মধ্যে জালিয়াতি সংক্রান্ত অপরাধসহ মোট ৭২ হাজার ৭৪৪টি ফৌজদারি মামলা সংক্ষিপ্ত বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই বিচারিক কার্যক্রমে সর্বমোট ৭৩ হাজার ৮২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং সরকারের কোষাগারে প্রায় ৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা জরিমানা বাবদ আদায় করা হয়েছে।
তবে এই বিশাল পরিমাণ বিচারিক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা তীব্র জনবল সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
ডিএমপির আইন কর্মকর্তা তথা জেলা জজ মো. আতাউল হক গণমাধ্যমকে জানান যে, রাজধানীর মোট ৫০টি থানার বিশাল এলাকার আইনশৃঙ্খলা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাত্র আটজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। প্রয়োজনীয় জনবলের পদ এবং নির্দিষ্ট বিচারিক এজলাসের মারাত্মক ঘাটতি থাকায় এই কর্মকর্তাদের সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতেও অস্থায়ী ভিত্তিতে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
মামলার জট কমানো এবং বিচারিক কার্যক্রমের ধারাবাহিক গতিশীলতা ও মান অক্ষুণ্ন রাখতে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের জন্য স্থায়ী পদ সৃজন এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগের ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
সূত্র: আজকের পত্রিকা